প্রকাশ: ০১ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ফ্রান্স সরকার ১৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার নিষিদ্ধ করার পরিকল্পনা করছে। সরকারের নতুন খসড়া আইনে বলা হয়েছে, অনলাইন নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং শিশুদের অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম থেকে রক্ষা করার জন্য এই পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। এটি সেপ্টেম্বরের মধ্যে কার্যকর করার লক্ষ্য রাখা হয়েছে। ফরাসি রাষ্ট্রপতি ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ ইতিমধ্যেই এই প্রস্তাবকে সমর্থন জানিয়েছেন এবং জানুয়ারিতে সংসদে বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক শুরু করার আহ্বান জানিয়েছেন।
সরকারের খসড়া আইনের দাবি, অনলাইন প্ল্যাটফর্মে শিশুদের জন্য রয়েছে নানা ঝুঁকি, যার মধ্যে অনাকাঙ্ক্ষিত বিষয়বস্তু, অনলাইন হয়রানি এবং ঘুমের ব্যাঘাত উল্লেখযোগ্য। শিশুদের সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য এই পদক্ষেপ অপরিহার্য বলে মনে করছে ফরাসি সরকার। আইনের খসড়ায় বলা হয়েছে, স্কুল পর্যায়ে মোবাইল ফোন ব্যবহারের উপর নিষেধাজ্ঞা রাখা হবে। এ ধরনের সীমাবদ্ধতা শিশুকে অনাকাঙ্ক্ষিত অনলাইন বিপদ ও সাইবার হয়রানি থেকে রক্ষা করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শিশুদের ডিজিটাল অভিজ্ঞতা সীমিত করা তাদের মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। আধুনিক সমাজে ছোটদের মধ্যে সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যবহার ক্রমবর্ধমান, যা প্রায়শই ঘুমের ব্যাঘাত, একাকিত্ব এবং উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
ফ্রান্সের এই উদ্যোগকে বিশ্বব্যাপী নজরদারি হিসেবে দেখা হচ্ছে। শিশুরা যে বয়সে সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রবেশ করছে, সে সময় তাদের মানসিক ও সামাজিক উন্নয়ন ক্রমশ প্রভাবিত হচ্ছে। সরকার মনে করছে, ১৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য অনলাইন প্ল্যাটফর্মে প্রবেশ সীমিত করলে তারা কৃত্রিম চাপ, অনাকাঙ্ক্ষিত যোগাযোগ এবং অনুপযুক্ত কন্টেন্ট থেকে নিরাপদ থাকবে।
অস্ট্রেলিয়া ইতিমধ্যেই ১৬ বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া নিষিদ্ধ করার প্রথম দেশ হিসেবে পরিচিত। ফ্রান্সের এই প্রস্তাব আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে শিশুদের ডিজিটাল নিরাপত্তা বিষয়ক নীতিতে নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে। ফরাসি আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি শুধু আইনি বিধান নয়, বরং শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক পদক্ষেপ।
সরকারের মতে, শিশুদের অবাধ অনলাইন অ্যাক্সেস তাদের নৈতিক ও সামাজিক মানসিকতায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। খসড়া আইনে স্কুল পর্যায়ে মোবাইল ফোনের ব্যবহারও সীমিত করার কারণ হলো, শিক্ষার্থীদের একাগ্রতা বজায় রাখা এবং অনলাইন চরম প্রভাব থেকে রক্ষা করা। এটি শিক্ষার পরিবেশকে আরও সুস্থ ও মনোযোগপূর্ণ করবে বলে মনে করা হচ্ছে।
ফরাসি সমাজের বিভিন্ন স্তর থেকে বিষয়টি নিয়ে ইতিমধ্যেই প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছে। পিতামাতা ও শিশুদের অধিকার রক্ষাকারী সংস্থাগুলো সমর্থন জানিয়েছে, তবে কিছু প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ এবং শিক্ষাবিদ বিষয়টি বাস্তবায়নকে জটিল বলছেন। তারা মনে করছেন, শিশুদের ডিজিটাল দক্ষতা ও সামাজিক সংযোগের জন্য যথাযথ নিয়ন্ত্রণ থাকা উচিত, তবে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করাটা কিছু ক্ষেত্রে ক্ষতিকর হতে পারে।
ফ্রান্স সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হলে শিশুদের সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রবেশের জন্য বয়স যাচাই ব্যবস্থা, পিতামাতা নিয়ন্ত্রণ এবং স্কুল পর্যায়ের পর্যবেক্ষণ শক্তিশালী করা হবে। সরকারের আশা, এই পদক্ষেপ শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষা করবে, ঘুমের সময় নিশ্চিত করবে এবং অনলাইন হয়রানি ও ঝুঁকি কমাবে।
এদিকে, শিশু অধিকার সংস্থাগুলোও ফ্রান্সের এই উদ্যোগকে প্রাসঙ্গিক ও যুগোপযোগী বলে অভিহিত করেছে। তারা বলছে, সোশ্যাল মিডিয়ার অল্পবয়সী শিশুদের ব্যবহার ক্রমবর্ধমান উদ্বেগের কারণ। শিক্ষাবিদরা মনে করেন, এই প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে শিশুদের নিরাপদ অনলাইন অভিজ্ঞতা নিশ্চিত হবে এবং তাদের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা বজায় থাকবে।
ফ্রান্সের এই পদক্ষেপ বিশ্বে শিশুদের ডিজিটাল নিরাপত্তা নীতি প্রণয়নে নতুন দিক নির্দেশ করতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অন্যান্য ইউরোপীয় দেশও শিশুদের জন্য অনলাইন নিরাপত্তা আইন কঠোর করার দিকে মনোযোগ দিতে পারে।
ফরাসি সংসদে আইনের বিষয়ে আলোচনা শুরু হলে আগামী মাসে আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সরকারের লক্ষ্য, ২০২৬ সালের মধ্যে শিশুদের সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের ওপর সুনির্দিষ্ট নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা।
ফ্রান্স সরকারের এই উদ্যোগ শিশুদের সুরক্ষায় একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এটি শুধু অনলাইন নয়, স্কুল ও সামাজিক পরিবেশেও শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করবে এবং তাদের মানসিক ও শারীরিক বিকাশে সহায়ক হবে।