বোয়িং থেকে ১৪ বিমান কিনতে এগোচ্ছে সরকার, কৌশলগত বার্তা যুক্তরাষ্ট্রকে

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ১ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৭৯ বার
বোয়িং থেকে ১৪ বিমান কিনতে এগোচ্ছে সরকার, কৌশলগত বার্তা যুক্তরাষ্ট্রকে

প্রকাশ: ০১ জানুয়ারী ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের বেসামরিক বিমান চলাচল ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কূটনীতিতে নতুন এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সূচনা হতে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িং থেকে ১৪টি নতুন বিমান কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের পরিচালনা পর্ষদ সম্প্রতি এক বোর্ড সভায় নীতিগতভাবে এই সিদ্ধান্ত অনুমোদন করেছে। বোর্ড সভায় গৃহীত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এখন বোয়িংয়ের সঙ্গে উড়োজাহাজগুলোর মূল্য, সরবরাহ সময়সূচি, অর্থায়ন কাঠামো ও অন্যান্য শর্তাবলি নিয়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনা এগিয়ে নেওয়া হবে।

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, গত মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত বোর্ড সভায় বোয়িং কোম্পানির ২৪ নভেম্বর ২০২৫ তারিখের প্রস্তাব এবং ২০ ডিসেম্বর ২০২৫-এ পাঠানো সংশোধিত খসড়া চুক্তি বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনা করা হয়। ওই প্রস্তাব অনুযায়ী, বোয়িং কোম্পানি বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের কাছে দুটি বোয়িং ৭৮৭-৯ ড্রিমলাইনার, আটটি বোয়িং ৭৮৭-১০ ড্রিমলাইনার এবং চারটি বোয়িং ৭৩৭-৮ মডেলের উড়োজাহাজ বিক্রি করতে আগ্রহ প্রকাশ করে। দীর্ঘ আলোচনার পর পরিচালনা পর্ষদ এই প্রস্তাবে নীতিগত সম্মতি প্রদান করে এবং দরদামসহ আনুষঙ্গিক বিষয়ে আলোচনা অব্যাহত রাখার অনুমোদন দেয়।

এই সিদ্ধান্ত এমন এক সময়ে এলো, যখন বাংলাদেশ সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও দৃঢ় করার কৌশলগত পদক্ষেপ নিচ্ছে। সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, বোয়িং থেকে বড় পরিসরে বিমান কেনার এই পরিকল্পনা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানি শুল্ক, পাল্টা শুল্ক ও বাণিজ্য সুবিধা নিয়ে চলমান দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় এটি একটি ইতিবাচক বার্তা হিসেবে কাজ করবে বলে মনে করা হচ্ছে।

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. শফিকুর রহমান বোয়িং কোম্পানির বাণিজ্যিক বিমান বিভাগের ভাইস প্রেসিডেন্ট পল রিঘির কাছে পাঠানো এক আনুষ্ঠানিক চিঠিতে বোর্ডের এই সিদ্ধান্তের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেন, বোর্ডের অনুমোদন চূড়ান্ত চুক্তি নয়, বরং এটি বোয়িংয়ের সঙ্গে আলোচনার একটি আনুষ্ঠানিক সূচনা মাত্র। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, চুক্তি স্বাক্ষর না হওয়া পর্যন্ত বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স কোনো ধরনের আর্থিক বা আইনি দায়বদ্ধতার মধ্যে আবদ্ধ থাকবে না। এই বক্তব্যের মাধ্যমে বোর্ড সিদ্ধান্তের আইনি ও আর্থিক সীমাবদ্ধতা পরিষ্কার করা হয়েছে।

বিমান সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বোয়িং ৭৮৭ সিরিজের ড্রিমলাইনার উড়োজাহাজগুলো দীর্ঘপাল্লার আন্তর্জাতিক রুটে জ্বালানি সাশ্রয়, আরামদায়ক যাত্রা এবং আধুনিক প্রযুক্তির জন্য বিশ্বব্যাপী পরিচিত। একই সঙ্গে বোয়িং ৭৩৭-৮ মডেলটি স্বল্প ও মধ্যপাল্লার রুটে অত্যন্ত কার্যকর। এই মডেলগুলোর সংযোজন হলে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বহর আরও আধুনিক হবে এবং ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা, পূর্ব এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের রুটে প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।

বর্তমানে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স বহর আধুনিকায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায় অতিক্রম করছে। অতীতে বহরের সীমাবদ্ধতা, বিমানের স্বল্পতা ও প্রযুক্তিগত সমস্যার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে বিমানের অবস্থান অনেক সময় প্রশ্নের মুখে পড়েছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বোয়িং থেকে নতুন উড়োজাহাজ যুক্ত হলে বিমানের সময়নিষ্ঠতা, সেবার মান এবং যাত্রী আস্থার উন্নতি ঘটবে। এর ফলে প্রবাসী বাংলাদেশি, পর্যটক ও ব্যবসায়ী যাত্রীদের কাছে জাতীয় পতাকাবাহী এয়ারলাইনের গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে।

এদিকে বোর্ড সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স শিগগিরই একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করবে। এই কমিটির দায়িত্ব হবে বোয়িংয়ের সঙ্গে দরদাম, অর্থায়ন পদ্ধতি, সরবরাহ সময়সূচি, প্রশিক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণসহ সংশ্লিষ্ট সব বিষয় নিয়ে আলোচনা করা। আলোচনা শেষে চূড়ান্ত প্রস্তাব বোর্ডে উপস্থাপন করা হবে এবং সেখান থেকে চুক্তি স্বাক্ষরের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, বোয়িং থেকে বিমান কেনার প্রসঙ্গ নতুন নয়। গত বছরের ২৭ জুলাই সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান সাংবাদিকদের জানান, পাল্টা শুল্ক নিয়ে দর কষাকষির অংশ হিসেবে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িংয়ের কাছ থেকে মোট ২৫টি বিমান কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তিনি বলেন, এই ক্রয়াদেশের কিছু বিমান আগামী এক থেকে দুই বছরের মধ্যে পাওয়া যেতে পারে।

বাণিজ্য সচিব আরও ব্যাখ্যা করেন, বোয়িং একটি বেসরকারি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান হলেও এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের সামগ্রিক বাণিজ্য স্বার্থ সংশ্লিষ্ট থাকে। বাংলাদেশসহ বিশ্বের বহু দেশই বোয়িংয়ের কাছে বড় অঙ্কের ক্রয়াদেশ দিয়েছে। বোয়িং কোম্পানি তাদের উৎপাদন সক্ষমতা, অর্ডার বুকিং ও ব্যবসায়িক কৌশল অনুযায়ী বিমান সরবরাহ করে থাকে। যারা আগে অর্ডার দিয়েছে, তারা সাধারণত অগ্রাধিকার পায়। তবে বাংলাদেশের জরুরি প্রয়োজন বিবেচনায় কিছু উড়োজাহাজ তুলনামূলক দ্রুত সরবরাহ পাওয়ার সম্ভাবনার কথাও তিনি উল্লেখ করেন।

বোয়িং কেনার ঘোষণার পর আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অঙ্গনেও তৎপরতা বেড়ে যায়। বিশেষ করে ইউরোপীয় উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এয়ারবাস তাদের বিমান বিক্রির জন্য কূটনৈতিকভাবে সক্রিয় হয়ে ওঠে। ইউরোপের একাধিক কূটনীতিক সরাসরি সরকারের উচ্চপর্যায়ে যোগাযোগ করেন এবং এয়ারবাসের উড়োজাহাজের বিভিন্ন সুবিধা তুলে ধরেন। এমনকি প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গেও এয়ারবাসের সম্ভাব্য ক্রয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়। এতে স্পষ্ট হয়, বাংলাদেশের বিমান ক্রয় সিদ্ধান্ত কেবল বাণিজ্যিক নয়, বরং আন্তর্জাতিক কূটনীতির দিক থেকেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বিশ্লেষকদের মতে, বোয়িং থেকে ১৪টি বিমান কেনার সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের একটি বাস্তব উদাহরণ। একই সঙ্গে এটি বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি বিমান পরিবহন কৌশলের অংশ। একদিকে যেমন আধুনিক বহর গড়ে তোলা, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা—এই দুই লক্ষ্য সামনে রেখেই সরকার এগোচ্ছে বলে মনে করছেন তারা।

সব মিলিয়ে, বোয়িং থেকে ১৪টি বিমান কেনার নীতিগত সিদ্ধান্ত বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের জন্য যেমন একটি সম্ভাবনাময় অগ্রগতি, তেমনি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক অবস্থানের ক্ষেত্রেও তাৎপর্যপূর্ণ। সামনে বোয়িংয়ের সঙ্গে দরদাম ও চূড়ান্ত চুক্তি কীভাবে সম্পন্ন হয়, সেদিকেই এখন নজর সংশ্লিষ্ট সবার।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত