কানাডায় আইনি সংকটে ১০ লাখ ভারতীয়, অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ৪ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৫৬ বার
কানাডায় আইনি সংকটে ১০ লাখ ভারতীয়, অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ

প্রকাশ: ০৪ জানুয়ারি ২০২৬। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

কানাডায় বসবাসকারী বিপুলসংখ্যক ভারতীয় অভিবাসীর ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। দেশটির অভিবাসন নীতিতে সাম্প্রতিক কঠোরতা, ওয়ার্ক পারমিট ও স্টাডি পারমিটের মেয়াদ শেষ হওয়া এবং নতুন করে ভিসা ও স্থায়ী বসবাসের সুযোগ কমিয়ে আনার সিদ্ধান্তের ফলে প্রায় ১০ লাখ ভারতীয় আইনি মর্যাদা হারানোর ঝুঁকিতে পড়েছেন। আন্তর্জাতিক ও কানাডার বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম, অভিবাসন পরামর্শদাতা প্রতিষ্ঠান এবং সরকারি তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, এই সংকট শুধু ব্যক্তিগত জীবনেই নয়, বরং কানাডার শ্রমবাজার, শিক্ষা ব্যবস্থা ও সামাজিক কাঠামোর ওপরও বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।

হিন্দুস্তান টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মিসিসাগাভিত্তিক ইমিগ্রেশন পরামর্শদাতা কানওয়ার সেরাহ জানান, ইমিগ্রেশন, রিফিউজি ও সিটিজেনশিপ কানাডা বা আইআরসিসি থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ প্রায় ১০ লাখ ৫৩ হাজার ওয়ার্ক পারমিটের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। এর সঙ্গে যোগ হচ্ছে ২০২৬ সালে মেয়াদ শেষ হতে যাওয়া আরও ৯ লাখ ২৭ হাজার ওয়ার্ক পারমিট। এই বিপুল সংখ্যার একটি বড় অংশ ভারতীয় নাগরিকদের, যারা অস্থায়ী কর্মী, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী বা সাময়িক কাজের ভিসায় কানাডায় অবস্থান করছেন।

ওয়ার্ক পারমিটের মেয়াদ শেষ হওয়ার অর্থ শুধু একটি কাগজের বৈধতা হারানো নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে কর্মসংস্থান, বাসস্থান, স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক নিরাপত্তার মতো মৌলিক বিষয়। সেরাহ বলেন, ওয়ার্ক পারমিটের মেয়াদ শেষ হলে যদি সংশ্লিষ্ট অভিবাসীরা অন্য কোনো ভিসা ক্যাটাগরিতে আবেদন না করেন বা স্থায়ী বসবাসের অনুমতি না পান, তাহলে তারা স্বয়ংক্রিয়ভাবে অবৈধ অবস্থানে চলে যাবেন। এতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়বেন অস্থায়ী কর্মী ও আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরা, যারা দীর্ঘদিন ধরে কানাডায় বসবাস করলেও এখন হঠাৎ করে আইনি অনিশ্চয়তার মুখে পড়ছেন।

কানাডার অভিবাসন ইতিহাসে এমন পরিস্থিতি বিরল বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। সেরাহ জানান, শুধু ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকেই প্রায় ৩ লাখ ১৫ হাজার মানুষ আইনি মর্যাদা হারাতে পারেন, যা অভিবাসন ব্যবস্থায় বড় ধরনের চাপ ও স্থবিরতা সৃষ্টি করবে। তার আগে ২০২৫ সালের শেষ দিকে আরও ২ লাখ ৯১ হাজারের বেশি মানুষ একই ঝুঁকির মুখে পড়বেন। সবকিছু মিলিয়ে ২০২৬ সালের মাঝামাঝি নাগাদ কানাডায় অন্তত ২০ লাখ মানুষ আইনি মর্যাদা ছাড়াই বসবাস করতে পারেন, যাদের প্রায় অর্ধেকই ভারতীয় নাগরিক।

এই পরিস্থিতির পেছনে রয়েছে কানাডা সরকারের সাম্প্রতিক নীতিগত পরিবর্তন। গত কয়েক বছরে কানাডা আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ও অস্থায়ী কর্মীদের জন্য তুলনামূলকভাবে উন্মুক্ত নীতি গ্রহণ করেছিল। এর ফলে দেশটিতে বিদেশি শিক্ষার্থী ও শ্রমিকের সংখ্যা দ্রুত বেড়ে যায়, যার একটি বড় অংশ ভারত থেকে আগত। তবে আবাসন সংকট, স্বাস্থ্যসেবার ওপর চাপ এবং স্থানীয় শ্রমবাজারে প্রতিযোগিতা বেড়ে যাওয়ার অভিযোগ সামনে আসার পর সরকার ধীরে ধীরে অভিবাসন নীতিতে কঠোরতা আরোপ করতে শুরু করে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই কঠোরতার সরাসরি প্রভাব পড়ছে ভারতীয় অভিবাসীদের ওপর। কারণ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কানাডায় সবচেয়ে বেশি অস্থায়ী কর্মী ও শিক্ষার্থী এসেছে ভারত থেকে। অনেকেই উচ্চশিক্ষা শেষ করে কাজের অনুমতি পেয়েছিলেন এবং স্থায়ী বসবাসের স্বপ্ন দেখছিলেন। এখন সেই স্বপ্ন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। হাজার হাজার শিক্ষার্থীর স্টাডি পারমিটের মেয়াদও শিগগিরই শেষ হতে যাচ্ছে, এবং অনেক আশ্রয় আবেদন প্রত্যাখ্যাত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে জানিয়েছেন সেরাহ।

কানাডায় বসবাসরত অনেক ভারতীয় এই পরিস্থিতিকে মানবিক সংকট হিসেবেও দেখছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অসংখ্য শিক্ষার্থী ও কর্মী তাদের উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। কেউ কেউ বলছেন, তারা বছরের পর বছর কর দিয়েছেন, কানাডার অর্থনীতিতে অবদান রেখেছেন, কিন্তু এখন হঠাৎ করে আইনি মর্যাদা হারানোর শঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন। অনেকের পরিবার, সন্তানদের শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সবকিছুই এই অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে গেছে।

অন্যদিকে কানাডা সরকারের অবস্থান হলো, অভিবাসন ব্যবস্থাকে টেকসই করতে হলে নিয়ন্ত্রণ জরুরি। সরকার মনে করছে, অতিরিক্ত অস্থায়ী অভিবাসীর চাপ আবাসন ও জনসেবায় সমস্যা তৈরি করছে। তবে সমালোচকরা বলছেন, হঠাৎ করে এত বড় সংখ্যক মানুষের আইনি মর্যাদা ঝুঁকিতে ফেললে অবৈধ অভিবাসীর সংখ্যা বেড়ে যাবে, যা সমস্যার সমাধান না করে বরং নতুন সংকট তৈরি করবে।

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, বৈধতার মেয়াদ শেষ হওয়া মানেই সবাই যে কানাডা ছেড়ে চলে যাবেন, তা নয়। অনেকেই কাজ ও জীবিকার তাগিদে অবৈধ অবস্থানে থেকে যেতে পারেন। এতে শ্রমবাজারে শোষণ বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হবে, কারণ অবৈধ অবস্থানে থাকা কর্মীরা ন্যায্য মজুরি ও অধিকার দাবি করতে সাহস পান না। একই সঙ্গে সামাজিক নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলার ওপরও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

ভারত সরকার বিষয়টি কীভাবে দেখছে, তা নিয়েও আলোচনা চলছে। যদিও এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে বড় কোনো প্রতিক্রিয়া আসেনি, তবে কূটনৈতিক পর্যায়ে বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কারণ এত বিপুলসংখ্যক ভারতীয় নাগরিকের ভবিষ্যৎ একসঙ্গে অনিশ্চিত হয়ে পড়া দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রেও সংবেদনশীল ইস্যু হয়ে উঠতে পারে।

সব মিলিয়ে কানাডায় বসবাসকারী প্রায় ১০ লাখ ভারতীয় এখন এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি। ওয়ার্ক পারমিট ও স্টাডি পারমিটের মেয়াদ শেষ হওয়া, নতুন ভিসা ও স্থায়ী বসবাসের সুযোগ সীমিত হওয়া এবং নীতিগত কঠোরতার ফলে তাদের সামনে রয়েছে আইনি, সামাজিক ও মানসিক সংকট। এই পরিস্থিতি কীভাবে মোকাবিলা করা হবে, তা নির্ভর করছে কানাডা সরকারের পরবর্তী সিদ্ধান্ত, অভিবাসন ব্যবস্থার সংস্কার এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর কূটনৈতিক উদ্যোগের ওপর। তবে এটুকু নিশ্চিত, এই সংকট শুধু একটি দেশের অভিবাসন সমস্যা নয়; এটি বৈশ্বিক অভিবাসন বাস্তবতার এক কঠিন ও মানবিক চিত্র, যা আগামী দিনগুলোতে আরও গভীরভাবে আলোচিত হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত