প্রকাশ: ০৫ জানুয়ারী ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে দেশের সার্বিক পরিবেশ ও পরিস্থিতি এখন পর্যন্ত সন্তোষজনক বলে মন্তব্য করেছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন। সোমবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে প্রবেশের সময় আপিল গ্রহণের জন্য স্থাপিত বুথ পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের তিনি এ কথা বলেন। সিইসি জানান, নির্বাচন কমিশন নিরপেক্ষ ও পেশাদার দায়িত্ব পালনে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ এবং সবার সহযোগিতা পেলে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্যভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব হবে।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার বলেন, নির্বাচন একটি চলমান প্রক্রিয়া এবং প্রতিটি ধাপ সঠিকভাবে সম্পন্ন করাই কমিশনের মূল লক্ষ্য। মনোনয়ন যাচাই, আপিল গ্রহণ, শুনানি ও পরবর্তী কার্যক্রম—সবকিছুই আইন ও বিধিমালা অনুযায়ী পরিচালিত হচ্ছে। তিনি বলেন, “এখন পর্যন্ত যে পরিবেশ আমরা দেখছি, তা সন্তোষজনক। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, প্রশাসন, রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের সহযোগিতায় একটি সুন্দর নির্বাচন উপহার দেওয়া সম্ভব হবে বলে আমরা আশাবাদী।”
সিইসি আরও বলেন, নির্বাচন কমিশন কারও পক্ষে বা বিপক্ষে নয়, কমিশনের একমাত্র দায়িত্ব হচ্ছে সংবিধান অনুযায়ী সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করা। নির্বাচনকে ঘিরে কোনো ধরনের অনিয়ম বা বিশৃঙ্খলার তথ্য পাওয়া গেলে কমিশন তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেবে বলেও তিনি জানান। কমিশনের প্রতিটি কর্মকর্তা-কর্মচারীকে নিরপেক্ষতা বজায় রেখে কাজ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
এদিকে, রিটার্নিং কর্মকর্তাদের দেওয়া সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে নির্বাচন কমিশনে আপিল আবেদনের কার্যক্রম শুরু হয়েছে সোমবার থেকেই। ইসি সূত্র জানায়, মনোনয়নপত্র বাতিল বা গ্রহণ সংক্রান্ত সিদ্ধান্তে যারা সংক্ষুব্ধ, তারা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নির্বাচন কমিশনের কাছে আপিল করতে পারবেন। এ প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ ও সহজ করতে নির্বাচন ভবনে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আপিল গ্রহণের সুবিধার্থে সারাদেশকে ১০টি অঞ্চলে ভাগ করে পৃথক বুথ স্থাপন করা হয়েছে। এর ফলে প্রার্থীরা নিজ নিজ এলাকার নির্ধারিত বুথে গিয়ে সহজেই আপিল দাখিল করতে পারছেন। সকাল থেকেই নির্বাচন ভবনে প্রার্থীদের উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে। অনেক প্রার্থী তাদের আইনজীবী ও সমর্থকদের সঙ্গে নিয়ে আপিল দাখিল করেছেন।
ইসি কর্মকর্তারা জানান, আপিল আবেদন জমা দিতে হলে নির্দিষ্ট নিয়ম অনুসরণ করতে হচ্ছে। একটি সেট মূল কাগজপত্রের সঙ্গে ছয় সেট ছায়ালিপি মেমোরেন্ডাম আকারে জমা দিতে হচ্ছে। এসব কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করে নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী শুনানি অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচন কমিশনের এই পদ্ধতিকে প্রার্থীরা তুলনামূলকভাবে সুশৃঙ্খল ও স্বচ্ছ বলে মনে করছেন।
নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, আগামী ১০ জানুয়ারি থেকে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনের অডিটোরিয়ামে আপিল আবেদনের ওপর পর্যায়ক্রমে শুনানি শুরু হবে। এই শুনানি চলবে ১৮ জানুয়ারি পর্যন্ত। প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে নির্ধারিত সিরিয়াল অনুযায়ী শুনানি অনুষ্ঠিত হবে। তবে আপিলের সংখ্যা ও সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় এই সময়সূচি প্রয়োজনে পরিবর্তন করা হতে পারে বলেও জানানো হয়েছে।
শুনানির সময় সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং কর্মকর্তা অথবা তার প্রতিনিধি এবং আপিলকারীকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ উপস্থিত থাকতে হবে। শুনানি শেষে আপিলের সিদ্ধান্ত তাৎক্ষণিকভাবে মনিটরে প্রদর্শন করা হবে, যাতে সংশ্লিষ্ট সবাই দ্রুত ফলাফল জানতে পারেন। একই সঙ্গে ই-মেইলের মাধ্যমে আপিলের রায়ের পিডিএফ কপি পাঠানো হবে। এছাড়া নির্ধারিত তারিখ অনুযায়ী নির্বাচন ভবন থেকে রায়ের হার্ডকপি সংগ্রহের সুযোগও থাকবে।
ইসি সূত্র জানায়, ১০ থেকে ১২ জানুয়ারির শুনানির রায় ১২ জানুয়ারি, ১৩ থেকে ১৫ জানুয়ারির রায় ১৫ জানুয়ারি এবং ১৬ থেকে ১৮ জানুয়ারির রায় ১৮ জানুয়ারি বিতরণ করা হবে। এই ব্যবস্থার ফলে প্রার্থীদের অযথা অপেক্ষা করতে হবে না এবং পরবর্তী নির্বাচনী কার্যক্রমে অংশ নিতে সুবিধা হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আপিল প্রক্রিয়াটি নির্বাচন ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। এর মাধ্যমে মনোনয়ন সংক্রান্ত অভিযোগ ও আপত্তিগুলো আইনি কাঠামোর ভেতরে নিষ্পত্তি হয়। এতে একদিকে যেমন প্রার্থীদের ন্যায্যতা নিশ্চিত হয়, অন্যদিকে নির্বাচন কমিশনের ওপর জনআস্থা বাড়ে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কমিশন যদি এই ধাপটি দক্ষতার সঙ্গে সম্পন্ন করতে পারে, তবে পুরো নির্বাচনী প্রক্রিয়া আরও বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরাও মনে করছেন, সিইসির বক্তব্য নির্বাচনী পরিবেশ নিয়ে একটি ইতিবাচক বার্তা দিচ্ছে। তবে তারা মনে করেন, নির্বাচন যত এগিয়ে আসবে, ততই চ্যালেঞ্জ বাড়বে। সেক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বিত ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর সংযম ও দায়িত্বশীল আচরণ নির্বাচনকে গ্রহণযোগ্য করার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখবে।
সাধারণ ভোটারদের মধ্যেও নির্বাচনকে ঘিরে নানা আলোচনা চলছে। অনেকেই আশা করছেন, একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে তারা তাদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার সুযোগ পাবেন। নির্বাচন কমিশনের নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপ, বিশেষ করে আপিল ও শুনানির স্বচ্ছ ব্যবস্থা ভোটারদের আস্থা বাড়াতে সহায়ক হবে বলে তারা মনে করছেন।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন তার বক্তব্যে বারবার সবার সহযোগিতার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশন একা সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে পারে না; এর জন্য রাজনৈতিক দল, প্রার্থী, প্রশাসন, গণমাধ্যম ও সাধারণ জনগণের সম্মিলিত সহযোগিতা প্রয়োজন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, সবাই নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করলে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন দেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে একটি ইতিবাচক উদাহরণ হয়ে থাকবে।
সব মিলিয়ে, নির্বাচন কমিশনের প্রস্তুতি, আপিল গ্রহণ ও শুনানির সুস্পষ্ট পরিকল্পনা এবং সিইসির আশাবাদী বক্তব্য দেশের নির্বাচনী পরিবেশ নিয়ে একটি ইতিবাচক চিত্র তুলে ধরছে। এখন দেখার বিষয়, আগামী দিনগুলোতে এই পরিবেশ কতটা স্থিতিশীল থাকে এবং নির্বাচন কমিশন তার ঘোষিত প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন উপহার দিতে কতটা সফল হয়।