প্রকাশ: ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী এবং মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় নারী সরকার প্রধান বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার শেষ বিদায় জানাজা হিসেবে ঢাকায় অনুষ্ঠিত হয়েছে এক ইতিহাস রচনা করা জনসমুদ্রের মধ্য দিয়ে। বুধবার (৩১ ডিসেম্বর) রাজধানীর মানিক মিয়া এভিনিউ ছাপিয়ে জনস্রোত ছড়িয়ে পড়েছিল আশেপাশের কয়েক কিলোমিটার এলাকায়। চোখে যতদূর যায়, সেদিকেই মানুষের ভিড়, আর ভিড়ের শব্দও যেন বিশালতার কাছে হার মানিয়েছে। দলমত নির্বিশেষে শোকার্ত মানুষ এই বিদায়ে অংশ নিয়েছেন, যা প্রমাণ করে, রাজনীতির ‘আপসহীন নেত্রী’ খালেদা জিয়া মানুষের হৃদয়ে কত গভীর প্রভাব রেখেছেন। প্রবীণ রাজনৈতিক বিশ্লেষক থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ একবাক্যে স্বীকার করছেন, “দেশে এমন জানাজা আগে কখনো দেখেনি কেউ।”
বিকেল ৩টায় জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় জানাজা শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মানিক মিয়া এভিনিউ ও আশেপাশের সড়কগুলো কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে। জানাজাস্থল পুরোপুরি পূর্ণ হয়ে ভিড় ছড়িয়ে পড়েছিল উত্তরে জাহাঙ্গীর গেট, পশ্চিমে মিরপুর রোড এবং পূর্বে ফার্মগেট পেরিয়ে কারওয়ান বাজার, বাংলামোটর ও মগবাজার পর্যন্ত। মাইকের আওয়াজ যতদূর পৌঁছাতো, মানুষ তখনও কাতারবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। অনেকের চোখে জল, কেউবা হাতে তুলে নীরবে দোয়া করছিলেন।
শীত উপেক্ষা করে মানুষ রাত থেকেই মানিক মিয়া এভিনিউ, বিএনপির দলীয় কার্যালয়, এভারকেয়ার হাসপাতালসহ বিভিন্ন স্থানে অবস্থান নিয়েছিলেন। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই ঢল রূপ নেয় বিশাল জনসমুদ্রে। জানাজায় অংশগ্রহণকারী পুরান ঢাকার সত্তরোর্ধ্ব ব্যবসায়ী হাজী আবদুল লতিফ বলেন, “১৯৮১ সালে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের জানাজা দেখেছিলাম। ভেবেছিলাম, বাংলাদেশে আর হয়তো এমন দৃশ্য দেখব না। আজ ৪৪ বছর পর তাঁর স্ত্রীর জানাজায় এসে মনে হচ্ছে ইতিহাস আবার ফিরে এসেছে। এমন ভালোবাসা জোর করে আদায় করা যায় না, এটা আল্লাহ প্রদত্ত। তিনি যাকে সম্মান দেন, কেউ তাকে অসম্মান করতে পারে না।”
জানাজায় অংশগ্রহণ করেছেন শুধু দলের নেতাকর্মীরাই নয়, দেশের সর্বস্তরের মানুষ। সাধারণ চাকরিজীবী, শিক্ষার্থী, রিকশাচালক, ব্যবসায়ী—সবাই ছিল উপস্থিত। সংসদ ভবনের আশেপাশের গাছ, ফুটপাত, এমনকি নিকটস্থ ভবনগুলোর ছাদও ভিড়ের কারণে লোকে লোকারণ্য হয়ে উঠেছিল। জানাজার ঠিক আগমুহূর্তে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান কান্নাবিজড়িত বক্তব্য দেন, এরপর তারেক রহমান তার মায়ের পক্ষে সবার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। সেই সময় পুরো এলাকা যেন দেশনেত্রীর বিরহ-বেদনায় ভারী হয়ে ওঠে।
বিদেশি কূটনীতিকদের উপস্থিতিও ছিল চোখে পড়ার মতো। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, চীন, ভারত, পাকিস্তান, জাপান, সৌদি আরবসহ ঢাকাস্থ ৩২টি দেশের কূটনীতিক ও প্রতিনিধি জানাজায় অংশগ্রহণ করেন। তাদের জন্য নির্ধারিত স্থানে দাঁড়িয়ে তারা প্রত্যক্ষ করেন বাংলাদেশের মানুষের আবেগঘন বিদায় মুহূর্ত।
নারীদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। মূল অংশে নারীদের প্রবেশাধিকার সীমিত থাকলেও আশেপাশের নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে হাজারো নারী অশ্রুসজল চোখে বিদায় জানিয়েছেন দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রীকে। অনেকের হাতে ছিল কালো ব্যাজ, মুখে শোকের ছায়া।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, বেগম খালেদা জিয়ার জানাজা কেবল একটি ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা ছিল না, এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি বিশেষ মুহূর্ত। দীর্ঘ রোগভোগ, কারাবাস এবং রাজনৈতিক চড়াই-উৎরাইয়ের পর তাঁর এই বিদায় প্রমাণ করে, ক্ষমতার বাইরে থেকেও একজন নেতা কীভাবে জনগণের মনে বেঁচে থাকতে পারেন।
বেগম খালেদা জিয়া ১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট জন্মগ্রহণ করেন। তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী এবং বেনজির ভুট্টোর পর মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ইতিহাসে নিজস্ব স্থান অর্জন করেছেন। মঙ্গলবার (৩০ ডিসেম্বর) সকাল ৬টায় রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।