প্রকাশ: ০১ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকা ও অধিকৃত পশ্চিম তীরে মানবিক সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনাকারী ৩৭টি আন্তর্জাতিক ত্রাণ সংস্থার লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্তকে ঘিরে নতুন করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। ইসরাইলের এই সিদ্ধান্তের কঠোর নিন্দা জানিয়ে জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস বলেছেন, এ ধরনের পদক্ষেপ শুধু মানবিক সহায়তাকে ব্যাহতই করবে না, বরং আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘ সনদের সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক। গাজায় চরম মানবিক সংকটের মধ্যে এমন সিদ্ধান্ত পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তিনি।
ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নতুন নিবন্ধন নীতিমালার শর্ত পূরণে ব্যর্থ হওয়ায় এসব ত্রাণ সংস্থার লাইসেন্স বাতিল বা স্থগিত করা হচ্ছে। এই সিদ্ধান্তের আওতায় জাতিসংঘের ফিলিস্তিন বিষয়ক শরণার্থী সংস্থা ইউএনআরডব্লিউএ ছাড়াও আন্তর্জাতিকভাবে সুপরিচিত কয়েকটি বেসামরিক মানবিক সংগঠন—যেমন অ্যাকশন এইড, ইন্টারন্যাশনাল রেসকিউ কমিটি এবং নরওয়েজিয়ান রিফিউজি কাউন্সিলের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যেতে পারে। ইসরাইলের ঘোষণা অনুযায়ী, আগামী ১ জানুয়ারি থেকে এসব সংস্থার লাইসেন্স স্থগিত হবে এবং ৬০ দিনের মধ্যে তাদের সব কার্যক্রম গুটিয়ে নিতে হবে।
এই ঘোষণার পরপরই জাতিসংঘ সদর দপ্তর থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ইউএনআরডব্লিউএ গাজা ও পশ্চিম তীরে লক্ষ লক্ষ ফিলিস্তিনি শরণার্থীর জন্য খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও জরুরি সহায়তা নিশ্চিত করে আসছে। এমন একটি সময়ে, যখন গাজায় মানবিক পরিস্থিতি নজিরবিহীন সংকটে পৌঁছেছে, তখন এই সংস্থার কাজ বাধাগ্রস্ত করা মানে অসংখ্য নিরীহ মানুষের জীবন ও ভবিষ্যৎকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেওয়া।
গুতেরেসের ভাষায়, ইসরাইলের এই সিদ্ধান্ত ইউএনআরডব্লিউএর পরিচালন দক্ষতাকে মারাত্মকভাবে দুর্বল করবে এবং গাজায় চলমান মানবিক সহায়তা ব্যবস্থাকে ভেঙে পড়ার দিকে ঠেলে দেবে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ইউএনআরডব্লিউএ জাতিসংঘের একটি অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। জাতিসংঘ সনদ, জাতিসংঘের বিশেষাধিকার ও দায়মুক্তি সংক্রান্ত কনভেনশন অনুযায়ী সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে ইসরাইলের এই সংস্থার কার্যক্রমে সহযোগিতা করার আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
ইসরাইলের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতার স্বার্থেই নতুন নিবন্ধন নীতিমালা চালু করা হয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, এই নীতিমালা কার্যত ফিলিস্তিনি জনগণের জন্য জীবনরক্ষাকারী সহায়তা বন্ধ করার একটি কৌশল। বিশেষজ্ঞদের মতে, যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজায় যেখানে খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও চিকিৎসা সরঞ্জামের তীব্র সংকট চলছে, সেখানে ত্রাণ সংস্থাগুলোর কার্যক্রম সীমিত করা মানবিক আইন লঙ্ঘনের শামিল।
গাজা উপত্যকায় বর্তমানে লাখো মানুষ বাস্তুচ্যুত, হাসপাতালগুলো কার্যত অচল এবং শিশু ও নারীদের মধ্যে অপুষ্টির হার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। এই পরিস্থিতিতে ইউএনআরডব্লিউএসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোই মূলত মানবিক সহায়তার শেষ ভরসা। জাতিসংঘের বিভিন্ন প্রতিবেদনে আগেই সতর্ক করা হয়েছে যে, সহায়তা প্রবাহ ব্যাহত হলে গাজায় দুর্ভিক্ষ ও ব্যাপক প্রাণহানির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
গুতেরেস আরও বলেন, আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী একটি দখলদার শক্তি হিসেবে ইসরাইলের দায়িত্ব রয়েছে বেসামরিক জনগণের মৌলিক চাহিদা নিশ্চিত করা এবং মানবিক সহায়তার পথ সুগম রাখা। ত্রাণ সংস্থাগুলোর লাইসেন্স বাতিলের মতো সিদ্ধান্ত সেই দায়িত্বের পরিপন্থী। তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানান, এই ইস্যুতে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে এবং ইসরাইলের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে, যাতে সিদ্ধান্তটি অবিলম্বে প্রত্যাহার করা হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, ইউএনআরডব্লিউএ দীর্ঘদিন ধরেই ইসরাইলের সমালোচনার মুখে রয়েছে। ইসরাইল বিভিন্ন সময় এই সংস্থার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। তবে জাতিসংঘ ও অধিকাংশ দাতা দেশ ইউএনআরডব্লিউএর ভূমিকা ও প্রয়োজনীয়তার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। তাদের মতে, রাজনৈতিক মতভেদ থাকলেও মানবিক সহায়তা কখনোই শাস্তির হাতিয়ার হতে পারে না।
আন্তর্জাতিক রাজনীতির পর্যবেক্ষকরা বলছেন, এই সিদ্ধান্ত শুধু ফিলিস্তিন সংকটকেই নয়, বরং ইসরাইল ও জাতিসংঘের সম্পর্ককেও নতুন করে টানাপোড়েনের দিকে নিয়ে যেতে পারে। ইতোমধ্যে বিভিন্ন ইউরোপীয় দেশ এবং মানবাধিকার সংগঠন ইসরাইলের পদক্ষেপের সমালোচনা করেছে। অনেকেই একে মানবিক আইন লঙ্ঘনের উদাহরণ হিসেবে আখ্যায়িত করছেন।
গাজা ও পশ্চিম তীরের সাধারণ মানুষ এই খবরে চরম উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, ইউএনআরডব্লিউএ ও অন্যান্য সংস্থার সহায়তা ছাড়া তাদের টিকে থাকা প্রায় অসম্ভব। খাদ্য বিতরণ, স্কুল পরিচালনা এবং চিকিৎসাসেবার বড় অংশই এই সংস্থাগুলোর ওপর নির্ভরশীল। লাইসেন্স বাতিল হলে তাদের দৈনন্দিন জীবন আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।
সব মিলিয়ে, ইসরাইলের এই সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যে প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে, তা শুধু কূটনৈতিক বিবৃতিতেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি মানবিক মূল্যবোধ, আন্তর্জাতিক আইন এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত জনগণের অধিকার রক্ষার প্রশ্নে একটি বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। জাতিসংঘ মহাসচিবের কণ্ঠে উচ্চারিত নিন্দা সেই উদ্বেগকেই স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত করছে। এখন দেখার বিষয়, আন্তর্জাতিক চাপ ও আলোচনার মাধ্যমে ইসরাইল তার অবস্থান পরিবর্তন করে কি না, নাকি গাজার মানবিক সংকট আরও গভীরতর হবে।