প্রকাশ: ১২ জুলাই’ ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা । একটি বাংলাদেশ অনলাইন
ময়মনসিংহের নান্দাইল উপজেলার মুশল্লী ইউনিয়নের প্রত্যন্ত গ্রাম পালাহারে এবারের এসএসসি পরীক্ষায় এক অনন্য ঘটনা ঘটেছে। একই পরিবারের যমজ দুই বোন—নওশিন নাহার ঐশি ও নওরীন নাহার শশী—দুজনেই পেয়েছে সর্বোচ্চ গ্রেড, জিপিএ ৫। এই অর্জন শুধু তাদের পরিবারের নয়, বরং গোটা এলাকা ও বিদ্যালয়ের জন্যও এক গর্বের মুহূর্ত হয়ে উঠেছে।
ঐশি ও শশী—দুই বোনই একসাথে পথচলা শুরু করেছিল বাবার বিদ্যালয় থেকে। তাদের বাবা, মো. আব্দুল হান্নান, মুশল্লী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক। সেখানে প্রাথমিক শিক্ষা শেষে দুই বোন ভর্তি হয় নান্দাইল সদরের স্বনামধন্য পাইলট বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ে। সেখান থেকেই তারা এবার বিজ্ঞান বিভাগে অংশ নেয় এসএসসি পরীক্ষায়।
পরীক্ষার ফলাফল বলছে—ঐশি পেয়েছে ১২১০ এবং শশী পেয়েছে ১২১৫ নম্বর। দুজনের মধ্যে নম্বরের সামান্য পার্থক্য থাকলেও চেষ্টার দিক দিয়ে তারা ছিল সমানতালে। বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও সহপাঠীরা বলেন, তাদের মধ্যে ছিল একধরনের সুস্থ প্রতিযোগিতা—যেটি অন্য শিক্ষার্থীদের মাঝেও উৎসাহ জোগাত। এমনকি তাদের মুখমণ্ডল এবং উচ্চতা এতটাই মিল ছিল যে, এক পোশাকে থাকলে অনেকেই তাদের আলাদা করতে হিমশিম খেতেন। তাই পরিচয়ের জন্য নাম ধরে ডাকা নয়, অনেক সময় কাছে গিয়ে নিশ্চিত হতে হতো।
দুই বোন জানান, তারা কখনো মোবাইল ফোনে আসক্ত হননি। পড়াশোনা ছিল তাদের অগ্রাধিকার। মোবাইল প্রয়োজন হলে বাবা-মায়ের ফোন কিছুক্ষণের জন্য ব্যবহার করতেন, তাও শুধু শিক্ষাগত প্রয়োজনে। তারা প্রতিদিন নিয়মমাফিক পড়াশোনায় সময় দিয়েছে, ক্লাসে মনোযোগী থেকেছে এবং স্কুলের শিক্ষকদের পরামর্শ মেনেই প্রস্তুতি নিয়েছে।
ঐশি বলেন, “আমরা জানতাম, পরীক্ষায় ভালো করতে হলে নিয়মিত পড়তে হবে। নিজেকে তৈরি করতে হবে। আমাদের কোনো ব্যক্তিগত মোবাইল ছিল না। শিক্ষাই ছিল আমাদের মনোযোগের কেন্দ্র।”
শশী যোগ করেন, “আমাদের লক্ষ্য ছিল চিকিৎসক হওয়া। সেই লক্ষ্যেই আমরা এগোচ্ছি। এসএসসি ভালোভাবে পাস করতে পারার ফলে আমরা আরেক ধাপ এগিয়ে গেলাম।”
তাদের বাবা আব্দুল হান্নান জানান, “এই দুই মেয়েকে কখনো পড়াশোনার জন্য চাপ দিতে হয়নি। তারা সময়মতো পড়েছে, খেলাধুলাও করেছে। নিয়ম মেনে চলার মধ্যেই ওদের সাফল্যের চাবিকাঠি লুকিয়ে আছে। বিদ্যালয়ের শিক্ষকরাও ওদের প্রতি যত্নবান ছিলেন।”
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আব্দুল খালেক বলেন, “ঐশি ও শশী বিদ্যালয়ের গর্ব। লেখাপড়ায় মনোযোগী, শৃঙ্খলাপূর্ণ এবং শিষ্ট আচরণসম্পন্ন এই দুই শিক্ষার্থীর এমন সাফল্যে আমরা গর্বিত। তাদের ভবিষ্যত উজ্জ্বল হোক, তারা যেন দেশের সেবায় আত্মনিয়োগ করতে পারে—এটাই আমাদের কামনা।”
চার বোনের মধ্যে ঐশি ও শশী বড়। তাদের পরের বোন সাইরিন নাহার তুশি চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ে এবং ছোট মেয়ে মেহেরুন নাহার তানিশা এখনো নার্সারিতে। এই পরিবারে শিক্ষাই যে প্রধান ভিত্তি, তা যেন প্রমাণ করে দিচ্ছে একেকটি সাফল্যগাথা।
নান্দাইলের এই সাদামাটা পরিবারের যমজ দুই মেয়ের এমন দুর্দান্ত ফলাফল আজ অনেকের অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে উঠেছে। যেখানে মোবাইল, সোশ্যাল মিডিয়া কিংবা বিলাসিতা নয়—সাফল্যের রসদ খুঁজে পাওয়া যায় শৃঙ্খলা, অধ্যবসায় আর পারিবারিক শিক্ষার মিশেলে।