প্রকাশ: ০৩ জানুয়ারি ২০২৬। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ইউটিউবের যুগে ব্যক্তিগত স্মৃতি, শৈশব ও বেড়ে ওঠার গল্প এখন আর শুধু ব্যক্তিগত ডায়েরিতে সীমাবদ্ধ নেই। সেই ধারাবাহিকতায় শহীদ ওসমান হাদি তার ইউটিউব চ্যানেলে প্রকাশ করতে শুরু করেছেন আত্মজীবনীমূলক ধারাবাহিক ‘যেভাবে বেড়ে উঠি’। ইতোমধ্যে প্রকাশিত দুটি পর্ব ব্যাপক পাঠক ও দর্শক আগ্রহ তৈরি করেছে। ভিডিও থেকে অনুলিখন করেছেন মাহদি হাসান। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর তৃতীয় দিনের বিশেষ সংখ্যায় আত্মজীবনীর প্রথম পর্ব প্রকাশিত হওয়ার পর ধারাবাহিকভাবে এটি সাহিত্য সাময়িকীতে ছাপা হচ্ছে। আজ প্রকাশিত হলো এই আত্মজীবনী ধারাবাহিকের তৃতীয় পর্ব, যেখানে উঠে এসেছে নেসারাবাদ মাদরাসায় কাটানো শৈশব, নেতৃত্বের সূচনা, প্রতিযোগিতার অভিজ্ঞতা এবং আত্মবিশ্বাস গড়ে ওঠার গল্প।
নেসারাবাদে পড়াশোনার সময় থেকেই নেতৃত্ব, সংগঠন এবং দায়িত্ববোধের সঙ্গে শহীদ ওসমান হাদির পরিচয় ঘটে। ক্লাস ফোরে পড়াকালীন সময়েই তিনি প্রথম ছাত্র সংসদ নির্বাচনে সরাসরি ভোটে ইউনিট পরিচালক বা ক্লাস পরিচালক নির্বাচিত হন। সেই বয়সেই নির্বাচনী প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে দায়িত্ব পাওয়া তার জন্য ছিল এক নতুন অভিজ্ঞতা। প্রতি মাসে ছাত্র সংসদের সভায় ভিপি, প্রো-ভিপি, জিএস ও এজিএসদের সঙ্গে বসে ক্লাসের কার্যক্রমের রিপোর্ট উপস্থাপন করা ছিল নিয়মিত কাজ। কোন ক্লাস কতটা ভালো পারফর্ম করেছে, কে কত চাঁদা তুলেছে, সাপ্তাহিক জলসা কতটা সুন্দর হয়েছে—এসব বিষয়েই নির্ধারিত হতো শ্রেষ্ঠ ক্লাস ও শ্রেষ্ঠ পরিচালকের পুরস্কার। শৈশবের সেই সময়েই দায়িত্ব পালনের প্রতি তার আন্তরিকতা ও সচেতনতা তাকে বারবার শ্রেষ্ঠ পরিচালক হিসেবে নির্বাচিত করে।
নেসারাবাদের ছাত্র সংসদের জলসা ও মিছিল ছিল এক অনন্য সাংস্কৃতিক অনুশীলন। প্রতি বৃহস্পতিবার জলসা শেষে বিশাল ক্যাম্পাসজুড়ে প্রতিটি ক্লাস থেকে বের হতো আলাদা আলাদা মিছিল। স্লোগান, শৃঙ্খলা ও উপস্থাপনার ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা হতো কোন ক্লাসের মিছিল সবচেয়ে সুন্দর। সারা বছরের পারফরম্যান্স মিলিয়ে ‘শ্রেষ্ঠ ক্লাস’ নির্বাচিত হতো। এই প্রতিযোগিতার মধ্যেই গড়ে উঠেছিল দলগত চেতনা ও শৃঙ্খলাবোধ। ইউনিফর্ম ছিল কঠোরভাবে নির্ধারিত—সাদা জামা, পায়জামা, সাদা টুপি ও সাদা কেডস। একশ জনের মধ্যে একজনের পোশাকে সামান্য ব্যত্যয় ঘটলেও নম্বর কাটা যেত। এই নিয়ম মানতে গিয়ে ওসমান হাদি নিজের উদ্যোগে অতিরিক্ত সাদা টুপি ও কেডস কিনে ক্লাসে রেখে দিতেন, যাতে হঠাৎ শিক্ষক পরিদর্শনে কেউ বিপদে না পড়ে। শৈশবের এই ছোট ছোট দায়িত্ববোধই ভবিষ্যতের বড় পরিসরের নেতৃত্বের ভিত্তি তৈরি করে।
নেসারাবাদের দিনগুলো শুধু সাফল্যের গল্প নয়, ছিল সংঘর্ষ ও প্রতিদ্বন্দ্বিতার স্মৃতিও। ক্লাস সিক্সে পড়ার সময় ক্লাস সেভেনের সঙ্গে শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই ছিল তীব্র। একদিন জলসা শেষে মিছিল চলাকালে হঠাৎ সংঘর্ষ বাঁধে। পেছন থেকে আঘাতে মাথা ফেটে রক্ত ঝরলেও মিছিল ভাঙতে না দিয়ে সামনে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন তিনি। পরে বিষয়টি প্রিন্সিপাল পর্যন্ত গড়ায় এবং চিকিৎসার খরচ বহন করে বিষয়টির নিষ্পত্তি হয়। এই ঘটনাগুলো শৈশবের সাহস, সহনশীলতা এবং নেতৃত্বের পরীক্ষাই যেন ছিল।
নেসারাবাদের শিক্ষাজীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল সৃজনশীল চর্চা। ক্লাস এইটে পড়ার সময় মাথায় আসে একটি মাসিক পত্রিকা প্রকাশের ভাবনা। এর আগে দেয়ালিকার অভিজ্ঞতা থাকলেও ছাপানো পত্রিকা প্রকাশ ছিল বড় উদ্যোগ। সাহস করে লেখা সংগ্রহ, সম্পাদনা ও প্রকাশনার কাজ হাতে নেন তিনি। ‘নবজাগরণ’ নামে প্রকাশিত সেই পত্রিকার তিনটি সংখ্যা বের হয়, যার একটি সংখ্যা আজও তার কাছে সংরক্ষিত। কবিতা, গল্প ও সৃজনশীল লেখায় ভরপুর সেই পত্রিকা ছিল কিশোর বয়সের স্বপ্ন ও সাহসের প্রতিচ্ছবি।
নেসারাবাদের পড়াশোনার পরিবেশ ছিল বহুমাত্রিক। আসরের পর কখনো আরবি বিভাগে, কখনো ইংরেজি বিভাগে বসে চলত সাংস্কৃতিক ও শিক্ষামূলক প্রোগ্রাম। কখনো আরবিতে, কখনো ইংরেজিতে মিছিল হতো, যা শিক্ষার্থীদের ভাষাগত দক্ষতা ও আত্মবিশ্বাস বাড়াতে সহায়ক ছিল। এই পরিবেশেই গড়ে ওঠে বক্তৃতা, আবৃত্তি, বিতর্ক ও লেখালেখির প্রতি গভীর আগ্রহ।
শুধু মাদরাসার গণ্ডিতে নয়, জাতীয় পর্যায়ের প্রতিযোগিতায়ও নিয়মিত অংশ নিতেন শহীদ ওসমান হাদি। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহ, ইসলামিক ফাউন্ডেশনের আয়োজন কিংবা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় উপজেলা, জেলা, বিভাগ পেরিয়ে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত পৌঁছানো ছিল তার জন্য নিয়মিত অভিজ্ঞতা। বক্তৃতা, উপস্থিত বক্তৃতা, কবিতা, বিতর্ক ও রচনা প্রতিযোগিতায় একাধিকবার জাতীয় পর্যায়ে প্রথম স্থান অর্জন করেন তিনি। ক্লাস এইটে পড়াকালীন প্রথম জাতীয় পুরস্কার গ্রহণ করেন আগারগাঁওয়ের একটি অডিটোরিয়ামে, যা তার স্মৃতিতে আজও উজ্জ্বল।
এই সাফল্যের পেছনে কাজ করেছে বহুমুখী প্রতিযোগিতার অভিজ্ঞতা। মাদরাসার বাইরে গিয়ে সরকারি স্কুল ও কলেজের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হয়েছে, বিশেষ করে ঝালকাঠি সদর পর্যায়ে। সহশিক্ষার পরিবেশে মেয়েদের সঙ্গে প্রতিযোগিতাও তাকে মানসিকভাবে পরিণত করেছে। এই প্রতিযোগিতাই তাকে নিজের সীমা ছাড়িয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা দিয়েছে।
যাতায়াত ভাতা হিসেবে পাওয়া সামান্য অর্থ, বিচারকদের উৎসাহ, জাতীয় পর্যায়ে পরিচিত মুখ—সব মিলিয়ে নেসারাবাদের সেই দিনগুলো ছিল শেখার এক বিশাল ক্ষেত্র। বিচারকদের কাছ থেকে পাওয়া পরামর্শ, যোগাযোগের সুযোগ এবং প্রশংসা তাকে আরও সামনে এগিয়ে যেতে সহায়তা করেছে।
‘যেভাবে বেড়ে উঠি’ শুধু একটি ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণ নয়, এটি একটি সময়, একটি শিক্ষা ব্যবস্থা এবং একটি প্রজন্মের আত্মগঠনের গল্প। নেসারাবাদের শৈশব, মিছিল, জলসা, প্রতিযোগিতা ও সৃজনশীল উদ্যোগ—সব মিলিয়ে এই আত্মজীবনী আমাদের দেখায় কীভাবে শৈশবের ছোট ছোট অভিজ্ঞতা একজন মানুষকে ধীরে ধীরে গড়ে তোলে। শহীদ ওসমান হাদির এই বর্ণনা পাঠককে শুধু অতীতে নিয়ে যায় না, বরং অনুপ্রেরণা দেয় নিজেদের বেড়ে ওঠার গল্প নতুন করে ভাবতে।










