প্রকাশ: ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশের রাজনীতির ধ্রুবতারা, তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার জীবনের শেষ ৩৮ দিন কেটেছে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে অসংখ্য আন্দোলন-সংগ্রামে নেতৃত্ব দেওয়া এই আপসহীন নেত্রী শেষবারের মতো রোগের সঙ্গে যে লড়াই করেছেন, তা ছিল নীরব, যন্ত্রণাময় এবং গভীরভাবে মানবিক। হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর একাধিকবার আশার আলো দেখা গেলেও শেষ পর্যন্ত আর ঘরে ফেরা হলো না তাঁর। মঙ্গলবার সকাল ছয়টার দিকে এই হাসপাতালেই মৃত্যুবরণ করেন তিনি, রেখে যান শোকাবহ এক অধ্যায়।
খালেদা জিয়া এর আগেও বিভিন্ন সময়ে চিকিৎসার প্রয়োজনে এভারকেয়ার হাসপাতালে গিয়েছেন। কখনও রুটিন পরীক্ষা-নিরীক্ষা, কখনও ভর্তি থেকে সুস্থ হয়ে বাসায় ফিরেছেন। কিন্তু এবারের পরিস্থিতি ছিল ভিন্ন। শ্বাসকষ্ট নিয়ে গত ২৩ নভেম্বর তাঁকে শেষবারের মতো হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তখন থেকেই শুরু হয় টানা ৩৮ দিনের এক কঠিন চিকিৎসা অধ্যায়। বয়সের ভার, দীর্ঘদিনের জটিল রোগ এবং একাধিক অঙ্গের দুর্বলতা—সব মিলিয়ে তাঁর শারীরিক অবস্থা ক্রমেই সংকটাপন্ন হয়ে ওঠে।
পরিবার ও দলীয় সূত্র জানায়, এই সময়জুড়ে দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সমন্বয়ে গঠিত একটি মেডিকেল বোর্ড সার্বক্ষণিক তাঁর চিকিৎসার দায়িত্বে ছিল। ফুসফুসে সংক্রমণ, তীব্র শ্বাসকষ্ট, হৃদ্যন্ত্রের দুর্বলতা এবং কিডনি ও লিভারের দীর্ঘদিনের জটিলতা চিকিৎসাকে আরও কঠিন করে তোলে। চিকিৎসকদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে তাঁকে আইসিইউ পর্যায়ে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছিল। কখনও অবস্থার সামান্য উন্নতি হলে স্বজনদের মনে আশার সঞ্চার হতো, আবার কখনও হঠাৎ অবনতি সবাইকে নতুন করে উদ্বিগ্ন করে তুলত।
এই ৩৮ দিনে খালেদা জিয়াকে বিদেশে উন্নত চিকিৎসার জন্য নেওয়ার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়েছিল। লন্ডন ও মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি খ্যাতনামা চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা হয়। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা অনলাইনে চিকিৎসা বোর্ডে যুক্ত ছিলেন। তবে চিকিৎসকদের মত ছিল, দীর্ঘ বিমানযাত্রা তাঁর জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। ফুসফুসের সংক্রমণ ও শ্বাসকষ্টের কারণে ২৯ নভেম্বরের পর বিদেশে নেওয়ার উদ্যোগ স্থগিত করা হয়। পরবর্তী সময়ে শারীরিক অবস্থার আর উন্নতি না হওয়ায় সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি।
এই সময় সরকার তাঁকে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে ঘোষণা করে সর্বোচ্চ চিকিৎসা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সিদ্ধান্ত নেয়। হাসপাতাল এলাকায় বাড়তি নিরাপত্তা জোরদার করা হয়, যাতে চিকিৎসা কার্যক্রম নির্বিঘ্নে চালানো যায়। রাজনৈতিক মতভেদ ভুলে দেশের বিভিন্ন স্তরের মানুষ তাঁর সুস্থতা কামনা করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে উদ্বেগ, প্রার্থনা ও শুভকামনার বার্তা।
খালেদা জিয়ার চিকিৎসার সঙ্গে সার্বক্ষণিকভাবে যুক্ত ছিলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন। তিনি নিয়মিতভাবে গণমাধ্যমকে চিকিৎসার সর্বশেষ অবস্থা জানাতেন। মৃত্যুর পর গুলশানে বিএনপির চেয়ারপার্সনের রাজনৈতিক কার্যালয়ের সামনে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী সর্বোচ্চ চিকিৎসা নিশ্চিত করা হয়েছিল। তাঁর ভাষায়, দেশি-বিদেশি খ্যাতনামা চিকিৎসকদের সমন্বয়ে গঠিত বোর্ড সর্বাত্মক চেষ্টা করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের মাউন্ট সিনাই ও জন হপকিন্স হাসপাতাল, যুক্তরাজ্যের লন্ডন ব্রিজ হাসপাতাল, লন্ডন ক্লিনিক এবং কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটি হাসপাতালের চিকিৎসকেরা এই বোর্ডে যুক্ত ছিলেন। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমানও চিকিৎসক দলের সদস্য হিসেবে যুক্ত ছিলেন।
হাসপাতালের এই দিনগুলোতে পরিবারের উপস্থিতি ছিল তাঁর জন্য বড় ভরসা। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফেরার পর নিয়মিত হাসপাতালে গিয়ে মায়ের চিকিৎসার তদারকি করেন। সোমবার রাতেও তিনি হাসপাতালে যান। সেই রাতে তারেক রহমানের সঙ্গে ছিলেন তাঁর স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান, খালেদা জিয়ার বড় বোন সেলিনা ইসলাম, ছোট ভাই শামীম এস্কান্দার, দুই নাতনি জাইমা রহমান ও জাহিয়া রহমান এবং বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। গভীর রাত পর্যন্ত তাঁরা হাসপাতালেই ছিলেন। রাত দুইটার দিকে পরিবারের সদস্যরা হাসপাতাল ত্যাগ করেন। কয়েক ঘণ্টা পরই ভোরে আসে সেই দুঃসংবাদ, যা দেশজুড়ে শোকের ছায়া নামিয়ে আনে।
৮০ বছর বয়সী এই সাবেক প্রধানমন্ত্রী দীর্ঘদিন ধরে হৃদ্রোগ, ডায়াবেটিস, আর্থ্রাইটিস, লিভার সিরোসিস ও কিডনির জটিলতাসহ নানা শারীরিক সমস্যায় ভুগছিলেন। দীর্ঘ কারাবাস ও মানসিক চাপ তাঁর স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছিল বলে চিকিৎসকদের ধারণা। তবু তিনি ছিলেন মানসিকভাবে দৃঢ়। হাসপাতালের বিছানায় শুয়েও দলের খোঁজখবর নিতেন, রাজনৈতিক পরিস্থিতি জানতে চাইতেন বলে দলীয় নেতাদের ভাষ্য।
এই ৩৮ দিন কেবল একটি চিকিৎসা অধ্যায় ছিল না, ছিল বাংলাদেশের রাজনীতির এক জীবন্ত ইতিহাসের নীরব সাক্ষী। হাসপাতালের করিডোরে অপেক্ষমাণ নেতাকর্মীদের চোখে ছিল উৎকণ্ঠা, আবার সাধারণ মানুষের মনে ছিল প্রার্থনা। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরাও তাঁর সুস্থতা কামনা করেছেন। প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস, জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা তাঁকে দেখতে হাসপাতালে যান। এসব সাক্ষাৎ ছিল সৌজন্য ও মানবিকতার প্রতিফলন।
মঙ্গলবার সকালে তাঁর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই দেশজুড়ে শোকের আবহ তৈরি হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে রাজনীতিবিদ, বুদ্ধিজীবী ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরা শোক প্রকাশ করেন। তিনবারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাঁর রাষ্ট্র পরিচালনার অভিজ্ঞতা, গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠায় ভূমিকা এবং আপসহীন রাজনৈতিক অবস্থান নতুন করে আলোচনায় আসে।
হাসপাতালে কাটানো খালেদা জিয়ার শেষ ৩৮ দিন ছিল এক দীর্ঘ বিদায়ের প্রস্তুতি। রাজনৈতিক জীবনে যিনি কখনও আপস করেননি, শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তিনিও লড়াই করেছেন। সেই লড়াইয়ের পরিসমাপ্তি ঘটলেও তাঁর জীবন, সংগ্রাম ও নেতৃত্ব বাংলাদেশের ইতিহাসে চিরদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে।