প্রকাশ: ০১ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা এলাকায় গণপিটুনিতে রায়হান খান (২৫) নামে এক যুবক নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। বৃহস্পতিবার ভোরে নাগবাড়ী এলাকায় এই ঘটনা ঘটে। নিহত রায়হান চাঁদপুর জেলার বহারিয়া বাজার এলাকার মৃত বিল্লাল খানের ছেলে। তিনি নারায়ণগঞ্জ শহরের তাঁতিপাড়া এলাকায় ইয়াসিন মিয়ার বাড়িতে ভাড়াটিয়া ছিলেন। খবর পেয়ে ফতুল্লা মডেল থানা পুলিশ মৃতদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতাল মর্গে পাঠায়।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, রায়হান খান দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় মাদক বিক্রি ও ছিনতাই কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তার বিরুদ্ধে ফতুল্লা মডেল থানায় একাধিক অভিযোগ রয়েছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, ছিনতাইয়ের অর্থ ভাগাভাগি নিয়ে বিরোধের জেরে স্থানীয়রা তাকে গণপিটুনির মাধ্যমে হত্যার ঘটনা ঘটিয়েছে।
ফতুল্লা মডেল থানার ওসি আব্দুল মান্নান জানান, নিহত রায়হান চিহ্নিত ছিনতাইকারী। তার বিরুদ্ধে একাধিক হত্যা ও ছিনতাই মামলা রয়েছে। নিহতের ক্রিমিনাল রেকর্ড অনুযায়ী, গত বুধবার রাতেও তিনি এক যুবকের কাছ থেকে এক হাজার ৫০০ টাকা ছিনিয়ে নিয়েছিলেন। বৃহস্পতিবার ভোরে আবারও ছিনতাইয়ের চেষ্টা করলে স্থানীয়রা তাকে আটকিয়ে গণপিটুনি দেয়, যা মৃত্যুর কারণ হয়।
এসআই রফিকুল ইসলাম ঘটনাস্থল থেকে লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। তিনি জানান, তদন্ত শেষে বিস্তারিত তথ্য শীঘ্রই জানানো হবে। পুলিশ স্থানীয়দের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এলাকার তল্লাশি ও পাহারা জোরদার করেছে।
নাগরিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রায়হান খানের ওপর স্থানীয়দের ক্রোধ মূলত তার দীর্ঘদিনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের কারণে। এলাকার সাধারণ মানুষ উল্লেখ করেছেন, রায়হান সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দুষ্টমুখী ও সহিংস হয়ে উঠেছিল। তার মাদক ব্যবসা ও ছিনতাই কর্মকাণ্ড এলাকার শান্তি ও নিরাপত্তাকে বিঘ্নিত করছিল। এই দীর্ঘসময় ধরে চলা ক্ষোভের ফলে তিনি গণপিটুনির শিকার হয়েছেন।
নিহতের লাশ মর্গে পৌঁছানোর পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, রায়হানকে প্রচণ্ড মারধরের কারণে গুরুতর আঘাত লেগেছিল, যা মৃত্যুর মূল কারণ। ময়নাতদন্ত শেষে বিস্তারিত প্রতিবেদনের মাধ্যমে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত করা হবে।
স্থানীয়রা এই ঘটনাকে এলাকার নিরাপত্তা ও সামাজিক শৃঙ্খলার জন্য সতর্কবার্তা হিসেবে দেখছেন। তারা আশা করছেন, পুলিশ এই ধরনের ঘটনা পুনরাবৃত্তি রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেবে। অন্যদিকে, পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, গণপিটুনি হলেও আইন অনুযায়ী দোষীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
রায়হান খানের এই মৃত্যুর ঘটনায় ফতুল্লা এলাকায় শোক ও উত্তেজনা বিরাজ করছে। পরিবারের সদস্যরা শোকাহত এবং তাদের দাবি, তদন্তে কোনো ধরনের তদারকি ছাড় দেওয়া না হোক। তারা চান, যারা এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত তাদের আইনের আওতায় আনা হোক।
এ ঘটনা আবারও একটি সামাজিক প্রশ্নের দিকে ইঙ্গিত করছে—দৈনন্দিন অপরাধ ও পুলিশের ভূমিকার সীমারেখা এবং সাধারণ মানুষ কখন আইন নিজের হাতে নেওয়ার পরিস্থিতিতে পড়ে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, গণপিটুনি যে কোনো সময় নিয়ন্ত্রণ হারানো ন্যায্য বিচার প্রক্রিয়ার বিকল্প হয়ে দাঁড়াতে পারে, যা সমাজে আরও সহিংসতার পথ প্রশস্ত করে।
নিহত রায়হান খানের পরিবার জানায়, তিনি স্থানীয়দের সঙ্গে মিশে কাজ করতেন এবং বাড়িতে ভাড়াটিয়া ছিলেন। তারা আশা প্রকাশ করেছেন, তদন্তে সত্য প্রকাশ পাবে এবং ন্যায্য বিচার নিশ্চিত হবে।
ফতুল্লা এলাকার এই দুঃখজনক ঘটনা সামাজিক সচেতনতার প্রয়োজনীয়তা আরও স্পষ্ট করে দিয়েছে। অপরাধীদের দমন, যুবসমাজের দিকনির্দেশনা এবং স্থানীয় প্রশাসনের তৎপরতা না থাকলে এমন ঘটনা ভবিষ্যতেও ঘটতে পারে।
নাগরিকদের মতে, মাদক ও ছিনতাই মূলক কার্যক্রম রুখতে স্থানীয় পর্যায়ে পুলিশি তৎপরতা ও সচেতনতা বাড়াতে হবে। অন্যথায় সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা ও শান্তি ঝুঁকিতে থাকবে।