প্রকাশ: ০১ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
২০২৫ সাল জেনারেশন-জেড বা ‘জেন-জি’ প্রজন্মের বিক্ষোভকে বিশ্বজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করেছে। তরুণদের নেতৃত্বে শুরু হওয়া এই আন্দোলনগুলোর প্রভাব শুধু রাজনৈতিকই নয়, সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও তা গভীর প্রতিফলন ফেলেছে। যেসব দেশে এই বিক্ষোভ সংঘটিত হয়েছে, সেখানে সরকার ও সমাজের মধ্যে স্থিতিশীলতা ফেরানো এখনো চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই প্রজন্মের মানুষরা, যারা মূলত ১৯৯৭ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে জন্মগ্রহণ করেছে, ডিজিটাল প্রযুক্তির সঙ্গে বেড়ে উঠেছে। তথ্যপ্রযুক্তি, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং ভিডিও গেমের মাধ্যমে তারা সহজেই রাজনৈতিক সচেতনতা, নেতৃত্ব এবং সংগঠন তৈরি করতে সক্ষম। এই প্রযুক্তিগত সুবিধা তাদের বিক্ষোভকে বিশ্বব্যাপী দৃষ্টি আকর্ষণ করার ক্ষমতা দিয়েছে।
জেন-জি আন্দোলনের সূচনা ২০২২ সালে শ্রীলঙ্কায় ঘটে। সেখানে দুর্নীতি, বেকারত্ব এবং অর্থনৈতিক দুরবস্থার প্রতিবাদে তরুণরা ‘আরাগালায়া’ আন্দোলন শুরু করে, যা শেষ পর্যন্ত রাজাপাকসে সরকারের পতন ঘটায়। পরবর্তীতে ২০২৪ সালে বাংলাদেশের তরুণরা দীর্ঘমেয়াদী স্বৈরতান্ত্রিক সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভে অংশ নিয়ে তা রূপান্তরিত করে। এই ধারাবাহিকতায় ২০২৫ সালে জেন-জি বিক্ষোভ বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে।
২০২৫ সালের শুরুতেই ইন্দোনেশিয়ায় বেকারত্ব, কর্মী ছাঁটাই এবং উচ্চ করসহ নানা অর্থনৈতিক চাপে দেশটির ছাত্র-জনতা আন্দোলনে নামে। ১০ মাস ধরে চলা বিক্ষোভের ফলশ্রুতিতে আগস্টে দেশটির শ্রমমন্ত্রী অপসারণে বাধ্য হন। শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদ ও সরকারের ওপর চাপের ফলে কর্মকর্তাদের বরখাস্ত ও নীতিনির্ধারণে পরিবর্তন আসে। এই আন্দোলনের সময় পুলিশি পদক্ষেপে নিহত হন কয়েকজন ছাত্র, আর আহত হন হাজারেরও বেশি।
ইন্দোনেশিয়ার পরপরই ফিলিপিন্সে সেপ্টেম্বরের প্রথম দিকে জেন-জি বিক্ষোভ শুরু হয়। বন্যাবিপর্যয় নিয়ন্ত্রণে দুর্নীতির অভিযোগে আইনপ্রণেতা ও সরকারি কর্মকর্তাদের বিচারের দাবিতে সারা দেশে লাখ লাখ মানুষ আন্দোলনে অংশ নেন। এই বিক্ষোভ এখনও বিচ্ছিন্নভাবে চলমান রয়েছে।
নেপালে সেপ্টেম্বরে সীমাহীন দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিষেধাজ্ঞার প্রতিবাদে তরুণরা বিক্ষোভে নামে। রাজধানী কাঠমান্ডুতে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে ৭২ জন নিহত এবং এক হাজার ৩০০-এর বেশি আহত হন। তরুণদের এই তীব্র প্রতিবাদের কারণে প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা অলি ও অন্যান্য মন্ত্রীরা পদত্যাগ করেন। এখানে আন্দোলনের পেছনে প্রযুক্তি ও ভিডিও গেমের মাধ্যমে তরুণ নেতা হিসেবে কাজ করেছেন একজন সাবেক ডিজে।
দক্ষিণ আমেরিকার দেশ পেরুতে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরের শেষ ও অক্টোবরের শুরুতে দুর্নীতি ও বেকারত্বের প্রতিবাদে জেন-জি আন্দোলন হয়। আন্দোলনের ফলে প্রেসিডেন্ট দিনা বলুয়ার্ত পদত্যাগ করেন এবং নতুন প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন জোসে জেরি।
পাশাপাশি পূর্ব আফ্রিকার দ্বীপদেশ মাদাগাস্কারে ২৫ সেপ্টেম্বর তীব্র পানি ও বিদ্যুৎ সংকট ও রাজনৈতিক দুর্নীতির প্রতিবাদে আন্দোলন শুরু হয়। সেনা অভ্যুত্থানের ধারাবাহিকতায় অক্টোবর মাসে প্রেসিডেন্ট আন্দ্রি রাজোয়েলিনা ক্ষমতাচ্যুত হয়ে দেশত্যাগ করেন।
মরক্কো, মেক্সিকো, বুলগেরিয়া ও কেনিয়াতেও জেন-জি প্রজন্মের তরুণরা সরকারের দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি এবং অবিচারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে অংশ নেন। এই আন্দোলনের ফলে সরকারগুলোর ভিত কম্পনিত হয়, নতুন নীতি গ্রহণের চাপ বৃদ্ধি পায় এবং সামাজিক সচেতনতার বিস্তার ঘটে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, জেন-জি আন্দোলনের মূল বৈশিষ্ট্য হলো তরুণদের প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষমতা, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দ্রুত সংগঠন তৈরি করা এবং একে অপরের সঙ্গে সমন্বয় সাধনের দক্ষতা। তবে অনেক ক্ষেত্রেই আন্দোলনগুলো আরব বসন্তের মতো দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীল পরিবর্তনে রূপান্তরিত হচ্ছে না। সরকারের বিরুদ্ধে এই চাপ থাকা সত্ত্বেও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা অনেক দেশেই এখনো চ্যালেঞ্জ।
জেন-জি বিক্ষোভ শুধু সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করেনি, বরং তরুণদের মধ্যে নাগরিক দায়িত্ব, স্বাধীনতা ও রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধি করেছে। এই প্রজন্মের সাহস, উদ্ভাবনী ক্ষমতা ও বিশ্বব্যাপী সংযোগ বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।
২০২৫ সালের জেন-জি আন্দোলন দেখিয়েছে, বিশ্বে তরুণ সমাজ কেবল সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের অংশ নয়, তারা এই পরিবর্তনের প্রধান চালিকা শক্তিও। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এই আন্দোলনের পরিসর, প্রভাব ও ফলাফল পর্যালোচনা করে বোঝা যাচ্ছে যে, জেন-জি প্রজন্মের ক্ষমতা এবং প্রযুক্তি ব্যবহার বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন চ্যালেঞ্জ এবং সম্ভাবনা উভয়ই সৃষ্টি করেছে।