প্রকাশ: ০৪ জানুয়ারি ২০২৬। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
সোশ্যাল মিডিয়া, আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও বিভিন্ন বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে সাম্প্রতিক সময়ে একটি প্রশ্নই ঘুরে ফিরে আসছে—মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরবর্তী টার্গেট কোন দেশ। ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যাওয়ার ঘটনাকে ঘিরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যে আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে, তার রেশ কাটতে না কাটতেই এবার প্রকাশ্যে কলম্বিয়া ও কিউবাকে ঘিরে কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত দিলেন ট্রাম্প। ফ্লোরিডায় দেওয়া এক সংবাদ সম্মেলনে কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রোর বিরুদ্ধে সরাসরি মাদক উৎপাদন ও যুক্তরাষ্ট্রে মাদক পাচার তদারকির অভিযোগ এনে তিনি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন, ওয়াশিংটনের নজর এখন লাতিন আমেরিকার আরও কয়েকটি দেশের দিকে।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম টিআরটি ওয়ার্ল্ডসহ বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ফ্লোরিডার ওই সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প বলেন, কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট পেত্রোর কোকেন কারখানা রয়েছে এবং সেখান থেকে কোকেন উৎপাদন করে তা যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো হচ্ছে। তিনি দাবি করেন, এই কর্মকাণ্ডের দিকে যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক নজর রাখতে হবে। ট্রাম্পের এই বক্তব্য প্রকাশের পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয় তীব্র আলোচনা ও বিতর্ক। কেউ কেউ এটিকে যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন পররাষ্ট্রনীতির পূর্বাভাস হিসেবে দেখছেন, আবার অনেকে বলছেন, এটি রাজনৈতিক চাপ তৈরির কৌশল।
ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করার অভিযানের আগেও ট্রাম্প প্রশাসন বারবার কারাকাসের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রে অবৈধ মাদক চোরাচালানের অভিযোগ তুলেছিল। সেই অভিযোগের ধারাবাহিকতায় ভেনেজুয়েলার ওপর কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তামূলক চাপ বাড়ানো হয়। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, মাদুরোর বিরুদ্ধে নেওয়া পদক্ষেপ ছিল শুধু একটি দেশের বিরুদ্ধে নয়, বরং পুরো অঞ্চলের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর অবস্থানের প্রতিফলন। এখন কলম্বিয়া ও কিউবাকে ঘিরে নতুন করে যে বক্তব্য আসছে, তাতে এই ধারণাই আরও জোরালো হচ্ছে।
কলম্বিয়ার ক্ষেত্রে ট্রাম্পের অভিযোগ বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও কলম্বিয়ার মধ্যে নিরাপত্তা সহযোগিতা এবং মাদকবিরোধী কার্যক্রম নিয়ে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। কলম্বিয়া সরকারের পক্ষ থেকে অতীতে একাধিকবার দাবি করা হয়েছে, তারা মাদক উৎপাদন ও পাচার রোধে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। তবে ট্রাম্পের বক্তব্যে সেই সহযোগিতার চিত্র প্রশ্নের মুখে পড়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এটি কেবল মাদক ইস্যু নয়, বরং কলম্বিয়ার অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও আঞ্চলিক কৌশলের সঙ্গেও জড়িত।
এদিকে কিউবাকে নিয়েও ট্রাম্পের বক্তব্য নতুন করে উত্তেজনা তৈরি করেছে। কিউবাকে তিনি একটি ‘ব্যর্থ রাষ্ট্র’ হিসেবে আখ্যায়িত করে দেশটির দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক সংকটের জন্য নেতৃত্বকে দায়ী করেছেন। ট্রাম্পের ভাষায়, কিউবার মানুষ বহু বছর ধরে কষ্ট সহ্য করছে এবং যুক্তরাষ্ট্র কিউবার জনগণকে সাহায্য করতে চায়। একই সঙ্গে তিনি ইঙ্গিত দেন, কিউবা থেকে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী অভিবাসীদের প্রতিও তার প্রশাসনের সহানুভূতি রয়েছে। এই বক্তব্য অনেকের কাছে মানবিক মনে হলেও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এর পেছনে রয়েছে কিউবার সরকারের ওপর নতুন করে চাপ তৈরির কৌশল।
লাতিন আমেরিকা দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। ঠান্ডা যুদ্ধের সময় থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত এই অঞ্চলে মার্কিন হস্তক্ষেপ, কূটনৈতিক চাপ ও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার ইতিহাস রয়েছে। ট্রাম্পের আগের মেয়াদেও ভেনেজুয়েলা, কিউবা ও নিকারাগুয়ার মতো দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর নীতির মুখে পড়েছিল। এখন আবার নতুন করে এই দেশগুলোর নাম উঠে আসায় আন্তর্জাতিক মহলে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র কি আবারও লাতিন আমেরিকায় আক্রমণাত্মক নীতি গ্রহণ করতে যাচ্ছে।
বিশ্ব রাজনীতির প্রেক্ষাপটে ট্রাম্পের এই বক্তব্যকে কেউ কেউ অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক কৌশল হিসেবেও দেখছেন। যুক্তরাষ্ট্রে মাদক সমস্যা দীর্ঘদিনের একটি বড় সামাজিক ও রাজনৈতিক ইস্যু। নির্বাচনী রাজনীতিতে এটি বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কলম্বিয়া বা ভেনেজুয়েলার মতো দেশগুলোর নাম উল্লেখ করে মাদক চোরাচালানের অভিযোগ তুললে অভ্যন্তরীণ জনমতকে প্রভাবিত করা সহজ হয় বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। একই সঙ্গে এটি জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন তুলে ধরে শক্ত অবস্থান নেওয়ার বার্তা দেয়।
অন্যদিকে, মানবাধিকার সংগঠন ও কিছু আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক এই ধরনের বক্তব্যের সমালোচনা করেছেন। তাদের মতে, কোনো দেশের রাষ্ট্রপ্রধানের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে এমন অভিযোগ তোলা কূটনৈতিক শিষ্টাচারের পরিপন্থী এবং এতে আঞ্চলিক অস্থিরতা বাড়তে পারে। বিশেষ করে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্টকে আটক করার ঘটনা আন্তর্জাতিক আইনের প্রশ্নও তুলেছে। এখন যদি একই ধরনের পদক্ষেপ কলম্বিয়া বা কিউবার ক্ষেত্রে নেওয়া হয়, তাহলে তা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন সংকট সৃষ্টি করতে পারে।
বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল অনেক দেশ এই পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। কারণ বৈশ্বিক রাজনীতিতে বড় শক্তিগুলোর সংঘাতের প্রভাব শেষ পর্যন্ত বিশ্ব অর্থনীতি, জ্বালানি বাজার এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ওপর পড়ে। লাতিন আমেরিকার দেশগুলোতে অস্থিরতা বাড়লে তার প্রভাব বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থাতেও পড়তে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ট্রাম্পের বক্তব্য শুধু বক্তব্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও এর মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব ইতোমধ্যে তৈরি হয়েছে।
সব মিলিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—ভেনেজুয়েলার পর ট্রাম্পের পরবর্তী টার্গেট কি সত্যিই কলম্বিয়া বা কিউবা, নাকি এটি কেবল কূটনৈতিক চাপ তৈরির একটি ধাপ। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে অভিজ্ঞ মহল মনে করে, যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ অনেকটাই নির্ভর করবে আঞ্চলিক প্রতিক্রিয়া, মিত্রদের অবস্থান এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর। তবে এটুকু স্পষ্ট, ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বক্তব্য লাতিন আমেরিকা ও বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন করে উত্তাপ ছড়িয়েছে এবং আগামী দিনগুলোতে এই উত্তাপ আরও বাড়তে পারে বলেই আশঙ্কা করা হচ্ছে।