জিয়াউর রহমানের পাশে চিরনিদ্রায় খালেদা জিয়া

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ৩১ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ৭৩ বার
জিয়াউর রহমানের পাশে চিরনিদ্রায় খালেদা জিয়া

প্রকাশ: ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক দীর্ঘ, ঘটনাবহুল ও প্রভাবশালী অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটলো। সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন তাঁর স্বামী, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কবরের পাশে। রাষ্ট্রীয় মর্যাদায়, লাখো মানুষের অশ্রুসিক্ত বিদায়ের মধ্য দিয়ে বুধবার বিকেল সাড়ে চারটার পর রাজধানীর শেরে বাংলা নগরের জিয়া উদ্যানে তাঁর দাফন সম্পন্ন হয়। এই সমাধিস্থল শুধু একটি কবরস্থান নয়, এটি হয়ে উঠেছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক নীরব সাক্ষী।

দাফন কার্যক্রমের শুরুতেই আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। বড় ছেলে ও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান নিজ হাতে মায়ের কবরের ওপর মাটি ছিটিয়ে দেন। এরপর একে একে পুত্রবধূ জুবাইদা রহমান ও শামিলা রহমান, নাতনি জাইমা রহমান এবং প্রয়াত ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর দুই কন্যা জাহিয়া রহমান ও জাফিয়া রহমান কবরে মাটি দেন। পরিবারের এই দৃশ্য উপস্থিত হাজারো মানুষের চোখে জল এনে দেয়। পরে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খান ও নৌবাহিনী প্রধান অ্যাডমিরাল এম নাজমুল হাসান শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। দাফন কার্যক্রমে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ দলের স্থায়ী কমিটির একাধিক সদস্য উপস্থিত ছিলেন।

এর আগে বিকেল তিনটার পর রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে অনুষ্ঠিত হয় বেগম খালেদা জিয়ার নামাজে জানাজা। জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের খতিব মুফতি আবদুল মালেক জানাজায় ইমামতি করেন। জানাজায় অংশ নেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন, প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস, উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যরা, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ, বিদেশি কূটনীতিক, বুদ্ধিজীবী, সংস্কৃতিকর্মী এবং সর্বস্তরের সাধারণ মানুষ। লাখো মানুষের উপস্থিতিতে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ পরিণত হয় শোকের সমুদ্রে।

সকাল থেকেই রাজধানী ও দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ আসতে শুরু করেন প্রিয় নেত্রীকে শেষ বিদায় জানাতে। মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ ছাড়িয়ে জনস্রোত ছড়িয়ে পড়ে আগারগাঁও, আসাদগেট, খামারবাড়ি, ফার্মগেট ও কারওয়ানবাজার পর্যন্ত। অনেকেই হাতে ফুল, কেউ চোখে জল, কেউবা নীরব শ্রদ্ধায় দাঁড়িয়ে ছিলেন। ১৯৮১ সালে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের জানাজার সময় যে আবেগময় দৃশ্য দেখা গিয়েছিল, ঠিক তেমনই এক ঐতিহাসিক পুনরাবৃত্তির সাক্ষী হয় ঢাকা শহর।

জানাজার আগে বক্তব্যে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনের নানা দিক তুলে ধরেন। তিনি বলেন, খালেদা জিয়ার রাজনীতিতে আগমন ছিল আকস্মিক, কিন্তু সময়ের প্রয়োজনে তিনি হয়ে উঠেছিলেন অপরিহার্য। স্বামীকে হারানোর পর কোনো আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ছাড়াই তিনি যে দৃঢ়তা ও প্রজ্ঞার সঙ্গে দলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন, তা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিরল উদাহরণ হয়ে থাকবে।

এ সময় আবেগঘন কণ্ঠে বক্তব্য দেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। মায়ের পক্ষ থেকে ক্ষমা চেয়ে তিনি বলেন, বেগম খালেদা জিয়া জীবিত থাকাকালে তার কোনো কথায় বা আচরণে কেউ কষ্ট পেয়ে থাকলে তিনি পরিবারের পক্ষ থেকে ক্ষমাপ্রার্থী। একই সঙ্গে তিনি জানান, তাঁর মা জীবিত অবস্থায় যদি কারও কাছ থেকে কোনো ঋণ নিয়ে থাকেন, তবে সংশ্লিষ্টদের তার সঙ্গে যোগাযোগ করার আহ্বান জানান এবং সেই ঋণ পরিশোধের আশ্বাস দেন। এই বক্তব্যে উপস্থিত মানুষের মধ্যে গভীর মানবিক অনুভূতির সৃষ্টি হয়।

বেগম খালেদা জিয়া গত ২৩ নভেম্বর থেকে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে আইসিইউতে নেওয়া হয়। চিকিৎসকদের সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা সত্ত্বেও তিনি সংকটময় অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলেন। শেষ পর্যন্ত মঙ্গলবার ভোর ছয়টার দিকে তিনি ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮০ বছর।

১৯৪৫ সালে জন্মগ্রহণ করা খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী এবং মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নেন। স্বামী শহীদ জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার ধারণ করে তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলকে সুসংগঠিত করেন এবং একাধিকবার রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন। তাঁর শাসনামলে যেমন উন্নয়ন ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার কথা আলোচিত হয়েছে, তেমনি রাজনৈতিক সংঘাত ও সংগ্রামের মধ্য দিয়েও তাঁকে যেতে হয়েছে।

রাজনীতির বাইরে তিনি ছিলেন একজন পরিবারকেন্দ্রিক নারী। দুই পুত্রকে নিয়ে সাধারণ গৃহবধূর জীবন থেকে দেশের অন্যতম প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেত্রীতে রূপান্তরের এই যাত্রা বাংলাদেশের ইতিহাসে এক ব্যতিক্রমী অধ্যায়। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি যেমন সমর্থকদের ভালোবাসা পেয়েছেন, তেমনি প্রতিপক্ষের কঠোর সমালোচনার মুখেও পড়েছেন। সবকিছুর ঊর্ধ্বে উঠে তিনি নিজের অবস্থানে অটল থেকেছেন।

আজ জিয়াউর রহমানের পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত হওয়ার মধ্য দিয়ে সেই দীর্ঘ রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত যাত্রার সমাপ্তি ঘটলো। এই সমাধিস্থল ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে শুধু একটি কবর নয়, বরং বাংলাদেশের রাজনীতির উত্থান-পতন, সংগ্রাম ও ইতিহাসের এক নীরব পাঠ হয়ে থাকবে। লাখো মানুষের চোখের জল আর প্রার্থনার মধ্য দিয়ে বিদায় নেওয়া খালেদা জিয়া বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত