মাধ্যমিকে বই সংকট: আশ্বাসের মধ্যেও উদ্বিগ্ন শিক্ষার্থীরা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ৫ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৬১ বার
বই পায়নি মাধ্যমিকের শিক্ষার্থীরা

প্রকাশ: ০৫ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরু হলেও দেশের অনেক মাধ্যমিক শিক্ষার্থী এখনো পূর্ণাঙ্গভাবে পাঠ্যবই হাতে পায়নি। বছরের প্রথম দিনে বই উৎসবের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের হাতে বিনামূল্যের পাঠ্যবই তুলে দেওয়ার যে ঐতিহ্য গড়ে উঠেছে, তার ধারাবাহিকতা বজায় রাখার চেষ্টা থাকলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন। বিশেষ করে ষষ্ঠ থেকে নবম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ এখনো প্রয়োজনীয় সব বই না পাওয়ায় পাঠদান কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। অভিভাবক, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে এ নিয়ে দেখা দিয়েছে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা।

জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) অবশ্য দাবি করছে, অতীতের তুলনায় এবার পাঠ্যবই বিতরণে তারা তুলনামূলকভাবে সফল। রোববার প্রকাশিত এক বিজ্ঞপ্তিতে সংস্থাটি জানায়, মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে চুক্তির মেয়াদ ৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত থাকলেও নিবিড় তদারকির মাধ্যমে নির্ধারিত সময়ের আগেই, অর্থাৎ আগামী ১৫ জানুয়ারির মধ্যে মাধ্যমিক ও কারিগরি স্তরের অবশিষ্ট সব বই সরবরাহ নিশ্চিত করা হবে। তবে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর অভিজ্ঞতা বলছে, এই আশ্বাসের পরও অনেক শিক্ষার্থী এখনো বইবঞ্চিত।

এনসিটিবির তথ্য অনুযায়ী, চলতি শিক্ষাবর্ষের জন্য মোট ৩০ কোটি দুই লাখ ৫৫ হাজার ১৫৪ কপি পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৩ জানুয়ারি পর্যন্ত গড়ে ৮৪ দশমিক ৭৮ শতাংশ বই সরবরাহ সম্পন্ন হয়েছে। সংস্থাটির আশা, জানুয়ারির মাঝামাঝি সময়ের মধ্যেই মাধ্যমিক স্তরের অবশিষ্ট সব বই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে। তবে এই পরিসংখ্যানের আড়ালে যে বাস্তব চ্যালেঞ্জ রয়েছে, তা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে কথা বললেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

ইতিবাচক দিক হলো, প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক স্তরের পাঠ্যবই বিতরণ কার্যক্রম প্রায় শতভাগ সফল হয়েছে। এনসিটিবির তথ্যমতে, প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক স্তরের জন্য নির্ধারিত আট কোটি ৫৯ লাখ ৩০ হাজার ৮৮০টি পাঠ্যপুস্তক শতভাগ মুদ্রণ শেষে মহান বিজয় দিবসের আগেই দেশের সব সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। ফলে ১ জানুয়ারি প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার্থী ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর পাঁচটি ভাষায় মুদ্রিত পাঠ্যবই শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দেওয়া সম্ভব হয়েছে। ইবতেদায়ি ও ব্রেইল পদ্ধতির পাঠ্যপুস্তক সরবরাহও প্রায় সম্পন্নের পথে।

কিন্তু চিত্রটি বদলে যায় মাধ্যমিক স্তরে এসে। বর্তমানে ষষ্ঠ থেকে নবম শ্রেণি এবং ইবতেদায়ি স্তরের জন্য নির্ধারিত ২১ কোটি ৪৩ লাখ ২৪ হাজার ২৭৪টি পাঠ্যপুস্তকের কাজ এখনো চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। এনসিটিবির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই স্তরের ৮৮ দশমিক ৫০ শতাংশ বইয়ের মুদ্রণ এবং ৮১ দশমিক ৬০ শতাংশ বইয়ের প্রি-ডেলিভারি ইন্সপেকশন সম্পন্ন হয়েছে। সরবরাহের ক্ষেত্রে এখন পর্যন্ত ৭৮ দশমিক ৬৯ শতাংশ বই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পৌঁছেছে। অর্থাৎ প্রায় এক-পঞ্চমাংশ বই এখনো বিদ্যালয়ে পৌঁছায়নি।

ঢাকার নবাবপুর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা রেবেকা সুলতানা জানান, প্রাথমিক স্তরের সব বই পেলেও মাধ্যমিকের অনেক বই এখনো হাতে পাননি তারা। বিশেষ করে অষ্টম শ্রেণির কোনো বই এখনো বিদ্যালয়ে আসেনি বলে তিনি উল্লেখ করেন। ফলে শিক্ষার্থীরা পাঠ্যসূচি অনুযায়ী নিয়মিত ক্লাসে অংশ নিতে পারলেও বই ছাড়া পাঠদান কার্যক্রম কার্যত বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানান কেরানীগঞ্জের শুভাঢ্যা হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক গোলাম হোসেন। তিনি বলেন, কমবেশি সব শ্রেণির কিছু বই পাওয়া গেলেও নবম শ্রেণির বইয়ের ঘাটতি সবচেয়ে বেশি। এতে করে পরীক্ষামুখী এই শ্রেণির শিক্ষার্থীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অনেক শিক্ষক বাধ্য হয়ে ফটোকপি বা পুরোনো বইয়ের ওপর নির্ভর করে পাঠদান চালাচ্ছেন।

পাঠ্যবই বিতরণে এই সংকটের পেছনে মূল কারণ হিসেবে উঠে এসেছে মুদ্রণ ব্যয়ের প্রশ্ন। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এবার তুলনামূলক কম দরে টেন্ডার দেওয়ায় অনেক প্রেস মালিক মাধ্যমিকের বই ছাপায় আগ্রহ হারিয়েছেন। বিশেষ করে অষ্টম শ্রেণির বইয়ের অবস্থা সবচেয়ে নাজুক। সর্বশেষ তথ্যমতে, এই শ্রেণির মোট বইয়ের প্রায় অর্ধেক এখনো মুদ্রণই হয়নি।

এনসিটিবির টেন্ডার প্রক্রিয়ায় যুক্ত এক কর্মকর্তা জানান, এবার মাধ্যমিকের বইয়ের প্রতি ফর্মার প্রাক্কলিত দর নির্ধারণ করা হয়েছিল তিন টাকা ৪০ পয়সা। কিন্তু প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে কিছু প্রেস মালিক এর চেয়েও কম দরে টেন্ডার জমা দেন। ফলে সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে তারাই কাজ পান। অষ্টম শ্রেণির কিছু বইয়ের ক্ষেত্রে প্রতি ফর্মার দর নেমে এসেছে মাত্র দুই টাকা ৮৩ পয়সায়। এই দরে মানসম্মত কাগজ, ছাপা ও সময়মতো সরবরাহ নিশ্চিত করা অনেক প্রেস মালিকের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে তারা সময়মতো কাজ শেষ করতে পারছেন না।

এ বিষয়ে এনসিটিবির বিতরণ নিয়ন্ত্রক মতিউর রহমান পাঠান অবশ্য আশাবাদী কণ্ঠেই কথা বলেন। তার দাবি, অষ্টম শ্রেণির বই নিয়ে যে শঙ্কা তৈরি হয়েছে, বাস্তবে পরিস্থিতি ততটা ভয়াবহ নয়। এনসিটিবির সর্বশেষ তথ্যে দেখা যাচ্ছে, অষ্টম শ্রেণির অর্ধেকের বেশি বই ইতোমধ্যেই স্কুলে পৌঁছে গেছে। আগামী ১৫ জানুয়ারির মধ্যেই শুধু অষ্টম শ্রেণি নয়, মাধ্যমিকের সব শ্রেণির সব বই শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

তবে শিক্ষাবিদরা মনে করছেন, বছরের শুরুতে বই না পাওয়ার এই সমস্যা নতুন নয়, কিন্তু এটি বারবার ঘটায় শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপ বাড়ে এবং পাঠ্যসূচির ধারাবাহিকতা নষ্ট হয়। বিশেষ করে অষ্টম ও নবম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য এটি বেশি ক্ষতিকর, কারণ এই শ্রেণিগুলোতে পাবলিক পরীক্ষার ভিত্তি তৈরি হয়।

সব মিলিয়ে বলা যায়, এনসিটিবির আশ্বাস ও অগ্রগতির পরিসংখ্যানের মধ্যেও মাঠপর্যায়ে এখনো মাধ্যমিক শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ বই সংকটে ভুগছে। আগামী কয়েক দিনের মধ্যে এই সংকট কতটা কাটিয়ে ওঠা যায়, তার ওপরই নির্ভর করবে চলতি শিক্ষাবর্ষে মাধ্যমিক শিক্ষার্থীদের শিক্ষার গতি ও মান।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত