প্রকাশ: ০৩ জানুয়ারি ২০২৬। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক অঙ্গনে যখন উত্তাপ ক্রমেই বাড়ছে, ঠিক সেই সময় জাতীয় পার্টির মনোনয়নের বৈধতা নিয়ে তীব্র আপত্তি ও বিতর্ক নতুন মাত্রা যোগ করেছে নির্বাচনী পরিবেশে। রংপুরে জাতীয় পার্টির এক প্রার্থীর মনোনয়ন বৈধ ঘোষণার ঘটনায় আপত্তি জানিয়ে দলটিকে আগামী নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণার দাবি তুলেছেন এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন। তাঁর এই বক্তব্য শুধু একটি আসনের মনোনয়ন ঘিরে সীমাবদ্ধ নয়; বরং বিগত দেড় দশকের রাজনৈতিক বাস্তবতা, ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলন এবং ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের রাজনীতির দিকনির্দেশনা নিয়ে বৃহত্তর এক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
শুক্রবার ২ জানুয়ারি সন্ধ্যায় রংপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে প্রার্থীদের মনোনয়ন যাচাই-বাছাই চলাকালে জাতীয় পার্টির প্রার্থীর মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করা হয়। এর পরপরই আপত্তি জানান আখতার হোসেন। যাচাই-বাছাই শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি জাতীয় পার্টির ভূমিকা নিয়ে কঠোর ভাষায় সমালোচনা করেন এবং দলটির নির্বাচনে অংশগ্রহণের নৈতিক ও রাজনৈতিক বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ করেন।
আখতার হোসেন বলেন, বাংলাদেশে গত ১৬ বছর ধরে যে ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তা কোনো একক শক্তির মাধ্যমে হঠাৎ করে তৈরি হয়নি। তাঁর মতে, সেই স্বৈরাচারী শাসন টিকিয়ে রাখতে নানা রাজনৈতিক শক্তি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সহযোগিতা করেছে, আর জাতীয় পার্টি ছিল তাদের অন্যতম। তিনি দাবি করেন, স্বৈরাচারী ব্যবস্থাকে বৈধতা দেওয়া, সংসদ ও রাজনৈতিক কাঠামোর মাধ্যমে সেটিকে টিকিয়ে রাখা এবং জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার সংকুচিত করার ক্ষেত্রে জাতীয় পার্টি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে। এই কারণেই দলটিকে তিনি ‘ফ্যাসিবাদের দোসর’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন।
আখতার আরও বলেন, জাতীয় পার্টির বিষয়ে সরকার এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে তারা বারবার আবেদন জানিয়েছেন, যেন যারা স্বৈরাচারের সহযোগী হিসেবে কাজ করেছে, তাদের নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া না হয়। তাঁর ভাষায়, “যারা ফ্যাসিবাদকে বৈধতা দিয়েছে, যারা জনগণের ভোটাধিকার হরণে সহযোগিতা করেছে, তারা কোনোভাবেই আগামী নির্বাচনে অংশ নিতে পারে না।”
জাতীয় পার্টির প্রার্থীর মনোনয়নের বিরুদ্ধে আপত্তির যুক্তি তুলে ধরে তিনি বলেন, বর্তমান নির্বাচনী আইন ও বিধিমালার কিছু ফাঁকফোকরের সুযোগ নিয়ে ফ্যাসিবাদের সহযোগীরা আবারও রাজনৈতিক পুনর্বাসনের চেষ্টা করছে। আখতারের অভিযোগ, জাতীয় পার্টির সংশ্লিষ্ট প্রার্থী সেই দলের সঙ্গে যুক্ত, যারা অতীতে স্বৈরাচারী ব্যবস্থার অংশ ছিল। ফলে একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে তিনি শুধু ব্যক্তিগতভাবে নয়, বরং দেশের জনগণের পক্ষ থেকে রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে আপত্তি তুলেছেন।
তিনি অভিযোগ করেন, তাঁদের আপত্তি সত্ত্বেও আইনি যাচাই-বাছাইয়ের অজুহাতে জাতীয় পার্টির প্রার্থীর মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। এই সিদ্ধান্তে হতাশা প্রকাশ করে আখতার বলেন, আইনের মারপ্যাঁচ ব্যবহার করে ফ্যাসিবাদের দোসরদের পুনর্বাসনের নানা চক্রান্ত হতে পারে। তবে তিনি স্পষ্ট করে দেন, জুলাই মাসে যারা রাজপথে নেমে ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে সামনের সারিতে ছিলেন, যারা রক্ত দিতে প্রস্তুত ছিলেন, তারা কোনো অবস্থাতেই দেশে ফ্যাসিবাদী রাজনীতির পুনরুত্থান মেনে নেবেন না।
জাতীয় পার্টির মনোনয়ন বৈধতার বিরুদ্ধে প্রয়োজনে আইনি লড়াইয়ের ঘোষণাও দেন এনসিপির এই নেতা। তিনি জানান, যাচাই-বাছাইয়ের সময় লিখিত আপত্তি জানানোর সুযোগ সম্পর্কে তাদের আগে জানানো হয়নি। সে কারণে মৌখিকভাবে আপত্তি জানাতে হয়েছে। ভবিষ্যতে যদি আইনগতভাবে লিখিত আপত্তি বা আইনি মোকাবিলার সুযোগ পাওয়া যায়, তবে আনুষ্ঠানিকভাবে জাতীয় পার্টির মনোনয়ন বৈধতার বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
এদিকে আখতার হোসেন জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন আটদলীয় জোটের সঙ্গে এনসিপির রাজনৈতিক সমঝোতা নিয়েও কথা বলেন। তিনি জানান, সংস্কার বাস্তবায়ন, দৃশ্যমান বিচার ব্যবস্থা, দুর্নীতিমুক্ত ও আধিপত্যবাদমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যেই এনসিপি এই জোটের সঙ্গে একত্রে নির্বাচনী কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে আসন ভাগাভাগি এখনো চূড়ান্ত হয়নি বলে জানান তিনি। তাঁর ভাষায়, এনসিপি ও জামায়াতের মধ্যে আলোচনা চলমান রয়েছে এবং অল্প সময়ের মধ্যেই আসন বিন্যাসের বিষয়টি চূড়ান্ত হবে।
অন্যদিকে এনসিপির আপত্তির জবাবে রংপুর-৪ আসনের জাতীয় পার্টির মনোনয়ন বৈধ হওয়া প্রার্থী মাহবুবুর রহমান ভিন্ন অবস্থান তুলে ধরেন। তিনি বলেন, তাঁর বিরুদ্ধে কে কোথায় কী মামলা করেছে বা অভিযোগ এনেছে, সে বিষয়গুলো প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ভালোভাবেই জানে। এসব বিষয় তদন্তের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট সংস্থার, এবং তারা সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত নেবে। মাহবুবুর রহমানের দাবি, দাপ্তরিকভাবে যাঁরা দায়িত্বপ্রাপ্ত, তাঁরা সুচিন্তিত মতামতের ভিত্তিতেই তাঁর মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করেছেন। ফলে এ বিষয়ে নতুন করে প্রশ্ন তোলার সুযোগ নেই বলেও তিনি মনে করেন।
এই ঘটনার মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠছে যে, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন শুধু ভোটের লড়াই নয়, বরং অতীতের রাজনৈতিক ভূমিকা, দায়বদ্ধতা এবং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রশ্নে একটি আদর্শিক সংঘাতের রূপ নিচ্ছে। জাতীয় পার্টির মনোনয়ন বৈধতা নিয়ে ওঠা আপত্তি সেই বৃহত্তর বিতর্কেরই অংশ। একদিকে রয়েছে আইনগত প্রক্রিয়া ও নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত, অন্যদিকে রয়েছে রাজনৈতিক নৈতিকতা ও ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের দাবি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই ধরনের আপত্তি ও পাল্টা বক্তব্য নির্বাচনী রাজনীতিতে উত্তেজনা বাড়ালেও একই সঙ্গে অতীতের শাসনব্যবস্থা ও রাজনৈতিক দায় নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করছে। ভোটারদের একাংশ বিষয়টিকে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের প্রশ্ন হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ কেউ আশঙ্কা করছেন, এসব বিতর্ক নির্বাচনী পরিবেশকে আরও সংঘাতমুখর করতে পারে।
সব মিলিয়ে জাতীয় পার্টির মনোনয়ন বৈধতা ঘিরে আখতার হোসেনের আপত্তি শুধু একটি নির্বাচনী ঘটনা নয়; এটি বাংলাদেশের রাজনীতিতে ফ্যাসিবাদ, সংস্কার ও রাজনৈতিক পুনর্বাসন নিয়ে চলমান বৃহত্তর বিতর্কের প্রতিফলন। আগামী দিনগুলোতে এই ইস্যু আইনি ও রাজনৈতিক দুই ক্ষেত্রেই কতটা গড়ায়, সেদিকেই এখন নজর রাজনৈতিক মহলের।