ইতিহাসের বৃহত্তম জানাজায় লাখো মানুষের শ্রদ্ধা খালেদা জিয়াকে

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ১ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৭৮ বার
সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া

প্রকাশ: ০১ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব অধ্যায় রচিত হলো সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার জানাজাকে ঘিরে। লাখো মানুষের অশ্রুসিক্ত উপস্থিতিতে রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ পরিণত হয় এক বিশাল জনসমুদ্রে। রাজনৈতিক বিভাজন, মতাদর্শের ভিন্নতা কিংবা দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে এই জানাজা ইতোমধ্যে বাংলাদেশের ইতিহাসে বৃহত্তম জানাজা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। অনেকের মতে, শুধু বাংলাদেশ নয়, গোটা মুসলিম বিশ্বেও স্মরণকালের অন্যতম বৃহৎ জানাজা এটি।

বুধবার বিকাল ৩টায় মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ের পশ্চিম প্রান্তে অনুষ্ঠিত হয় খালেদা জিয়ার নামাজে জানাজা। নির্ধারিত সময় দুপুর ২টা থাকলেও রাষ্ট্রীয় ও আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার কারণে প্রায় এক ঘণ্টা বিলম্বে জানাজা শুরু হয়। বেলা তিনটা তিন মিনিটে শুরু হয়ে তিনটা পাঁচ মিনিটে শেষ হয় এই জানাজা। জানাজা পরিচালনা করেন বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের খতিব মুফতি আবদুল মালেক। জানাজা শেষে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় জিয়া উদ্যানে, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কবরের পাশে তাকে দাফন করা হয়।

ফজরের নামাজের পর থেকেই রাজধানী ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ জানাজাস্থলের দিকে যাত্রা শুরু করেন। জায়গা না পাওয়ার শঙ্কা আর প্রিয় নেত্রীকে শেষ বিদায় জানানোর তীব্র আকাঙ্ক্ষায় হাজারো মানুষ রাতেই ঢাকামুখী বাস, ট্রেন ও লঞ্চে চেপে রওনা হন। সকাল গড়াতেই মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ, সংসদ ভবনের সামনের মাঠগুলো এবং আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকা পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে। বিজয় সরণি, খামারবাড়ি, কারওয়ান বাজার, ফার্মগেট, শাহবাগ, ধানমন্ডি, শুক্রাবাদ, মোহাম্মদপুরসহ কয়েক বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে মানুষের ঢল নামে। অনেকে যেখানে যতদূর পেরেছেন, সেখানেই কাতারবদ্ধ হয়ে জানাজায় শরিক হন। কেউ কেউ মেট্রোরেল স্টেশন, আশপাশের ভবনের ছাদ কিংবা উঁচু স্থানে দাঁড়িয়ে নামাজে অংশ নেন।

জানাজায় উপস্থিত ছিলেন দেশের অন্তর্বর্তীকালীন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস, উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যরা, তিন বাহিনীর প্রধান, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ, কূটনীতিক ও আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিরা। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও খালেদা জিয়ার ছেলে তারেক রহমান জানাজার আগে উপস্থিত জনতার কাছে মায়ের জন্য দোয়া কামনা করেন। আবেগঘন কণ্ঠে তিনি বলেন, আল্লাহ তায়ালা যেন তার মাকে বেহেশত নসিব করেন। খালেদা জিয়া জীবিত অবস্থায় যদি কারও কাছে কোনো দেনা থেকে থাকে, তা পরিশোধের জন্য তার সঙ্গে যোগাযোগ করার আহ্বান জানান তিনি। জানাজাস্থলে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস তারেক রহমানকে জড়িয়ে ধরে সমবেদনা জানান, যা উপস্থিত জনতার মধ্যে এক মানবিক আবহ সৃষ্টি করে।

এর আগে জানাজা কার্যক্রমের সঞ্চালনা শুরু করেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান। খালেদা জিয়ার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সহকর্মী হিসেবে তিনি আবেগাপ্লুত কণ্ঠে তার জীবনের নানা অধ্যায় তুলে ধরেন। তিনি বলেন, খালেদা জিয়া দল-মত নির্বিশেষে মানুষের ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও সম্মান নিয়ে বিদায় নিয়েছেন। তার রাজনৈতিক সংগ্রাম, ত্যাগ ও সহনশীলতা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ইতিহাসে অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।

বাংলাদেশের সরকারি বার্তা সংস্থা বাসস জানিয়েছে, খালেদা জিয়ার জানাজা শুধু বাংলাদেশের ইতিহাসেই নয়, বরং মুসলিম বিশ্বের স্মরণকালের বৃহত্তম জানাজাগুলোর একটি। বাসসের ভাষ্যমতে, কোনো মুসলিম নারীর জানাজায় এত বিপুল মানুষের অংশগ্রহণ এর আগে দেখা যায়নি। জানাজায় অংশ নেওয়া মানুষের বক্তব্যেও উঠে আসে তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা। অনেকেই বলেন, আজকের এই জনসমুদ্র প্রমাণ করে দেয়—একজন রাজনৈতিক নেতা কতটা জনপ্রিয় ও মানুষের হৃদয়ের কাছের হলে এমন দৃশ্য সম্ভব।

চার দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন খালেদা জিয়া। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার, ক্ষমতায় থাকা ও বিরোধী দলে থেকে আন্দোলন—সব ক্ষেত্রেই তিনি ছিলেন দৃঢ়চেতা। রাজনৈতিক জীবনে তাকে বহুবার নিপীড়ন, কারাবরণ ও শারীরিক অসুস্থতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। তবু সমর্থকদের মতে, তিনি কখনো আপস করেননি দেশের মানুষের অধিকার ও গণতন্ত্রের প্রশ্নে। তার শেষ বিদায়ে লাখো মানুষের উপস্থিতি যেন সেই দীর্ঘ লড়াইয়েরই নীরব স্বীকৃতি।

জানাজায় অংশ নেওয়া সাধারণ মানুষের অনেকেই বলেন, খালেদা জিয়া শুধু একজন রাজনৈতিক নেতা নন, বরং বহু মানুষের কাছে ছিলেন অভিভাবকের মতো। কেউ এসেছেন সন্তানের হাত ধরে, কেউ বৃদ্ধ বয়সে লাঠিতে ভর দিয়ে, কেউবা দূর গ্রাম থেকে পায়ে হেঁটে—সবার চোখেমুখে ছিল শোক আর কৃতজ্ঞতার ছাপ। তাদের ভাষায়, ইতিহাসের পাতায় খালেদা জিয়ার নাম লেখা থাকবে একজন আপসহীন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে, যিনি ভালোবাসা আর বিরোধিতার মধ্য দিয়েও মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী আসন করে নিয়েছেন।

এই জানাজা শুধু একজন নেত্রীর বিদায় নয়, বরং বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক অধ্যায়ের সমাপ্তি। লাখো মানুষের সম্মিলিত দোয়া, অশ্রু আর ভালোবাসায় বিদায় নিলেন বেগম খালেদা জিয়া। তার দীর্ঘ ৪৫ বছরের রাজনৈতিক সংগ্রাম ও অবদান সময়ের স্রোত পেরিয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছেও স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত