প্রকাশ: ০৩ জানুয়ারি ২০২৬। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
নতুন বছরের প্রথম দিনেই নিউইয়র্ক সিটির রাজনৈতিক অঙ্গনে এক ব্যতিক্রমী ও তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়ের সূচনা করেছেন নবনির্বাচিত মেয়র জোহরান মামদানি। দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই তিনি তার পূর্বসূরি এরিক অ্যাডামসের জারি করা একাধিক নির্বাহী আদেশ বাতিল করে নতুন নির্দেশনায় স্বাক্ষর করেন। এসব আদেশের মধ্যে ইসরাইল-সংক্রান্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত বাতিল হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক পরিসর পর্যন্ত বিষয়টি ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
বার্তা সংস্থা আনাদোলুর খবরে জানানো হয়, দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম দিনেই মামদানি যে নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষর করেছেন, তাতে ২০২৪ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর বা তার পরে স্বাক্ষরিত এবং ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত কার্যকর থাকা সব নির্দেশিকা বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে। তবে এর আগের নির্বাহী আদেশগুলো সংশোধন বা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাহার না করা পর্যন্ত কার্যকর থাকবে বলে স্পষ্ট করা হয়। এই ঘোষণার মাধ্যমে সাবেক মেয়র এরিক অ্যাডামসের শেষ সময়ের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়ে।
নিউইয়র্ক সিটির প্রশাসনিক ইতিহাসে এমন পদক্ষেপ খুবই বিরল নয়, তবে মামদানির সিদ্ধান্তের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক তাৎপর্য আলাদা করে গুরুত্ব পাচ্ছে। বিশেষ করে গত মাসে এরিক অ্যাডামসের স্বাক্ষর করা একটি নির্বাহী আদেশ, যার মাধ্যমে নিউইয়র্ক সিটির বিভিন্ন সংস্থাকে ইসরাইল থেকে বয়কট বা বিচ্ছিন্ন করার যেকোনো উদ্যোগ নিষিদ্ধ করা হয়েছিল, সেটি বাতিল হওয়ায় বিষয়টি নতুন মাত্রা পেয়েছে। এই আদেশ বাতিলের ফলে সিটি প্রশাসনের নীতিগত অবস্থানে একটি পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
মেয়র হিসেবে শপথ নেওয়ার পর জোহরান মামদানি তার বক্তব্যে নিউইয়র্ক সিটির বহুত্ববাদী চরিত্র, মানবাধিকার এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, একটি গণতান্ত্রিক নগরী হিসেবে নিউইয়র্কের প্রশাসনিক সিদ্ধান্তগুলো হতে হবে স্বচ্ছ, ন্যায্য এবং সকল সম্প্রদায়ের প্রতি সম্মান প্রদর্শনকারী। তার মতে, কোনো নির্দিষ্ট আন্তর্জাতিক ইস্যুতে মতপ্রকাশ বা অবস্থান গ্রহণের ক্ষেত্রে নাগরিক ও প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা সীমিত করা উচিত নয়।
এই প্রেক্ষাপটে সাবেক মেয়রের ইসরাইল-সংক্রান্ত নির্বাহী আদেশ বাতিলের সিদ্ধান্তকে অনেকেই মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পক্ষে একটি প্রতীকী পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন। আবার অন্যদিকে, সমালোচকদের একটি অংশ আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে, এই সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নিউইয়র্ক সিটির অবস্থান নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, পূর্ববর্তী প্রশাসনের সময় গঠিত ইহুদি-বিদ্বেষ প্রতিরোধ অফিস বাতিল করা হয়নি। মামদানি প্রশাসন স্পষ্ট করে জানিয়েছে, এই দপ্তর তার কার্যক্রম অব্যাহত রাখবে এবং ইহুদি সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা ও অধিকার সুরক্ষায় সিটি কর্তৃপক্ষ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকবে। এই ঘোষণার মাধ্যমে নতুন মেয়র একটি ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান নেওয়ার চেষ্টা করছেন বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
তবে আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া খুব দ্রুতই সামনে আসে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ইসরাইলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জোহরান মামদানির বিরুদ্ধে ইহুদি-বিদ্বেষকে উস্কে দেওয়ার অভিযোগ তোলে। তাদের দাবি, সাবেক মেয়রের আদেশ বাতিলের মাধ্যমে এমন একটি বার্তা দেওয়া হয়েছে, যা ইহুদি জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা ও মর্যাদার প্রশ্নে উদ্বেগ তৈরি করতে পারে। এই বক্তব্য ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক বিতর্ক শুরু হয় এবং বিভিন্ন পক্ষ থেকে ভিন্ন ভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেখা যায়।
নিউইয়র্ক সিটি দীর্ঘদিন ধরেই বিশ্বের অন্যতম বহুজাতিক ও বহুসাংস্কৃতিক নগরী হিসেবে পরিচিত। এখানে ইহুদি, মুসলিম, খ্রিস্টানসহ নানা ধর্ম ও সংস্কৃতির মানুষের বসবাস। ফলে মধ্যপ্রাচ্য ইস্যু বা ইসরাইল-ফিলিস্তিন প্রসঙ্গ নিয়ে যেকোনো প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত স্বাভাবিকভাবেই সংবেদনশীল হিসেবে বিবেচিত হয়। অতীতেও এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিয়ে সিটির রাজনীতিতে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, মামদানির এই পদক্ষেপ তার নির্বাচনী অঙ্গীকার ও রাজনৈতিক দর্শনের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ। প্রচারণার সময় তিনি বারবার নাগরিক স্বাধীনতা, মানবাধিকার এবং ন্যায়বিচারের কথা বলেছিলেন। দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার মাধ্যমে তিনি নিজের অবস্থান স্পষ্ট করতে চেয়েছেন বলে মনে করা হচ্ছে।
অন্যদিকে, বিরোধী পক্ষের রাজনীতিকরা বলছেন, মেয়রের এই সিদ্ধান্ত নিউইয়র্ক সিটির দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক ভারসাম্যকে প্রশ্নের মুখে ফেলতে পারে। তাদের মতে, আন্তর্জাতিক ইস্যুতে এমন পদক্ষেপ নেওয়ার আগে আরও বিস্তৃত আলোচনা ও পরামর্শ প্রয়োজন ছিল। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে ইসরাইল ইস্যু অত্যন্ত স্পর্শকাতর হওয়ায় বিষয়টি আরও সতর্কতার সঙ্গে দেখা উচিত ছিল।
এদিকে, মানবাধিকারকর্মীদের একটি অংশ মামদানির সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন। তাদের মতে, কোনো নগর প্রশাসনের উচিত নয় নির্দিষ্ট কোনো দেশের পক্ষে বা বিপক্ষে অবস্থান চাপিয়ে দেওয়া। বরং নাগরিকদের শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ, মতপ্রকাশ ও নীতিগত অবস্থান গ্রহণের অধিকার নিশ্চিত করা প্রশাসনের দায়িত্ব।
নিউইয়র্কের সাধারণ নাগরিকদের মধ্যেও এ নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ কেউ মনে করছেন, নতুন মেয়র দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম দিনেই সাহসী সিদ্ধান্ত নিয়ে একটি শক্ত বার্তা দিয়েছেন। আবার কেউ কেউ উদ্বেগ প্রকাশ করছেন, এর ফলে শহরের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি বা উত্তেজনা সৃষ্টি হতে পারে।
সব মিলিয়ে, দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম দিনেই জোহরান মামদানির এই নির্বাহী আদেশ নিউইয়র্ক সিটির রাজনীতিতে একটি নতুন আলোচনার সূচনা করেছে। এটি শুধু একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং নগরীটির নীতিগত অবস্থান, আন্তর্জাতিক সংবেদনশীলতা এবং বহুসাংস্কৃতিক বাস্তবতার প্রতিফলন হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে। সামনে এই সিদ্ধান্তের বাস্তব প্রভাব কী হবে এবং প্রশাসন কীভাবে বিভিন্ন পক্ষের উদ্বেগ ও প্রত্যাশার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করবে, তা সময়ই বলে দেবে।