প্রকাশ: ০২ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ঘন কুয়াশার কারণে রাজধানী ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে শুক্রবার সকাল থেকে স্বাভাবিক উড্ডয়ন ও অবতরণ কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। ভোররাত থেকে শুরু হওয়া কুয়াশা সকাল গড়ানোর পরও কাটেনি, ফলে রানওয়েতে দৃশ্যমানতা নেমে আসে নিরাপদ সীমার নিচে। যাত্রীদের জীবন ও বিমান চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ বাধ্য হয়ে একাধিক ফ্লাইট বিকল্প বিমানবন্দরে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়। এতে একদিকে যেমন যাত্রীদের ভোগান্তি বেড়েছে, অন্যদিকে শীতকালীন আবহাওয়ার ঝুঁকি ও প্রস্তুতি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
বিমানবন্দর সূত্র জানায়, ঘন কুয়াশার কারণে মোট ৯টি ফ্লাইট ঢাকায় অবতরণ করতে পারেনি। এর মধ্যে চারটি ফ্লাইট চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে, চারটি ফ্লাইট ভারতের কলকাতা নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এবং একটি ফ্লাইট থাইল্যান্ডের ব্যাংকক আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ডাইভার্ট করা হয়। এসব ফ্লাইটের যাত্রীরা দীর্ঘ সময় বিমানের ভেতর ও বিকল্প বিমানবন্দরে অপেক্ষা করতে বাধ্য হন।
ভোররাত থেকেই ঢাকার আকাশে কুয়াশার ঘনত্ব বাড়তে শুরু করে। সকাল সাতটা থেকে নয়টার মধ্যে দৃশ্যমানতা নেমে আসে কয়েকশ মিটারে। বিমান চলাচলের আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী, নির্দিষ্ট মাত্রার নিচে দৃশ্যমানতা নেমে গেলে নিরাপদ অবতরণ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। এ অবস্থায় এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল (এটিসি) ও সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইন্সগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে ডাইভারশন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কর্তৃপক্ষ বলছে, এই সিদ্ধান্ত কঠিন হলেও যাত্রী ও বিমানের নিরাপত্তাই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।
ডাইভার্ট হওয়া ফ্লাইটগুলোর যাত্রীদের মধ্যে ছিলেন প্রবাসী বাংলাদেশি, বিদেশি নাগরিক, ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থী ও সাধারণ ভ্রমণকারী। অনেক যাত্রী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের ভোগান্তির কথা তুলে ধরেন। কেউ কেউ জানান, ঢাকায় নামার অপেক্ষায় বিমানে দীর্ঘক্ষণ বসে থাকতে হয়েছে, আবার কেউ বিকল্প বিমানবন্দরে নেমে অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন। বিশেষ করে যারা আন্তর্জাতিক ট্রানজিট যাত্রী ছিলেন, তাদের জন্য পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।
বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আবহাওয়া উন্নত হওয়ার পর ধীরে ধীরে ফ্লাইট অপারেশন স্বাভাবিক করা হয়। সকাল গড়িয়ে বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কুয়াশার ঘনত্ব কমতে শুরু করলে দৃশ্যমানতা নিরাপদ মাত্রায় ফিরে আসে। এরপর এটিসির অনুমতি নিয়ে নিয়মিত উড্ডয়ন ও অবতরণ পুনরায় শুরু হয়। বর্তমানে বিমানবন্দরের সব ফ্লাইট স্বাভাবিকভাবে পরিচালিত হচ্ছে বলে নিশ্চিত করা হয়েছে।
আবহাওয়াবিদরা বলছেন, জানুয়ারি মাসে বাংলাদেশে ঘন কুয়াশা একটি স্বাভাবিক শীতকালীন বৈশিষ্ট্য। বিশেষ করে ভোররাত ও সকালবেলা নদী ও জলাভূমি ঘেরা এলাকায় কুয়াশার ঘনত্ব বেশি থাকে। ঢাকার মতো বড় শহরেও শীতের তীব্রতা ও বায়ুদূষণের কারণে কুয়াশা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। ফলে আগামী কয়েক সপ্তাহ এ ধরনের পরিস্থিতি আবারও তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিমান চলাচল বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক যন্ত্রপাতি ও ক্যাটাগরি-টু বা ক্যাটাগরি-থ্রি ইনস্ট্রুমেন্ট ল্যান্ডিং সিস্টেম (আইএলএস) থাকলেও চরম কুয়াশার সময় ঝুঁকি পুরোপুরি এড়ানো যায় না। তারা বলছেন, শীত মৌসুমে ফ্লাইট ডাইভারশন বা বিলম্বের বিষয়টি যাত্রীদের আগেই মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকা উচিত। একই সঙ্গে এয়ারলাইন্স ও বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকেও যাত্রীদের দ্রুত ও স্বচ্ছ তথ্য দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেছেন তারা।
এই ঘটনার ফলে বিমানবন্দরকেন্দ্রিক অন্যান্য কার্যক্রমেও প্রভাব পড়ে। অনেক যাত্রী নির্ধারিত সময়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে না পারায় ব্যবসায়িক বৈঠক, চিকিৎসা অ্যাপয়েন্টমেন্ট ও পারিবারিক কর্মসূচি বিঘ্নিত হয়। কেউ কেউ অতিরিক্ত হোটেল খরচ ও পরিবহন সমস্যায় পড়েন। যদিও এয়ারলাইন্সগুলো পরবর্তী সময়ে যাত্রীদের পুনর্ব্যবস্থা করতে উদ্যোগ নেয়, তবুও ভোগান্তি পুরোপুরি এড়ানো যায়নি।
বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, কুয়াশা মোকাবিলায় তারা আগেই প্রস্তুতি নিয়ে থাকে। এটিসি, আবহাওয়া অফিস ও এয়ারলাইন্সগুলোর মধ্যে নিয়মিত সমন্বয় করা হয়। তবে প্রকৃতির প্রতিকূলতার কাছে অনেক সময় প্রযুক্তিও সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। এ কারণে তারা যাত্রীদের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছে, শীত মৌসুমে ভ্রমণের আগে ফ্লাইটের সর্বশেষ তথ্য জেনে নেওয়ার জন্য এবং সম্ভাব্য বিলম্ব বা পরিবর্তনের বিষয়টি মাথায় রেখে যাত্রা পরিকল্পনা করতে।
সব মিলিয়ে, ঘন কুয়াশার কারণে ঢাকার আকাশপথে শুক্রবারের এই অচলাবস্থা আবারও প্রমাণ করেছে, শীতকালীন আবহাওয়া বিমান চলাচলের জন্য কতটা বড় চ্যালেঞ্জ। যদিও কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়েছে, তবুও এই ঘটনা যাত্রী নিরাপত্তা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং জরুরি ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব নতুন করে সামনে এনেছে। সংশ্লিষ্ট সবাই আশা করছেন, অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতে এ ধরনের পরিস্থিতিতে ভোগান্তি আরও কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।