প্রকাশ: ০৪ জানুয়ারি ২০২৬। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ঘন কুয়াশার কবলে পড়ে রোববার সকালে রাজধানীর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বড় ধরনের ফ্লাইট জট ও ভোগান্তির সৃষ্টি হয়। দৃশ্যমানতা আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ায় নিরাপত্তার স্বার্থে আটটি আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট ঢাকায় অবতরণ করতে না পেরে বিকল্প বিমানবন্দরে ডাইভার্ট করা হয়। শীত মৌসুমে কুয়াশাজনিত এমন পরিস্থিতি নতুন না হলেও, একসঙ্গে এতগুলো ফ্লাইটের গন্তব্য পরিবর্তনের ঘটনায় যাত্রী, স্বজন এবং বিমানবন্দর সংশ্লিষ্টদের মধ্যে চরম উৎকণ্ঠা ও দুর্ভোগ দেখা দেয়।
বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) সূত্রে জানা গেছে, রোববার ভোর থেকে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ঘন কুয়াশা পড়তে শুরু করে। বিশেষ করে ভোররাত থেকে সকাল পর্যন্ত সময়টিতে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রানওয়ে এলাকায় দৃশ্যমানতা নেমে আসে নিরাপদ অবতরণের সীমার নিচে। এ অবস্থায় আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচলের নিয়ম অনুযায়ী পাইলট ও এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল কর্তৃপক্ষের সমন্বিত সিদ্ধান্তে ফ্লাইটগুলোকে বিকল্প বিমানবন্দরে পাঠানো হয়।
আজ সকালে গণমাধ্যমকে বিষয়টি নিশ্চিত করেন বেবিচকের জনসংযোগ বিভাগের কর্মকর্তা কাওছার মাহমুদ। তিনি জানান, ঘন কুয়াশাজনিত কারণে ফ্লাইটের নিরাপদ উড্ডয়ন ও অবতরণ নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছিল না। যাত্রীদের জীবন ও বিমানের নিরাপত্তা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার বিবেচনায় রেখে আটটি ফ্লাইট ডাইভার্ট করা হয়েছে। এর মধ্যে ছয়টি ফ্লাইট সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে, একটি ফ্লাইট ভারতের কলকাতা বিমানবন্দরে এবং একটি ফ্লাইট ভিয়েতনামের হ্যানয় বিমানবন্দরে পাঠানো হয়।
বিমানবন্দর সূত্র জানায়, যেসব ফ্লাইট ঢাকায় অবতরণের কথা ছিল, সেগুলোর মধ্যে মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও উপমহাদেশীয় রুটের ফ্লাইট অন্তর্ভুক্ত ছিল। ভোরের দিককার এই ফ্লাইটগুলো সাধারণত রাতভর দীর্ঘ যাত্রা শেষে ঢাকায় পৌঁছে থাকে। কিন্তু কুয়াশার কারণে রানওয়ে পরিষ্কার দেখা না যাওয়ায় পাইলটরা বারবার আকাশে চক্কর দিলেও শেষ পর্যন্ত অবতরণ সম্ভব হয়নি। নির্দিষ্ট সময়ের বেশি আকাশে অবস্থান করলে জ্বালানি ঝুঁকির বিষয়টি সামনে চলে আসায় ডাইভার্ট করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এদিকে ফ্লাইট ডাইভার্টের খবরে বিমানবন্দরের আগমন টার্মিনালে অপেক্ষমান স্বজনদের মধ্যে চরম উদ্বেগ দেখা দেয়। অনেকেই ভোর থেকে বিমানবন্দরে এসে প্রিয়জনকে গ্রহণের অপেক্ষায় ছিলেন। হঠাৎ ফ্লাইটের গন্তব্য পরিবর্তনের খবর পেয়ে তারা হতাশা ও উৎকণ্ঠার মধ্যে পড়েন। কেউ কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করেন, আবার অনেকে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তকে নিরাপত্তার স্বার্থে যৌক্তিক বলেও মন্তব্য করেন।
ডাইভার্ট হওয়া ফ্লাইটগুলোর যাত্রীদের ক্ষেত্রেও ভোগান্তি কম ছিল না। সিলেট, কলকাতা কিংবা হ্যানয়ে নামার পর অনেক যাত্রীই অনিশ্চয়তার মুখে পড়েন—কখন আবার ঢাকায় ফিরতে পারবেন, লাগেজ কীভাবে পাবেন, কিংবা সংযোগ ফ্লাইট ও অন্যান্য পরিকল্পনার কী হবে। সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইন্সগুলো যাত্রীদের সহায়তার জন্য বিকল্প ব্যবস্থার কথা জানালেও বাস্তবে অনেক যাত্রীকে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়েছে বলে জানা গেছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, শীত মৌসুমে ডিসেম্বর থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত ঘন কুয়াশা বাংলাদেশের স্বাভাবিক একটি ঘটনা। বিশেষ করে উত্তর ও মধ্যাঞ্চলে কুয়াশার প্রভাব বেশি দেখা যায়। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে কুয়াশার ঘনত্ব ও স্থায়িত্ব কিছু ক্ষেত্রে বেড়েছে বলে মনে করছেন আবহাওয়াবিদরা। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দেশের প্রধান বিমানবন্দর হওয়ায় এখানে কুয়াশার প্রভাব পড়লে তার প্রতিক্রিয়া দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে পুরো বিমান চলাচল ব্যবস্থায়।
বিমান চলাচল বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আধুনিক বিমানবন্দরগুলোতে ইনস্ট্রুমেন্ট ল্যান্ডিং সিস্টেম বা আইএলএস থাকলেও একটি নির্দিষ্ট সীমার নিচে দৃশ্যমানতা নেমে গেলে ঝুঁকি এড়াতে অবতরণ বাতিল বা বিলম্বিত করাই নিয়ম। ঢাকার বিমানবন্দরে উন্নত প্রযুক্তি থাকলেও অতিরিক্ত ঘন কুয়াশার সময় তা পুরোপুরি কার্যকর রাখা সম্ভব হয় না। ফলে বিকল্প বিমানবন্দর ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিতে হয়।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায় যাত্রী ব্যবস্থাপনা। বিশেষজ্ঞদের মতে, ফ্লাইট ডাইভার্ট হওয়া মানেই যাত্রীদের ভোগান্তি বাড়বে—এটি অনিবার্য। তবে সময়মতো তথ্য জানানো, বিকল্প ভ্রমণ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এবং মানবিক আচরণ বজায় রাখা হলে যাত্রীদের অসন্তোষ অনেকটাই কমানো সম্ভব। এয়ারলাইন্সগুলোর পাশাপাশি বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের সমন্বিত ভূমিকা এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
রোববারের এই ঘটনায় বিমানবন্দরের অভ্যন্তরীণ কার্যক্রমেও চাপ পড়ে। আগত ফ্লাইট না নামায় পরবর্তী ফ্লাইট সূচিতে পরিবর্তন আনতে হয়। কিছু ফ্লাইটের উড্ডয়ন বিলম্বিত হয়, আবার কিছু ফ্লাইটের সময় পুনর্নির্ধারণ করা হয়। এতে করে দিনভর বিমান চলাচলে এক ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়। তবে বেবিচক জানিয়েছে, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ফ্লাইট চলাচল ধীরে ধীরে স্বাভাবিক পথে ফিরতে শুরু করেছে।
শীত মৌসুমে কুয়াশাজনিত সমস্যার স্থায়ী সমাধান নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা চলছে। কেউ কেউ উন্নত প্রযুক্তির আরও ব্যবহার, রানওয়ে আলোকব্যবস্থার উন্নয়ন এবং পাইলটদের বিশেষ প্রশিক্ষণের ওপর জোর দিচ্ছেন। আবার কেউ বলছেন, আবহাওয়ার সঙ্গে লড়াই করার চেয়ে নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেওয়া সবচেয়ে যুক্তিসংগত সিদ্ধান্ত।
সব মিলিয়ে রোববারের ঘন কুয়াশা রাজধানীর আকাশপথে এক ধরনের অচলাবস্থা তৈরি করলেও বড় কোনো দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব হয়েছে। যাত্রী ও বিমানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নেওয়া ডাইভার্ট সিদ্ধান্ত তাৎক্ষণিকভাবে ভোগান্তির কারণ হলেও দীর্ঘমেয়াদে এটি ছিল প্রয়োজনীয় ও দায়িত্বশীল পদক্ষেপ। আবহাওয়া পরিস্থিতি অনুকূলে এলে ডাইভার্ট হওয়া ফ্লাইটগুলো পুনরায় ঢাকায় ফেরার কথা রয়েছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। তবে এই ঘটনা আবারও স্মরণ করিয়ে দিল, শীতের কুয়াশা বাংলাদেশের বিমান চলাচলের জন্য এখনো একটি বড় চ্যালেঞ্জ।










