প্রবাসে দুর্ঘটনায় নিভে গেল রুবেলের স্বপ্নের জীবন

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ২ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৫৩ বার
প্রবাসে দুর্ঘটনায় নিভে গেল রুবেলের স্বপ্নের জীবন

প্রকাশ: ০২ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

প্রবাসের কঠিন জীবন, অমানুষিক পরিশ্রম আর অদম্য স্বপ্ন—সবকিছুরই পরিসমাপ্তি ঘটল হঠাৎ এক নির্মম দুর্ঘটনায়। জীবিকার তাগিদে প্রায় এক দশক আগে সিঙ্গাপুরে পাড়ি জমিয়েছিলেন নাটোরের লালপুর উপজেলার তরুণ রুবেল। স্বপ্ন ছিল প্রবাসে কষ্টার্জিত আয়ে গ্রামের বাড়িতে একটি নতুন ঘর তুলে পরিবারকে একটু স্বস্তি দেওয়ার, কোরবানির ঈদের আগে দেশে ফিরে বিয়ে করে নতুন জীবনের সূচনা করার। কিন্তু সেই স্বপ্ন আর বাস্তব রূপ পেল না। দেশে ফিরছেন তিনি, তবে জীবিত মানুষ হিসেবে নয়—কফিনে মোড়ানো নিথর দেহ হয়ে।

গত বুধবার বিকেল সাড়ে চারটার দিকে সিঙ্গাপুরে কর্মরত অবস্থায় একটি নির্মাণাধীন কনস্ট্রাকশন সাইটে ভয়াবহ দুর্ঘটনার শিকার হন রুবেল। কাজের প্রয়োজনে লিফটে করে ওপরে ওঠার সময় হঠাৎ ঘটে যায় দুর্ঘটনা। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, অসাবধানতাবশত বা যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে তিনি গুরুতরভাবে মাথায় আঘাত পান। সঙ্গে সঙ্গে সহকর্মীরা তাকে উদ্ধার করে নিকটবর্তী হাসপাতালে নিয়ে যান। কিন্তু সব চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। প্রবাসের মাটিতেই থেমে যায় এক সংগ্রামী জীবনের গল্প।

রুবেলের মৃত্যুর খবর বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় নিশ্চিত করেন তার বাবা আব্দুল লতিফ। বয়স আশির কোঠায় পৌঁছানো এই বৃদ্ধ বাবা কাঁপা কণ্ঠে জানান, এইচএসসি পাস করার পর প্রায় দশ বছর আগে অনেক কষ্টে টাকা জোগাড় করে ছেলেকে সিঙ্গাপুরে পাঠানো হয়েছিল। পরিবারে অভাব ছিল, তবুও রুবেলের চোখে ছিল আলোর স্বপ্ন। শুরুতে নানা কষ্ট পোহাতে হলেও ধীরে ধীরে একটি কনস্ট্রাকশন কোম্পানিতে স্থায়ীভাবে কাজ শুরু করেন তিনি। মাস শেষে যা আয় হতো, তার বড় অংশই পাঠাতেন দেশে। সেই টাকায় ধীরে ধীরে বদলে যেতে শুরু করেছিল পরিবারের ভাগ্য।

ইমরান হাসমি রুবেল ছিলেন নাটোরের লালপুর উপজেলার দক্ষিণ লালপুর গ্রামের কলোনীপাড়া এলাকার বাসিন্দা। বাবা আব্দুল লতিফ ও মা জরিনা বেগমের সংসারে চার ভাই ও দুই বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার ছোট। ছোট ছেলে হলেও পরিবারের জন্য তার দায়বদ্ধতা ছিল সবচেয়ে বেশি। বড় ভাইয়েরা যার যার মতো করে সংসার গুছিয়ে নিলেও রুবেলই ছিলেন পরিবারের স্বপ্নের ভরকেন্দ্র। নতুন বাড়ি নির্মাণের পুরো দায়িত্বই নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন তিনি।

ছেলের মৃত্যুর খবরে সবচেয়ে বেশি ভেঙে পড়েছেন মা জরিনা বেগম। বয়স সত্তরের এই মা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, গত শনিবারই শেষবারের মতো কথা হয়েছিল ছেলের সঙ্গে। নতুন বাড়ির কাজ কতদূর এগিয়েছে, সেটাই জানতে চেয়েছিল। বাড়িতে টাইলস লাগানোর জন্য আরও কিছু টাকা পাঠানোর কথাও বলেছিল। কোরবানির ঈদের আগেই দেশে ফিরে বিয়ে করবে, নতুন বাড়িতে সবাইকে নিয়ে উঠবে—এই ছিল তার পরিকল্পনা। ঈদের দিন একসঙ্গে পরিবার নিয়ে কোরবানি দেওয়ার স্বপ্ন ছিল। কিন্তু সবকিছু মুহূর্তের মধ্যে শেষ হয়ে গেল। মা বলেন, “এত স্বপ্ন নিয়ে যে ছেলে বিদেশে ছিল, সে এখন কফিনে করে ফিরছে—এই কথা কীভাবে মেনে নেব?”

বোন রুনি ইয়াসমিনও ভাইয়ের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন। তিনি বলেন, গত মঙ্গলবার ভাইয়ের সঙ্গে কথা হয়েছিল। মা-বাবার খেয়াল রাখতে বারবার বলেছিল। নতুন বাড়ির কাজ প্রায় শেষ শুনে খুব খুশি হয়েছিল। বলেছিল, দেশে ফিরে সবাইকে নিয়ে নতুন বাড়িতে ঈদ করবে। কিন্তু সেই খুশির কথাগুলোই এখন বুকের ভেতর ছুরি হয়ে বিঁধছে। ভাইয়ের এমন চলে যাওয়া তারা কেউ মেনে নিতে পারছেন না।

পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, আগামীকাল শনিবার ৩ জানুয়ারি সন্ধ্যা ছয়টার দিকে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে রুবেলের মরদেহ পৌঁছানোর কথা রয়েছে। মরদেহ গ্রহণের জন্য পরিবারের দুই সদস্য বিমানবন্দরে উপস্থিত থাকবেন। এরপর মরদেহ গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হবে, যেখানে শেষবারের মতো প্রিয় মানুষটিকে দেখার অপেক্ষায় রয়েছেন স্বজন ও প্রতিবেশীরা। ইতোমধ্যে দক্ষিণ লালপুর গ্রামে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। যে বাড়িতে আনন্দের আলো জ্বলার কথা ছিল, সেখানে এখন শুধু কান্না আর দীর্ঘশ্বাস।

রুবেলের মৃত্যু আবারও প্রশ্ন তুলে দিয়েছে প্রবাসী শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিয়ে। উন্নত দেশগুলোতে কাজ করলেও নির্মাণ খাতের শ্রমিকদের জীবনে ঝুঁকি থেকেই যায়। অনেক সময় অতিরিক্ত কাজের চাপ, নিরাপত্তা সরঞ্জামের ঘাটতি কিংবা যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে এমন দুর্ঘটনা ঘটে। প্রবাসে কর্মরত অসংখ্য বাংলাদেশি শ্রমিক প্রতিনিয়ত জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছেন, পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর আশায়। কিন্তু রুবেলের মতো অনেকের স্বপ্ন মাঝপথেই থেমে যাচ্ছে।

এই মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের নয়, একটি সমাজের স্বপ্নভঙ্গের গল্পও। প্রবাসে ঘাম ঝরিয়ে উপার্জিত টাকায় গড়া নতুন বাড়ি, আসন্ন বিয়ে, ঈদের আনন্দ—সবকিছুই থেমে দিল একটি দুর্ঘটনা। যে শূন্যতা রুবেল রেখে গেলেন, তা কোনো অর্থ বা সান্ত্বনায় পূরণ হওয়ার নয়। কফিনে মোড়ানো লাশের অপেক্ষায় থাকা পরিবারটি জানে, তাদের জীবনের সবচেয়ে বড় স্বপ্নটি চিরদিনের জন্য নিভে গেছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত