প্রকাশ: ০১ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মাদক চোরাচালানের অভিযোগে ফের নৌযানে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী। সাম্প্রতিক এই অভিযানে অন্তত পাঁচজন নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে মার্কিন সামরিক বাহিনীর সাউথ কমান্ড। বুধবার এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানানো হলেও, ঠিক কোন এলাকায় হামলাটি চালানো হয়েছে, সে বিষয়ে স্পষ্ট কোনো বিবরণ দেওয়া হয়নি। এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের এমন হামলা মূলত ক্যারিবিয়ান সাগর ও পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগর এলাকায় পরিচালিত হয়েছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। এই ঘটনার পর আবারও আন্তর্জাতিক মহলে যুক্তরাষ্ট্রের সামুদ্রিক সামরিক অভিযান ও মানবাধিকার প্রশ্নে নতুন বিতর্ক শুরু হয়েছে।
মার্কিন সাউথ কমান্ডের বিবৃতিতে বলা হয়, মাদক চোরাচালানে জড়িত সন্দেহে কয়েকটি নৌযানকে লক্ষ্য করে এই অভিযান চালানো হয়। প্রথম দফার অভিযানে একটি নৌকায় থাকা তিনজন মাদক পাচারকারী নিহত হন। হামলার সময় অন্য দুটি নৌকার আরোহীরা প্রাণ বাঁচাতে পানিতে লাফ দিয়ে পালানোর চেষ্টা করেন। তবে পরবর্তী অভিযানে ওই নৌকাগুলোকেও লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয় এবং সেগুলো ডুবিয়ে দেওয়া হয়। পরে দ্বিতীয় দফার হামলায় আরও দুইজন নিহত হওয়ার কথা নিশ্চিত করে মার্কিন সামরিক বাহিনী। সব মিলিয়ে এই অভিযানে নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে পাঁচজনে।
বিবৃতিতে আরও জানানো হয়, সম্ভাব্যভাবে জীবিত কেউ থাকলে তাদের উদ্ধারের জন্য ঘটনাস্থলে যুক্তরাষ্ট্রের কোস্টগার্ডকে তৎপর হতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ জন্য ‘সার্চ অ্যান্ড রেসকিউ সিস্টেম’ সক্রিয় করার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে বলে জানায় সাউথ কমান্ড। তবে মানবাধিকার সংগঠন ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের একটি বড় অংশের অভিযোগ, এ ধরনের বিবৃতিতে উদ্ধার তৎপরতার কথা বলা হলেও বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে তা প্রশ্নবিদ্ধ থেকে যায়। এবারের হামলার ক্ষেত্রেও যুক্তরাষ্ট্র তাদের অভিযোগের পক্ষে কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ প্রকাশ করেনি।
এই হামলার খবর প্রথম প্রকাশ করেছে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা। প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে মাদক চোরাচালান দমনের নামে আন্তর্জাতিক জলসীমায় কঠোর সামরিক অভিযান পরিচালনা করে আসছে। তবে এসব অভিযানে নিহতদের প্রকৃত পরিচয়, তারা সশস্ত্র ছিল কি না, কিংবা আত্মরক্ষার কোনো সুযোগ পেয়েছিল কি না—এসব প্রশ্নের সুস্পষ্ট উত্তর প্রায়শই পাওয়া যায় না। ফলে প্রতিবারই এমন অভিযানের পর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠে আসে।
এর আগে গত সেপ্টেম্বর মাসে একই ধরনের একটি অভিযানের পর যুক্তরাষ্ট্র প্রবল সমালোচনার মুখে পড়ে। সে সময় একটি নৌযান উল্টে যাওয়ার পরও সেখানে ফের হামলা চালানো হয় বলে অভিযোগ ওঠে, যার ফলে বেঁচে থাকা ব্যক্তিদেরও প্রাণ হারাতে হয়। সেই ঘটনার পর যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকজন ডেমোক্রেটিক আইন প্রণেতা এবং আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞরা বলেন, ওই অভিযানে আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকার চরমভাবে লঙ্ঘিত হয়েছে এবং তা কার্যত একটি অপরাধের শামিল। তারা যুক্তরাষ্ট্র সরকারের কাছে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত ও জবাবদিহির দাবি জানান।
তবে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন এবং কিছু রিপাবলিকান আইন প্রণেতা বরাবরের মতোই এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে আসছেন। তাদের দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী আন্তর্জাতিক আইন ও নিজস্ব নিয়মকানুন মেনেই এসব অভিযান পরিচালনা করছে। ট্রাম্প প্রশাসনের বক্তব্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক মাদক চোরাচালান যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি এবং তা দমনে প্রয়োজন হলে শক্ত অবস্থান নেওয়াই যুক্তিযুক্ত। তাদের মতে, এসব নৌযান সাধারণত বিপজ্জনক চোরাচালান নেটওয়ার্কের অংশ, যারা সহিংসতায় জড়াতে দ্বিধা করে না।
তবে সমালোচকদের মতে, ‘জাতীয় নিরাপত্তা’ কিংবা ‘মাদকবিরোধী যুদ্ধ’—এই দুটি যুক্তি ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক জলসীমায় বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড চালাচ্ছে কি না, সেই প্রশ্নটি ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন অনুযায়ী, সন্দেহভাজন অপরাধীকেও আত্মসমর্পণের সুযোগ দিতে হয় এবং জীবননাশ শেষ বিকল্প হওয়া উচিত। কিন্তু এসব সামরিক অভিযানে সেই নীতির যথাযথ প্রতিফলন দেখা যায় না বলেই অভিযোগ।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের মাদকবিরোধী সামুদ্রিক অভিযান একটি দীর্ঘদিনের কৌশলগত নীতির অংশ। লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে উৎপাদিত বা পরিবাহিত মাদক যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ ঠেকাতে তারা নিয়মিতভাবে নৌ ও আকাশপথে নজরদারি চালায়। কিন্তু এই নীতির ফলাফল নিয়ে বিতর্ক আছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র দাবি করছে, এসব অভিযানে বিপুল পরিমাণ মাদক জব্দ করা হচ্ছে এবং চোরাচালান নেটওয়ার্ক দুর্বল হচ্ছে। অন্যদিকে সমালোচকরা বলছেন, এতে মাদক ব্যবসা পুরোপুরি বন্ধ হচ্ছে না, বরং নিরীহ নাবিক বা দরিদ্র মানুষের প্রাণ ঝুঁকিতে পড়ছে।
সাম্প্রতিক এই হামলার ক্ষেত্রেও নিহত ব্যক্তিদের পরিচয় বা তারা কোন দেশের নাগরিক ছিলেন, সে বিষয়ে কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। এতে করে নিহতদের পরিবার বা সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রগুলোর প্রতিক্রিয়া কী হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, এ ধরনের ঘটনায় সংশ্লিষ্ট দেশগুলো প্রায়ই কূটনৈতিক উদ্বেগ প্রকাশ করে এবং ঘটনার স্বচ্ছ তদন্ত দাবি করে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি এসব অভিযানের বিষয়ে আরও স্বচ্ছতা না দেখায়, তাহলে ভবিষ্যতে এটি কেবল মানবাধিকার প্রশ্নেই নয়, বরং কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও জটিলতা তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবিয়ান অঞ্চলের দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা সামরিক তৎপরতা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে আসছে।
সব মিলিয়ে, মাদক চোরাচালানের অভিযোগে নৌযানে যুক্তরাষ্ট্রের সর্বশেষ এই হামলা আবারও একটি পুরোনো বিতর্ককে সামনে নিয়ে এসেছে। একদিকে জাতীয় নিরাপত্তা ও মাদকবিরোধী যুদ্ধের যুক্তি, অন্যদিকে মানবাধিকার, আন্তর্জাতিক আইন ও জবাবদিহির প্রশ্ন—এই দুইয়ের টানাপোড়েনে আন্তর্জাতিক মহল নতুন করে ভাবতে বাধ্য হচ্ছে। নিহত পাঁচজনের ঘটনা হয়তো সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে একটি ‘অভিযান’ হিসেবে বিবেচিত হবে, কিন্তু মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে এটি আরও এক দফা প্রাণহানির গল্প, যা বিশ্ববিবেককে নাড়া দিচ্ছে।