প্রকাশ: ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের ইতিহাসে আরও একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো ২০২৫ সালে। বছরজুড়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ও বিভিন্ন ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগে ধারাবাহিক, নিয়ন্ত্রিত ও কার্যকর পারফরম্যান্সের মধ্য দিয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজের অভিজ্ঞ অলরাউন্ডার জেসন হোল্ডার গড়েছেন অনন্য এক কীর্তি। এক পঞ্জিকাবর্ষে সর্বোচ্চ উইকেট শিকারের রেকর্ড ভেঙে দিয়েছেন তিনি। দীর্ঘ আট বছর ধরে যে রেকর্ডটি অক্ষত ছিল, সেটি ছিল আফগানিস্তানের স্পিন জাদুকর রশিদ খানের দখলে। ২০১৮ সালে রশিদ খান এক বছরে ৯৬টি উইকেট নিয়ে টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছিলেন। সেই রেকর্ড এবার ভেঙে নতুন মানদণ্ড স্থাপন করলেন ক্যারিবীয়ান পেস অলরাউন্ডার জেসন হোল্ডার।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের আইএল টি-টোয়েন্টি লিগে আবুধাবি নাইট রাইডার্সের হয়ে মাঠে নেমে সোমবার, ২৯ ডিসেম্বর, এই ঐতিহাসিক কীর্তিতে নাম লেখান হোল্ডার। ম্যাচে তিনি ২৪ রানে ২টি গুরুত্বপূর্ণ উইকেট শিকার করেন। এই দুই উইকেটই ২০২৫ সালে তার মোট উইকেট সংখ্যা পৌঁছে দেয় ৯৭-এ। এর মাধ্যমে টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে এক পঞ্জিকাবর্ষে সর্বোচ্চ উইকেট নেওয়ার নতুন রেকর্ড গড়ে ইতিহাসের পাতায় নিজের নাম লিখিয়ে নেন তিনি।
২০২৫ সালটি ছিল জেসন হোল্ডারের ক্যারিয়ারের অন্যতম ব্যস্ত ও সফল একটি বছর। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট এবং বিশ্বের বিভিন্ন ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগ মিলিয়ে তিনি খেলেছেন মোট ৬৯টি ম্যাচ। এই দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর সূচির মধ্যেও তার পারফরম্যান্স ছিল চোখে পড়ার মতো ধারাবাহিক। গড়ে ২১.৪২ রানে উইকেট শিকার করেছেন তিনি, যেখানে তার ইকোনমি রেট ছিল ৮.৩০। আধুনিক টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে, যেখানে ব্যাটসম্যানরা প্রায়ই বোলারদের ওপর চড়াও হন, সেখানে এই পরিসংখ্যান নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়।
হোল্ডারের এই ৯৭ উইকেটের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, তিনি ছয়টি ম্যাচে চার উইকেট করে নিয়েছেন। অর্থাৎ শুধু নিয়মিত উইকেট নেওয়াই নয়, গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে ম্যাচ ঘুরিয়ে দেওয়ার ক্ষমতাও দেখিয়েছেন এই ক্যারিবীয়ান তারকা। ক্যারিবীয়ান প্রিমিয়ার লিগে বার্বাডোজ রয়্যালসের হয়ে তার সেরা বোলিং ফিগার ছিল ৪ উইকেট ১৪ রানে। ওই ম্যাচে তার নিখুঁত লাইন-লেন্থ, বাউন্স এবং বৈচিত্র্য প্রতিপক্ষ ব্যাটিং লাইনআপকে পুরোপুরি ভেঙে দেয়।
টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের ইতিহাসে এক বছরে ৯০-এর বেশি উইকেট নেওয়ার কীর্তি এর আগে মাত্র একজনই গড়তে পেরেছিলেন—রশিদ খান। এবার সেই অভিজাত তালিকায় দ্বিতীয় নাম হিসেবে যুক্ত হলেন জেসন হোল্ডার। তবে পার্থক্য এখানেই শেষ নয়। রশিদ খান মূলত একজন স্পিনার হিসেবে এই কীর্তি গড়েছিলেন, আর হোল্ডার একজন পেস অলরাউন্ডার হয়েও একই উচ্চতায় পৌঁছেছেন, যা তার সাফল্যকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তোলে।
পেসারদের মধ্যে এক পঞ্জিকাবর্ষে ৮০-এর বেশি উইকেট নেওয়ার নজিরও টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে খুবই বিরল। এই কৃতিত্ব রয়েছে মাত্র দুজনের—জেসন হোল্ডার এবং তারই স্বদেশি কিংবদন্তি অলরাউন্ডার ডোয়াইন ব্রাভো। ব্রাভো ২০১৬ সালে ৭১ ইনিংস খেলে নিয়েছিলেন ৮৭ উইকেট। প্রায় এক দশক পর সেই তালিকায় নিজের নাম যুক্ত করে ক্যারিবীয়ান পেস বোলারদের ঐতিহ্যকে আরও সমৃদ্ধ করলেন হোল্ডার।
তবে জেসন হোল্ডারের অবদান কেবল বল হাতেই সীমাবদ্ধ ছিল না। অলরাউন্ডার হিসেবে ব্যাট হাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন তিনি। ২০২৫ সালে টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে তার ব্যাট থেকে এসেছে ৮৪৬ রান। নিচের দিকে নেমে দ্রুত রান তোলার ক্ষেত্রে তার শক্তিশালী ব্যাটিং বহু ম্যাচে দলকে বাড়তি সুবিধা এনে দিয়েছে। অনেক সময় শেষের দিকে তার ক্যামিও ইনিংসই ম্যাচের পার্থক্য গড়ে দিয়েছে।
একসময় ওয়েস্ট ইন্ডিজ জাতীয় দলের অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করা হোল্ডার সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নিজেকে নতুনভাবে মেলে ধরেছেন টি-টোয়েন্টি বিশেষজ্ঞ অলরাউন্ডার হিসেবে। লম্বা উচ্চতা, স্বাভাবিক বাউন্স, স্লোয়ার বলের বৈচিত্র্য এবং ট্যাকটিক্যাল বুদ্ধিমত্তা তাকে আধুনিক টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে অত্যন্ত কার্যকর করে তুলেছে। বিশ্বের প্রায় সব বড় ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগেই তার চাহিদা রয়েছে, আর ২০২৫ সালে তার পারফরম্যান্স সেই চাহিদাকে আরও যৌক্তিক প্রমাণ করেছে।
ক্রিকেট বিশ্লেষকদের মতে, হোল্ডারের এই সাফল্যের পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে তার ফিটনেস, মানসিক দৃঢ়তা এবং ম্যাচ পরিস্থিতি বোঝার ক্ষমতা। একের পর এক লিগে ভিন্ন ভিন্ন কন্ডিশনে খেলেও তিনি নিজেকে মানিয়ে নিতে পেরেছেন দ্রুত। কখনো পাওয়ারপ্লেতে নতুন বলে, কখনো ডেথ ওভারে চাপের মুখে—সব জায়গাতেই কার্যকর ভূমিকা রেখেছেন তিনি।
রশিদ খানের দীর্ঘ আট বছরের রেকর্ড ভাঙা তাই কেবল একটি পরিসংখ্যানগত অর্জন নয়, এটি আধুনিক টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে পেস অলরাউন্ডারদের গুরুত্বেরও একটি বড় প্রমাণ। স্পিনারদের দাপটের যুগে দাঁড়িয়ে একজন পেস বোলার হিসেবে এই রেকর্ড গড়া নিঃসন্দেহে বিশেষ কিছু।
২০২৫ সাল শেষ হতে হতে জেসন হোল্ডার নিজেকে এমন এক উচ্চতায় নিয়ে গেছেন, যেখানে তাকে কেবল একজন নির্ভরযোগ্য খেলোয়াড় নয়, বরং টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের ইতিহাসের অন্যতম সফল পঞ্জিকাবর্ষ পার করা ক্রিকেটার হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। রেকর্ড ভাঙা, ধারাবাহিকতা এবং অলরাউন্ড পারফরম্যান্স—সব মিলিয়ে এই বছরটি হোল্ডারের ক্যারিয়ারে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।
ক্রিকেটপ্রেমীরা এখন তাকিয়ে আছেন ভবিষ্যতের দিকে। এই ছন্দ যদি তিনি ধরে রাখতে পারেন, তাহলে জেসন হোল্ডারের সামনে আরও নতুন রেকর্ড, আরও বড় কীর্তি অপেক্ষা করছে—এ কথা বলাই যায়।