প্রকাশ: ০৩ জানুয়ারি ২০২৬। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশের সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে নিরাপত্তা জোরদারের অংশ হিসেবে লালমনিরহাট জেলার সীমান্ত অঞ্চলে বিশেষ টহল ও কঠোর নজরদারি বৃদ্ধি করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। নির্বাচনের সময় সীমান্ত এলাকায় যেন কোনো ধরনের অপতৎপরতা, অবৈধ অনুপ্রবেশ, মাদক পাচার কিংবা চোরাচালান সংঘটিত না হতে পারে, সে লক্ষ্যেই এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন রংপুর ব্যাটালিয়ন (৫১ বিজিবি) অধিনায়ক লে. কর্নেল সেলিম আল দীন।
বিজিবি সূত্র জানায়, নির্বাচন সামনে রেখে সীমান্ত এলাকায় সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে। বিশেষ করে লালমনিরহাট জেলার পাটগ্রাম উপজেলার সীমান্ত অঞ্চল দীর্ঘদিন ধরেই চোরাচালান ও মাদক পাচারের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে পরিচিত। ফলে এই এলাকাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে নিয়মিত টহলের পাশাপাশি বিশেষ টহল এবং একাধিক বিওপির সমন্বয়ে সমন্বিত টহল বা হুলিয়া টহল পরিচালনা করা হচ্ছে। এসব টহলের মাধ্যমে সীমান্তের অরক্ষিত ও ঝুঁকিপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
রংপুর ব্যাটালিয়ন অধিনায়ক লে. কর্নেল সেলিম আল দীন জানান, বিজিবি কর্তৃক সীমান্ত এলাকায় বিশেষ টহল, কঠোর নজরদারি ও গোয়েন্দা তৎপরতা জোরদার করা হয়েছে। তাঁর ভাষায়, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে কোনো অসাধু চক্র যাতে সীমান্ত পরিস্থিতির সুযোগ নিতে না পারে, সে জন্য বিজিবি সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। অবৈধ অনুপ্রবেশ ও মাদক পাচাররোধে বাহিনীর সদস্যদের প্রস্তুত রাখা হয়েছে এবং স্পর্শকাতর সীমান্ত এলাকাগুলোতে অতিরিক্ত নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
সীমান্ত এলাকায় শুধু টহল জোরদার করাই নয়, পরিস্থিতি বিবেচনায় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অস্থায়ী চেকপোস্ট স্থাপন করেছে বিজিবি। এসব চেকপোস্টে নিয়মিত যানবাহন ও সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের তল্লাশি করা হচ্ছে। স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে এই তল্লাশি কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে, যাতে সাধারণ মানুষ অপ্রয়োজনীয় ভোগান্তির শিকার না হন, আবার নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও কোনো শিথিলতা না থাকে।
নির্বাচনের সময় সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে সামাজিক ও রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এ সুযোগে মাদক কারবারি ও চোরাকারবারিরা তৎপর হয়ে উঠতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিজিবি সূত্র জানায়, এমন আশঙ্কার প্রেক্ষিতেই গোয়েন্দা নজরদারি আরও বিস্তৃত করা হয়েছে। স্থানীয় সূত্র, প্রযুক্তিনির্ভর তথ্য সংগ্রহ এবং মাঠপর্যায়ের নজরদারির মাধ্যমে যেকোনো ধরনের সন্দেহজনক তৎপরতার খবর দ্রুত সংগ্রহ ও ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
এদিকে, বিজিবি সীমান্ত এলাকার স্থানীয় জনগণের সঙ্গে যোগাযোগ ও সম্পৃক্ততা বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছে। অধীনস্থ বিওপিগুলোর উদ্যোগে নিয়মিত জনসচেতনতামূলক সভা আয়োজন করা হচ্ছে। এসব সভায় স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি, জনপ্রতিনিধি এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষদের সঙ্গে মতবিনিময় করা হচ্ছে। আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে সীমান্ত এলাকায় কেউ যেন কোনো ধরনের অপরাধ সংঘটিত করতে না পারে, সে বিষয়ে সবাইকে সতর্ক করা হচ্ছে এবং যেকোনো সন্দেহজনক ঘটনা সম্পর্কে দ্রুত বিজিবিকে তথ্য দেওয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে।
স্থানীয়দের সঙ্গে এই সম্পর্ককে বিজিবি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছে। কারণ সীমান্ত এলাকার মানুষই প্রথম কোনো অস্বাভাবিক তৎপরতা লক্ষ্য করতে পারেন। বিজিবি কর্মকর্তারা মনে করছেন, জনসাধারণের সহযোগিতা পেলে সীমান্ত অপরাধ দমনে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখা সম্ভব হবে। ফলে নিয়মিত নির্দেশনার মাধ্যমে সীমান্তে যেকোনো ধরনের আন্তঃসীমান্ত অপরাধ প্রতিরোধে সবাইকে সচেতন করা হচ্ছে।
নির্বাচনকে কেন্দ্র করে শুধু দেশের অভ্যন্তরীণ প্রস্তুতিই নয়, আন্তর্জাতিক সমন্বয়ের দিকটিও গুরুত্ব পাচ্ছে। বিজিবি সূত্র জানায়, দায়িত্বপূর্ণ সীমান্তের বিপরীতে অবস্থিত ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের সঙ্গে সুষ্ঠু সমন্বয় বজায় রাখা হচ্ছে। বিভিন্ন পর্যায়ে অনুষ্ঠিত পতাকা বৈঠকের মাধ্যমে সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করা হচ্ছে। এসব বৈঠকে ভারতীয় অংশে সম্ভাব্য দুষ্কৃতিকারীদের ওপর নজরদারি বৃদ্ধির পাশাপাশি সীমান্তে পারস্পরিক সমন্বিত ও যৌথ টহল পরিচালনার বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বিজিবি ও বিএসএফের মধ্যে এই সমন্বয়কে সীমান্ত নিরাপত্তার জন্য ইতিবাচক বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। উভয় বাহিনী একসঙ্গে কাজ করলে মাদক পাচার, অবৈধ অনুপ্রবেশ ও সম্ভাব্য চোরাচালান কার্যক্রম অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। নির্বাচনকালীন সময়ে সীমান্ত এলাকায় শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে এই সমন্বিত উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বিজিবি সূত্র আরও জানায়, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে শান্তিপূর্ণ ও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে এবং সীমান্ত এলাকার সার্বিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে নিয়মিত টহল কার্যক্রম, গোয়েন্দা নজরদারি ও জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে। নির্বাচন শেষ না হওয়া পর্যন্ত এই কার্যক্রম আরও জোরদার থাকবে বলেও জানানো হয়েছে।
সীমান্ত এলাকার সাধারণ মানুষের মধ্যে এই উদ্যোগ ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। অনেকেই বলছেন, নির্বাচন সামনে রেখে বিজিবির এমন সক্রিয় উপস্থিতি তাদের মধ্যে নিরাপত্তাবোধ বাড়িয়েছে। সীমান্ত এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে মাদক ও চোরাচালান একটি বড় সমস্যা হিসেবে দেখা দিলেও সাম্প্রতিক সময়ে নজরদারি বাড়ায় এসব তৎপরতা কমে এসেছে বলে তাদের অভিমত।
রংপুর ব্যাটালিয়ন (৫১ বিজিবি) অধিনায়ক লে. কর্নেল সেলিম আল দীন আবারও আশ্বস্ত করে বলেন, অবৈধ অনুপ্রবেশ ও মাদক পাচাররোধে বিজিবি সর্বদা সতর্ক ও প্রস্তুত রয়েছে। দেশের নিরাপত্তা ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার সুরক্ষায় সীমান্ত এলাকায় বিজিবির সদস্যরা দায়িত্ব পালনে কোনো ধরনের শৈথিল্য দেখাবেন না। নির্বাচন ঘিরে যেকোনো ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাহিনী সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে বলে তিনি জানান।
সব মিলিয়ে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে লালমনিরহাটের সীমান্ত এলাকায় বিজিবির এই কঠোর অবস্থান শুধু নিরাপত্তা জোরদারই নয়, বরং একটি শান্তিপূর্ণ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল। সীমান্তে স্থিতিশীলতা বজায় থাকলে দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও গণতান্ত্রিক পরিবেশও আরও সুদৃঢ় হবে—এমন প্রত্যাশাই এখন সবার।










