প্রখ্যাত ছড়াকার সুকুমার বড়ুয়া আর নেই

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ২ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৫৩ বার
প্রখ্যাত ছড়াকার সুকুমার বড়ুয়া আর নেই

প্রকাশ: ০২ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের শিশু সাহিত্যের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, প্রখ্যাত ছড়াকার সুকুমার বড়ুয়া শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। শুক্রবার ভোর ৬টা ৫৫ মিনিটে চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার গহিরায় অবস্থিত জে কে মেমোরিয়াল হাসপাতালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮৮ বছর। তার পরিবার ও সাহিত্যপ্রেমী পাঠক সমাজ গভীর শোকপ্রকাশ করেছে।

তার মেয়ে অঞ্জনা বড়ুয়া জানিয়েছেন, সুকুমার বড়ুয়া মৃত্যুর আগে এক সপ্তাহ ধরে চট্টগ্রামের একটি মেডিকেল সেন্টারে ভর্তি ছিলেন। শুক্রবার তাকে জে কে মেমোরিয়াল হাসপাতালে স্থানান্তর করা হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ফুসফুসে পানি জমে যাওয়ায় তিনি মারা যান। পরিবারের সদস্যরা শেষ মূহূর্ত পর্যন্ত পাশে ছিলেন।

সুকুমার বড়ুয়া ১৯৩৮ সালের ৫ জানুয়ারি চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার মধ্যম বিনাজুরি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। শিক্ষাজীবন শেষ করে তিনি ১৯৬০-এর দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। ১৯৬৩ সালে তোপখানা রোডে ছয় টাকায় একটি বেড়ার ঘর ভাড়া করে সাহিত্যচর্চা শুরু করেন। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে তিনি ছড়ার মাধ্যমে শিশু সাহিত্যে অবদান রেখে এক অনন্য পরিচয় তৈরি করেন। ১৯৯৯ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টোর কিপার হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন।

ছড়া লেখার মাধ্যমে সুকুমার বড়ুয়া ‘ছড়ারাজ’, ‘ছড়াশিল্পী’, ‘ছড়াসম্রাট’সহ নানা খ্যাতিতে সমৃদ্ধ হন। তার ছড়াগুলিতে রয়েছে ব্যঙ্গরস, হাস্যরস, নৈতিক শিক্ষা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও রাজনৈতিক বার্তা। শিশুশিক্ষা ও সাহিত্যচর্চার ক্ষেত্রে তার অবদান দেশ-বিদেশে প্রশংসিত।

তার উল্লেখযোগ্য ছড়ার বইয়ের মধ্যে রয়েছে ‘পাগলা ঘোড়া’, ‘ভিজে বেড়াল’, ‘চন্দনা রঞ্জনার ছড়া’, ‘এলোপাতাড়ি’, ‘নানা রঙের দিন’, ‘চিচিং ফাঁক’, ‘কিছু না কিছু’, ‘প্রিয় ছড়া শতক’, ‘নদীর খেলা’, ‘ছোটদের হাট’, ‘মজার পড়া ১০০ ছড়া’, ‘যুক্তবর্ণ’, ‘চন্দনার পাঠশালা’ ও ‘জীবনের ভেতরে বাইরে’। এসব বইতে শিশুরা আনন্দ ও শিক্ষার পাশাপাশি নৈতিকতা ও সৃজনশীল চিন্তা অর্জন করতে পারত।

বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে অসামান্য অবদানের জন্য ২০১৭ সালে তিনি একুশে পদকে ভূষিত হন। এছাড়া তিনি বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, বাংলাদেশ শিশু একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, আলাওল সাহিত্য পুরস্কারসহ বিভিন্ন স্বীকৃতি ও সম্মাননায় ভূষিত হন। তার সাহিত্যকর্ম শিশুশিক্ষা, রূপকল্প ও সমাজচেতনার ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলেছে।

সুকুমার বড়ুয়ার সাহিত্যিক জীবন কেবল শিশুসাহিত্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তার ছড়ার মাধ্যমে সমাজ ও রাজনীতিতে সংবেদনশীল বার্তা পৌঁছেছে। বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধকালীন চেতনা এবং সাধারণ মানুষের জীবনের গল্পগুলো তিনি সহজ অথচ মজাদার ছড়ার মাধ্যমে তুলে ধরেছেন, যা পাঠকদের হৃদয় স্পর্শ করে।

সাহিত্যবিশ্বে তার বিদায়ের খবর ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথে অনেক লেখক, শিক্ষাবিদ, শিক্ষক ও শিশু সাহিত্যপ্রেমী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শোক প্রকাশ করেছেন। তারা মনে করছেন, সুকুমার বড়ুয়া ছিলেন এমন একজন শিল্পী, যিনি ছড়ার মাধ্যমে হাসি, শিক্ষা এবং সমাজচেতনা একসাথে ছড়িয়ে দিতে পেরেছেন। তার সৃষ্টি শিশুসাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে এবং নতুন প্রজন্মের জন্য পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ করেছে।

শোকাহত পরিবার জানিয়েছে, তার শেষকৃত্য চট্টগ্রামে হবে এবং সাহিত্যপ্রেমী পাঠক ও ভক্তরা শ্রদ্ধা জানাতে পারবেন। দেশের শিশু সাহিত্য ও ছড়াশিল্পের ইতিহাসে সুকুমার বড়ুয়া চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন। তার অবদান ভবিষ্যতের লেখক ও শিশুসাহিত্যিকদের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হিসেবে কাজ করবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত