প্রকাশ: ০১ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
নতুন বছরের প্রথম প্রহরে নিউইয়র্ক সিটির ইতিহাসে যুক্ত হতে যাচ্ছে এক ব্যতিক্রমী ও প্রতীকী অধ্যায়। যখন হাজার হাজার মানুষ টাইমস স্কয়ারে জড়ো হয়ে ২০২৬ সালের ক্ষণ গণনায় অংশ নেবেন, ঠিক সেই মুহূর্তে শহরের নতুন মেয়র হিসেবে শপথ নিতে যাচ্ছেন জোহরান মামদানি। তবে এই শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান কোনো প্রচলিত সরকারি ভবনে নয়, বরং একটি পরিত্যক্ত সাবওয়ে স্টেশনে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, যা নিউইয়র্কের ইতিহাস, সংগ্রাম ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।
শপথের জন্য বেছে নেওয়া হয়েছে একটি সাবেক সাবওয়ে স্টেশন, যা যুক্তরাষ্ট্রের তথাকথিত ‘সোনালি যুগে’ নির্মিত হয়েছিল। বর্তমানে এটি লোকাল ‘৫ নম্বর’ ট্রেনের ঘোরার পথ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। প্রতিদিন হাজার হাজার ট্রেন যাত্রী এই পথ অতিক্রম করলেও স্টেশনটি নিজে একসময়কার মতো সক্রিয় নয়। এই পরিত্যক্ত অথচ ইতিহাসসমৃদ্ধ স্থানকেই মামদানি বেছে নিয়েছেন ‘একটি নতুন যুগের সূচনার’ প্রতীক হিসেবে। তাঁর মতে, এটি এমন একটি সময়ের স্মারক, যখন নিউইয়র্ক শহর বড় স্বপ্ন দেখার সাহস করত এবং শ্রমজীবী মানুষের জীবন বদলে দেওয়ার মতো প্রকল্প বাস্তবায়ন করত।
শপথ গ্রহণের আগে দেওয়া এক বিবৃতিতে মামদানি বলেন, এই স্টেশন একটি শহরের স্মৃতিস্তম্ভ, যা একসময় কেবল সুন্দর হওয়ার সাহসই দেখায়নি, বরং সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়নে বড় সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। তিনি বলেন, সেই উচ্চাকাঙ্ক্ষা শুধু অতীতের গল্প হয়ে থাকা উচিত নয়, কিংবা সিটি হলের নিচে থাকা টানেলগুলোতে আটকে পড়া কোনো স্মৃতিতে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। বরং সেই চেতনা নতুন করে ফিরিয়ে আনার সময় এসেছে। তাঁর ভাষায়, এই শপথ অনুষ্ঠান সেই লক্ষ্য ও প্রত্যয়েরই প্রকাশ।
নিউইয়র্ক সিটির ইতিহাসে এই শপথ অনুষ্ঠান তাই শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং একটি রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বার্তা বহন করছে। মামদানি নিজেকে এমন এক নেতা হিসেবে তুলে ধরতে চাইছেন, যিনি ক্ষমতার প্রতীকী মঞ্চ নয়, বরং শ্রমজীবী মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে যুক্ত স্থান থেকে নেতৃত্বের দায়িত্ব শুরু করতে চান। সাবওয়ে নিউইয়র্কবাসীর জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ, আর সেই সাবওয়ের এক পরিত্যক্ত স্টেশন থেকেই তাঁর যাত্রা শুরু হওয়াকে অনেকেই দেখছেন প্রতীকী রাজনৈতিক ঘোষণার মতো।
শপথ অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রগতিশীল রাজনীতির শীর্ষস্থানীয় কয়েকজন নেতা। মামদানিকে আনুষ্ঠানিকভাবে পরিচয় করিয়ে দেবেন ডেমোক্র্যাট কংগ্রেস সদস্য আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও-কর্টেজ, যিনি নিজেও নিউইয়র্কের প্রগতিশীল আন্দোলনের অন্যতম মুখ। তাঁর সঙ্গে থাকবেন বামপন্থি রাজনীতির আইকন এবং ভার্মন্টের সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স। শপথ পাঠ করাবেন নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের অ্যাটর্নি জেনারেল লেটিশিয়া জেমস। এই উপস্থিতি মামদানির রাজনৈতিক অবস্থান ও আদর্শিক দিকনির্দেশনাকে আরও স্পষ্ট করে তুলছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
৩৪ বছর বয়সি জোহরান মামদানি শুধু নিউইয়র্ক সিটির সর্বকনিষ্ঠ মেয়রই নন, তিনি একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম কোনো মুসলমান এবং দক্ষিণ এশীয় বংশোদ্ভূত নেতা, যিনি এই শহরের মেয়র নির্বাচিত হলেন। গত ১০০ বছরের মধ্যে এত কম বয়সে নিউইয়র্কের নেতৃত্বে আর কেউ আসেননি। এই বাস্তবতা তাঁকে শুধু শহরের নয়, বরং জাতীয় রাজনীতিরও এক আলোচিত চরিত্রে পরিণত করেছে।
গত ৪ নভেম্বর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে মামদানি বিপুল ভোটে পরাজিত করেন সাবেক গভর্নর অ্যান্ড্রিও কুওমো এবং রিপাবলিকান প্রার্থী কার্টিস স্লিওয়ারকে। নির্বাচনী প্রচারে তিনি আবাসন সংকট, গণপরিবহন উন্নয়ন, সামাজিক বৈষম্য হ্রাস, শ্রমজীবী মানুষের অধিকার এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলাকে প্রধান ইস্যু হিসেবে সামনে আনেন। বিশেষ করে তরুণ ভোটার, অভিবাসী সম্প্রদায় এবং প্রগতিশীল রাজনীতিতে বিশ্বাসী নাগরিকদের মধ্যে তাঁর ব্যাপক সমর্থন দেখা যায়।
নিউইয়র্কের মতো বৈচিত্র্যপূর্ণ ও জটিল শহরের নেতৃত্ব নেওয়া যে সহজ নয়, তা মামদানি নিজেও স্বীকার করেছেন। শপথ গ্রহণের আগে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, লাখ লাখ নিউইয়র্কবাসীকে নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ পেয়ে তিনি সম্মানিত ও দায়িত্ববোধে আবদ্ধ বোধ করছেন। তাঁর মতে, এই শহর কেবল আকাশচুম্বী ভবন বা আর্থিক কেন্দ্রের নাম নয়; এটি অভিবাসী, শ্রমিক, শিল্পী ও স্বপ্নবাজ মানুষের শহর। সেই বাস্তবতাকে সম্মান করেই তিনি তাঁর মেয়াদ শুরু করতে চান।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মামদানির শপথ গ্রহণের ধরন ও বক্তব্য স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দিচ্ছে যে তিনি প্রচলিত রাজনৈতিক ধারার বাইরে গিয়ে নতুন এক বয়ান তৈরি করতে চান। সাবওয়ে স্টেশনে শপথ নেওয়ার সিদ্ধান্তকে অনেকেই দেখছেন প্রথা ভাঙার সাহসী পদক্ষেপ হিসেবে। এটি একদিকে যেমন নিউইয়র্কের শ্রমজীবী মানুষের প্রতি সম্মান প্রদর্শন, অন্যদিকে তেমনি ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে সরে এসে সাধারণ মানুষের কাছাকাছি থাকার প্রতীক।
নিউইয়র্ক সিটি দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতি, অর্থনীতি ও সংস্কৃতির কেন্দ্রবিন্দু। এই শহরের মেয়র হওয়া মানে শুধু প্রশাসনিক দায়িত্ব নয়, বরং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়েও একটি শক্তিশালী কণ্ঠস্বর পাওয়া। মামদানির উত্থান তাই শুধু স্থানীয় রাজনীতির ঘটনা নয়; এটি যুক্তরাষ্ট্রে বহুসাংস্কৃতিক সমাজ, অভিবাসী পরিচয় এবং প্রগতিশীল রাজনীতির ভবিষ্যৎ নিয়েও নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
২০২৬ সালের প্রথম মুহূর্তে পরিত্যক্ত সাবওয়ে স্টেশনে শপথ নেওয়ার মধ্য দিয়ে জোহরান মামদানি যে যাত্রা শুরু করছেন, তা অনেকের কাছে একটি নতুন সময়ের প্রতীক। নিউইয়র্কবাসীর প্রত্যাশা, এই তরুণ মেয়র তাঁর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী শহরকে আরও ন্যায্য, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও মানবিক করে তুলবেন। সময়ই বলে দেবে, এই প্রতীকী সূচনা কতটা বাস্তব পরিবর্তনে রূপ নেয়, তবে আপাতত নিউইয়র্ক সিটির ইতিহাসে এটি নিঃসন্দেহে এক স্মরণীয় মুহূর্ত।