নীলফামারী-৪ আসনে মনোনয়ন বাতিল, নির্বাচনী সমীকরণে পরিবর্তন

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ৩ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৬১ বার
নীলফামারী-৪ আসনে মনোনয়ন বাতিল, নির্বাচনী সমীকরণে পরিবর্তন

প্রকাশ: ০৩ জানুয়ারি ২০২৬। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নীলফামারী-৪ আসনে মনোনয়ন যাচাই-বাছাইয়ের পর চারজন স্বতন্ত্র প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল হওয়ায় স্থানীয় রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। কিশোরগঞ্জ ও সৈয়দপুর উপজেলা নিয়ে গঠিত এই আসনে মোট ১২ জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র দাখিল করেছিলেন। শুক্রবার বিকালে যাচাই-বাছাই শেষে এর মধ্যে আটজনের মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করা হলেও তথ্যে গরমিল ও এক শতাংশ ভোটারের স্বাক্ষরের সঠিকতা না পাওয়ায় চারজন স্বতন্ত্র প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল করা হয়।

জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ের কনফারেন্স রুমে অনুষ্ঠিত যাচাই-বাছাই কার্যক্রম শেষে বিষয়টি নিশ্চিত করেন রিটার্নিং কর্মকর্তা ও নীলফামারীর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ নায়িরুজ্জামান। তিনি জানান, নির্বাচন কমিশনের বিধিমালা অনুযায়ী দাখিল করা মনোনয়নপত্রের তথ্য, হলফনামা ও ভোটারদের সমর্থন যাচাই করা হয়েছে। যাচাইয়ের সময় কিছু মনোনয়নপত্রে তথ্যগত অসঙ্গতি এবং নির্ধারিত এক শতাংশ ভোটারের স্বাক্ষরের ক্ষেত্রে ত্রুটি পাওয়া যায়, যা আইনি দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য নয়। এ কারণে সংশ্লিষ্ট চারজন স্বতন্ত্র প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

নীলফামারী-৪ আসনটি রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত। শিল্পনগরী হিসেবে পরিচিত সৈয়দপুর ও কৃষিপ্রধান কিশোরগঞ্জ উপজেলা নিয়ে গঠিত এই আসনে ভোটারদের মধ্যে বরাবরই রাজনৈতিক সচেতনতা তুলনামূলক বেশি। অতীতেও এখানে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন হয়েছে। ফলে মনোনয়ন বাতিলের সিদ্ধান্ত নির্বাচনী সমীকরণে প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন স্থানীয় রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।

রিটার্নিং কর্মকর্তা জানান, যাচাই-বাছাই শেষে যাদের মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে, তারা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রার্থী। বৈধ প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আব্দুল মুনতাকিম, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের মো. আব্দুল গফুর সরকার, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মো. শহিদুল ইসলাম, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির মির্জা মো. শওকত আকবর রওশন, জাতীয় পার্টির মো. জয়নাল আবেদীন ও মো. সিদ্দিকুল আলম, বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল (মার্কসবাদী) এর মো. মাইদুল ইসলাম এবং লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির নুর মোহাম্মদ। এসব প্রার্থীর মনোনয়নপত্র নির্বাচন কমিশনের বিধি অনুযায়ী যথাযথ পাওয়া গেছে বলে জানান তিনি।

অন্যদিকে যাদের মনোনয়ন বাতিল হয়েছে, তারা সবাই স্বতন্ত্র প্রার্থী। মনোনয়ন বাতিল হওয়া প্রার্থীরা হলেন জোবায়দুর রহমান (হীরা), মো. রিয়াদ আরফান সরকার, এস. এম. মামুনুর রশিদ এবং মো. শাহরিয়ার ফেরদৌস। যাচাই-বাছাইয়ের সময় তাদের দাখিল করা কাগজপত্রে প্রয়োজনীয় তথ্যের অসঙ্গতি এবং সমর্থনকারী ভোটারদের স্বাক্ষরের ক্ষেত্রে অনিয়ম ধরা পড়ে। ফলে বিধি অনুযায়ী তাদের মনোনয়ন গ্রহণযোগ্য হয়নি বলে জানানো হয়।

মনোনয়ন বাতিল হওয়া প্রার্থীদের জন্য এখনও আইনি সুযোগ রয়েছে। রিটার্নিং কর্মকর্তা মোহাম্মদ নায়িরুজ্জামান জানান, তারা আগামী ৯ জানুয়ারি পর্যন্ত আপিল আবেদন করতে পারবেন। আপিল কর্তৃপক্ষ যদি মনে করে যে ত্রুটি সংশোধনযোগ্য বা যাচাইয়ে কোনো ভুল হয়েছে, তাহলে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এই আপিল প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশ হবে না।

মনোনয়ন বাতিলের খবরে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের সমর্থকদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ কেউ হতাশা প্রকাশ করেছেন, আবার কেউ আশা করছেন আপিলের মাধ্যমে বিষয়টি পুনর্বিবেচনা হতে পারে। একাধিক সমর্থক জানান, স্বতন্ত্র প্রার্থীরা সাধারণত সীমিত সম্পদ নিয়ে নির্বাচন করেন, ফলে মনোনয়নপত্র প্রস্তুতের ক্ষেত্রে অনভিজ্ঞতা বা প্রশাসনিক জটিলতায় পড়ার সম্ভাবনা থাকে। তবে নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা বলছেন, আইনের দৃষ্টিতে সকল প্রার্থী সমান এবং বিধিমালা মেনে চলা সবার জন্য বাধ্যতামূলক।

অন্যদিকে বৈধ ঘোষিত প্রার্থীদের শিবিরে নির্বাচনী প্রস্তুতি জোরদার করার তৎপরতা শুরু হয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ের দলীয় নেতাকর্মীরা বলছেন, মনোনয়ন যাচাই-বাছাইয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ শেষ হওয়ায় এখন তারা প্রচারণার কৌশল ও সংগঠনিক প্রস্তুতির দিকে মনোযোগ দেবেন। নীলফামারী-৪ আসনে দলগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা হবে তীব্র, এমনটাই ধারণা তাদের।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, চারজন স্বতন্ত্র প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল হওয়ায় ভোটের মাঠে দলীয় প্রার্থীদের প্রভাব কিছুটা বাড়তে পারে। বিশেষ করে যেসব ভোটার স্বতন্ত্র প্রার্থীদের সমর্থন করতেন, তারা এখন বিকল্প হিসেবে কোন দল বা প্রার্থীর দিকে ঝুঁকবেন, সেটিই হবে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। এই পরিস্থিতি নির্বাচনের ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে।

স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, নির্বাচনকে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করতে তারা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছেন। মনোনয়ন যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়াটি ছিল উন্মুক্ত ও স্বচ্ছ। প্রার্থীদের সামনে বসেই প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাই করা হয়েছে এবং সিদ্ধান্ত জানানো হয়েছে। কোনো প্রার্থীর প্রতি পক্ষপাতিত্ব করা হয়নি বলেও তারা দাবি করেন।

নীলফামারী-৪ আসনের সাধারণ ভোটারদের মধ্যেও বিষয়টি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, নিয়ম মেনে নির্বাচন হলে গণতন্ত্র আরও শক্তিশালী হবে। আবার কেউ কেউ বলছেন, স্বতন্ত্র প্রার্থীদের সুযোগ কমে গেলে ভোটারদের পছন্দের পরিসর সংকুচিত হতে পারে। তবে অধিকাংশ ভোটারই শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন দেখতে চান।

সামগ্রিকভাবে নীলফামারী-৪ আসনে মনোনয়ন যাচাই-বাছাইয়ের এই সিদ্ধান্ত আসন্ন নির্বাচনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। আপিল প্রক্রিয়া শেষে চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশ হলে নির্বাচনী চিত্র আরও স্পষ্ট হবে। এখন দৃষ্টি আগামী কয়েক দিনের দিকে, যেখানে দেখা যাবে মনোনয়ন বাতিল হওয়া প্রার্থীরা আইনি লড়াইয়ে কতটা এগোতে পারেন এবং সেই সঙ্গে এই আসনের ভোটের সমীকরণ কোন দিকে মোড় নেয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত