প্রকাশ: ০২ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ভারতের মধ্যপ্রদেশের বাণিজ্যিক নগরী ইন্দোরে দূষিত পানি পান করে একের পর এক মানুষের মৃত্যু ও অসুস্থতার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ ও শোক নেমে এসেছে। স্থানীয় প্রশাসনের তথ্যমতে, এ পর্যন্ত অন্তত নয়জনের মৃত্যু হয়েছে এবং অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন কমপক্ষে দুই শতাধিক মানুষ। আশঙ্কা করা হচ্ছে, আক্রান্তের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। এ ঘটনা নতুন করে ভারতের নগরভিত্তিক পানি সরবরাহ ব্যবস্থা, জনস্বাস্থ্য নিরাপত্তা এবং প্রশাসনিক দায়বদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
ইন্দোর শহরের ভাগীরথপুরা এলাকা মূলত একটি ঘনবসতিপূর্ণ অঞ্চল। কয়েক দিন ধরেই এলাকাবাসী পানিতে অস্বাভাবিক দুর্গন্ধ ও রঙের পরিবর্তন লক্ষ্য করছিলেন। অনেকে প্রথমে বিষয়টি গুরুত্ব না দিলেও, হঠাৎ করেই ডায়রিয়া, বমি, জ্বর ও তীব্র পেটব্যথায় আক্রান্ত হতে শুরু করেন বহু মানুষ। শিশু, বৃদ্ধ ও নারীরা সবচেয়ে বেশি ভুগছেন বলে জানিয়েছেন স্থানীয় চিকিৎসকেরা। দ্রুত পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করলে একের পর এক রোগী ইন্দোরের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হতে থাকেন।
চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, অধিকাংশ রোগীর শরীরে পানিবাহিত সংক্রমণের লক্ষণ স্পষ্ট। তীব্র ডায়রিয়া ও পানিশূন্যতার কারণে কয়েকজন রোগীর অবস্থা দ্রুত সংকটাপন্ন হয়ে পড়ে। হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, যারা মারা গেছেন, তাদের অনেকেই হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই গুরুতর অবস্থায় ছিলেন। সময়মতো বিশুদ্ধ পানি ও চিকিৎসা না পাওয়াই মৃত্যুর অন্যতম কারণ বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।
ঘটনার তদন্তে নেমে প্রশাসন জানিয়েছে, ভাগীরথপুরা এলাকায় পানির পাইপলাইনে একটি বড় ধরনের ছিদ্র ধরা পড়েছে। ওই পাইপলাইনের কাছেই সম্প্রতি একটি শৌচাগার নির্মাণ করা হয়েছিল। ধারণা করা হচ্ছে, পাইপলাইনের ওই ছিদ্র দিয়ে নোংরা ও মলমূত্রযুক্ত পানি সরাসরি সরবরাহ লাইনে প্রবেশ করেছে। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে এলাকাবাসী unknowingly দূষিত পানি পান করে আসছিলেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের পরিস্থিতিতে অল্প সময়ের মধ্যেই ভয়াবহ সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়া স্বাভাবিক।
এলাকাবাসীদের অভিযোগ, দুর্গন্ধযুক্ত পানি নিয়ে তারা কয়েক দিন আগেই স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে জানালেও তখন কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। যদি সময়মতো পানি সরবরাহ বন্ধ করে বিকল্প বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা করা হতো, তাহলে হয়তো এত বড় প্রাণহানির ঘটনা এড়ানো যেত। এই অভিযোগ ঘিরে স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। অনেকেই এটিকে সরাসরি প্রশাসনিক অবহেলা বলে আখ্যা দিয়েছেন।
ঘটনার পর মধ্যপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী মোহন যাদব গভীর শোক প্রকাশ করেছেন এবং মৃতদের প্রত্যেক পরিবারের জন্য দুই লাখ রুপি করে আর্থিক সহায়তা ঘোষণা করেছেন। একই সঙ্গে তিনি আশ্বাস দিয়েছেন, এই ঘটনার জন্য যারা দায়ী, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। মুখ্যমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে জানানো হয়েছে, পানীয় জল সরবরাহ ব্যবস্থা তদারকিতে যেসব কর্মকর্তা ও ঠিকাদার অবহেলা করেছেন, তাদের ভূমিকা তদন্ত করে দেখা হবে।
ইন্দোর জেলা প্রশাসন পুরো ঘটনার কারণ উদঘাটনে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। এই কমিটি পানির পাইপলাইন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণ, শৌচাগার নির্মাণে নিয়ম লঙ্ঘন হয়েছে কি না এবং অভিযোগ পাওয়ার পর কেন দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি—এসব বিষয় খতিয়ে দেখবে। তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ভবিষ্যতে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন জেলা কর্মকর্তারা।
এদিকে আক্রান্তদের চিকিৎসায় হাসপাতালগুলোতে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছে। অতিরিক্ত চিকিৎসক ও নার্স মোতায়েন করা হয়েছে, পর্যাপ্ত স্যালাইন ও ওষুধের ব্যবস্থা করা হয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে এলাকাবাসীকে দূষিত পানি পান না করার জন্য সতর্ক করা হয়েছে এবং ট্যাঙ্কারে করে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ শুরু করা হয়েছে। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, এই ব্যবস্থা আরও আগেই নেওয়া উচিত ছিল।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ঘটনা ভারতের অনেক শহরের একটি পরিচিত কিন্তু ভয়াবহ বাস্তবতা তুলে ধরেছে। পুরোনো ও জরাজীর্ণ পানির পাইপলাইন, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার দুর্বলতা একসঙ্গে মিলে এ ধরনের সংকট তৈরি করে। বিশেষ করে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় পানির পাইপলাইনের পাশে শৌচাগার বা নর্দমা নির্মাণ হলে ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। নিয়মিত তদারকি ও আধুনিকায়ন ছাড়া এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয় বলে তারা মত দিয়েছেন।
সামাজিক দিক থেকেও এই ঘটনা গভীর প্রভাব ফেলেছে। অনেক পরিবার একাধিক সদস্যকে একসঙ্গে অসুস্থ অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি করেছে। দিনমজুর ও নিম্ন আয়ের মানুষদের জন্য চিকিৎসা ব্যয় বড় বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। যদিও সরকার আর্থিক সহায়তার ঘোষণা দিয়েছে, তবুও স্থানীয়দের মতে, অর্থের চেয়ে জীবন অনেক বেশি মূল্যবান। তারা চান, ভবিষ্যতে যেন এমন অবহেলা আর না ঘটে।
ভারতের বিভিন্ন গণমাধ্যমে এই ঘটনাটি ব্যাপকভাবে আলোচিত হচ্ছে। অনেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করে লিখেছেন, বিশুদ্ধ পানির মতো মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হলে উন্নয়নের সব দাবি অর্থহীন হয়ে পড়ে। মানবাধিকার কর্মীরাও বলছেন, নিরাপদ পানি সরবরাহ রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব, আর সেই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার ফলেই আজ এতগুলো প্রাণ ঝরে গেছে।
সব মিলিয়ে, ইন্দোরের ভাগীরথপুরার এই মর্মান্তিক ঘটনা শুধু একটি এলাকার নয়, বরং গোটা অঞ্চলের জন্য একটি সতর্কবার্তা। দূষিত পানি যে কত দ্রুত প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে, তার নির্মম উদাহরণ এটি। তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের শাস্তি নিশ্চিত করা এবং ভবিষ্যতে এমন দুর্ঘটনা রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়াই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। স্থানীয়রা আশা করছেন, এই প্রাণহানির ঘটনা অন্তত প্রশাসনকে আরও দায়িত্বশীল হতে বাধ্য করবে এবং বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ ব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় সংস্কার ত্বরান্বিত হবে।