প্রকাশ: ০২ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
আফগানিস্তানে ভারী বৃষ্টিপাত ও তুষারপাতের পর আকস্মিক বন্যায় ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় নেমে এসেছে। দেশটির বিভিন্ন প্রদেশে সৃষ্ট এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে এখন পর্যন্ত অন্তত ১৭ জন নিহত হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন আরও ১১ জন। উত্তর, দক্ষিণ ও পশ্চিমাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে বন্যার প্রভাব পড়ায় স্বাভাবিক জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে প্রত্যন্ত অঞ্চলে যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনায় চরম চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে স্থানীয় প্রশাসন ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থাগুলো।
হেরাত প্রদেশের কাবকান এলাকায় বৃহস্পতিবার একটি হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটে। প্রবল বৃষ্টিপাতের কারণে একটি বসতঘরের ছাদ ধসে পড়ে একই পরিবারের পাঁচ সদস্য নিহত হন। নিহতদের মধ্যে দুজন শিশু রয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন হেরাতের গভর্নরের মুখপাত্র মোহাম্মদ ইউসুফ সাঈদী। মুহূর্তের মধ্যেই পুরো পরিবারটির স্বপ্ন ও জীবনের আলো নিভে যাওয়ার এই ঘটনা স্থানীয় জনগণের মধ্যে গভীর শোক ও আতঙ্কের সৃষ্টি করেছে। প্রতিবেশীরা জানান, রাতের বৃষ্টিতে চারদিক যখন পানিতে তলিয়ে যাচ্ছিল, তখন পরিবারটির পক্ষে নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার সুযোগই ছিল না।
আফগানিস্তানের জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের (এএনডিএমএ) মুখপাত্র মোহাম্মদ ইউসুফ হাম্মাদ জানিয়েছেন, সোমবার থেকে শুরু হওয়া এই দুর্যোগে একের পর এক জেলায় হতাহতের খবর পাওয়া যাচ্ছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, বন্যার পানিতে সড়ক, সেতু, ঘরবাড়ি ও কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বহু এলাকায় বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। এর ফলে চিকিৎসা সহায়তা ও জরুরি পরিষেবা পৌঁছে দেওয়া কঠিন হয়ে উঠেছে। ইতোমধ্যে প্রায় এক হাজার ৮০০ পরিবার প্রত্যক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে প্রাথমিক হিসাব পাওয়া গেছে।
বন্যার প্রভাবে শুধু মানুষের জীবনই বিপন্ন হয়নি, ধ্বংসের মুখে পড়েছে স্থানীয় অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশও। গবাদিপশু মারা যাওয়ায় বহু পরিবার তাদের জীবিকার প্রধান উৎস হারিয়েছে। কৃষিজমি পানিতে ডুবে থাকায় শীতকালীন ফসল নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। অনেক এলাকায় কাঁচা ঘরবাড়ি ভেসে গেছে অথবা মাটির দেয়াল ধসে পড়েছে। ফলে শীতের এই সময়ে হাজারো মানুষ খোলা আকাশের নিচে আশ্রয় নিতে বাধ্য হচ্ছেন।
এএনডিএমএ জানিয়েছে, সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে পর্যবেক্ষক ও জরুরি সহায়তা দল পাঠানো হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ এবং ত্রাণ বিতরণের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। তবে দুর্গম পাহাড়ি ও গ্রামীণ অঞ্চলে পৌঁছাতে গিয়ে উদ্ধারকর্মীদের নানা প্রতিকূলতার মুখে পড়তে হচ্ছে। কোথাও কোথাও সড়ক সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় ভারী যান চলাচল অসম্ভব হয়ে উঠেছে।
আফগানিস্তান দীর্ঘদিন ধরেই প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকিতে থাকা একটি দেশ। দশকের পর দশক ধরে চলা সংঘাত, দুর্বল অবকাঠামো, অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও ব্যাপক বন উজাড় দেশটিকে আরও নাজুক করে তুলেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের তীব্র প্রভাবের কারণে এখানে একদিকে যেমন দীর্ঘ খরা দেখা দেয়, অন্যদিকে হঠাৎ ভারী বৃষ্টি ও তুষারপাত ভয়াবহ বন্যার রূপ নেয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের চরম আবহাওয়ার ঘটনা ভবিষ্যতে আরও ঘন ঘন ঘটতে পারে, যা আফগানিস্তানের মতো দুর্বল রাষ্ট্রের জন্য বড় হুমকি।
মানবিক সংস্থাগুলো সতর্ক করে বলছে, বন্যার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব আরও ভয়াবহ হতে পারে। বিশুদ্ধ পানির সংকট, পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি এবং খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। ইতোমধ্যে বহু পরিবার তাদের শেষ সম্বলটুকু হারিয়ে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। আন্তর্জাতিক সহায়তা ছাড়া এই সংকট মোকাবিলা করা আফগানিস্তানের পক্ষে কঠিন হবে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
এদিকে দেশটির সাম্প্রতিক ইতিহাসও দুর্যোগে ভরা। গত বছরের আগস্ট মাসে আফগানিস্তানে ৬ মাত্রার একটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে। সেই ভূমিকম্পে এক হাজার ৪০০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হন এবং ব্যাপক অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি হয়। ভূমিকম্পের ক্ষত পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠার আগেই এবার বন্যা নতুন করে মানবিক সংকট সৃষ্টি করেছে। বারবার প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে হতাশা ও অনিশ্চয়তা গভীরতর হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, প্রতি বছরই তারা কোনো না কোনো দুর্যোগের মুখোমুখি হচ্ছেন। কিন্তু টেকসই বাঁধ, নিরাপদ বাসস্থান কিংবা কার্যকর আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা না থাকায় ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা কমানো যাচ্ছে না। অনেকেই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আরও সক্রিয় সহায়তার আহ্বান জানিয়েছেন, যাতে ভবিষ্যতে এমন প্রাণহানি ও ধ্বংস কিছুটা হলেও রোধ করা যায়।
এই আকস্মিক বন্যা আবারও মনে করিয়ে দিল, প্রাকৃতিক দুর্যোগ শুধু প্রকৃতির খামখেয়াল নয়, বরং মানুষের দীর্ঘদিনের অবহেলা ও বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের ফলও বটে। আফগানিস্তানের বর্তমান পরিস্থিতিতে জরুরি মানবিক সহায়তা, পুনর্বাসন এবং দীর্ঘমেয়াদি দুর্যোগ প্রস্তুতির বিকল্প নেই। নতুবা এমন মর্মান্তিক খবর আরও ঘন ঘন শিরোনাম হয়ে উঠবে, আর প্রতিবারই নতুন করে নিভে যাবে অসংখ্য জীবনের আলো।