পুলিশ-প্রশাসন গুলশানের আন্ডারে, নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ: হাসনাত

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ৬ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৮৮ বার
নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন ও পুলিশ কার্যত একটি নির্দিষ্ট এলাকার প্রভাবের মধ্যে চলে গেছে—এমন অভিযোগ তুলে আসন্ন নির্বাচন

প্রকাশ: ০৬ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন ও পুলিশ কার্যত একটি নির্দিষ্ট এলাকার প্রভাবের মধ্যে চলে গেছে—এমন অভিযোগ তুলে আসন্ন নির্বাচন ও সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিবেশ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-এর কেন্দ্রীয় মুখ্য সংগঠক (দক্ষিণাঞ্চল) হাসনাত আবদুল্লাহ। সোমবার, ৫ জানুয়ারি রাত সাড়ে ১১টার দিকে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক লাইভে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশনের আচরণ নিরপেক্ষতা ও ন্যায্যতার মৌলিক নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে উঠছে, যা একটি অংশগ্রহণমূলক ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন আয়োজনের ক্ষেত্রে বড় বাধা সৃষ্টি করছে।

লাইভ বক্তব্যে হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নির্বাচন কমিশনের অধীনে প্রশাসন ও পুলিশ থাকার কথা। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। তাঁর ভাষায়, “আমরা দেখছি প্রশাসন ও পুলিশ নির্বাচন কমিশনের আন্ডারে না থেকে গুলশানের আন্ডারে চলে গেছে।” এই মন্তব্যের মাধ্যমে তিনি ইঙ্গিত দেন, রাষ্ট্রযন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলো একটি নির্দিষ্ট ক্ষমতাকেন্দ্রের প্রভাবে পরিচালিত হচ্ছে, যা সংবিধানসম্মত কাঠামোর পরিপন্থী এবং অত্যন্ত দুঃখজনক।

নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, আইনের সমতা একটি রাষ্ট্রের মৌলিক নীতি। ব্যক্তি, ধর্ম কিংবা রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, একই কারণে একই রাজনৈতিক দলের প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল করা হলেও অন্য রাজনৈতিক দলের ক্ষেত্রে সেই একই কারণ দেখিয়েই মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করা হচ্ছে। তাঁর মতে, এই দ্বৈত মানদণ্ড নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে জনমনে সন্দেহ তৈরি করছে এবং ভোটারদের আস্থা ক্রমেই ক্ষুণ্ন হচ্ছে।

হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, নির্বাচন কমিশনের এমন আচরণ কেবল একটি দলের জন্য নয়, পুরো নির্বাচনী ব্যবস্থার জন্য উদ্বেগজনক। একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন তখনই সম্ভব, যখন সব রাজনৈতিক দল ও প্রার্থী সমান সুযোগ পায় এবং কমিশন দৃশ্যমানভাবে নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় নির্বাচন কমিশনকে কার্যকরভাবে দেখা যাচ্ছে না বলে তিনি মন্তব্য করেন। তাঁর ভাষায়, নির্বাচন কমিশন যেন দৃশ্যপট থেকে অদৃশ্য হয়ে গেছে, আর প্রশাসন ও পুলিশ অন্যত্র থেকে নির্দেশনা নিচ্ছে—এমন একটি ধারণা তৈরি হয়েছে।

বক্তব্যে তিনি বিএনপির অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, গত দেড় দশকে যারা রাস্তায় থেকে আন্দোলন করেছেন, হরতাল সফল করতে শ্রম দিয়েছেন, গণতন্ত্রের দাবিতে বারবার ঝুঁকি নিয়েছেন—সেই নেতাকর্মীদের আজ অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হচ্ছে। অনেককে দল থেকে কার্যত ‘মাইনাস’ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। তাঁর মতে, যারা মাঠে ছিল, যারা নির্যাতনের মুখেও আন্দোলনে ছিলেন, তাদের বাদ দিয়ে নতুন করে ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা লোকদের গুরুত্ব দেওয়া হলে দলের ভেতরে তীব্র হতাশা ও ক্ষোভ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।

হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, রাজনৈতিক সংগ্রাম কেবল শীর্ষ নেতৃত্বের কৌশলে সীমাবদ্ধ নয়; মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের ত্যাগ ও অবদানের ওপরই আন্দোলনের ভিত্তি গড়ে ওঠে। সেই বাস্তবতা উপেক্ষা করলে গণতান্ত্রিক রাজনীতির প্রাণশক্তি ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। তিনি প্রশ্ন তোলেন, যারা বছরের পর বছর রাজপথে থেকে আন্দোলন করেছেন, তারা যখন দেখেন তাদের অবদান অগ্রাহ্য করা হচ্ছে, তখন তারা এই পরিবর্তনকে কীভাবে নেবেন?

তিনি আরও বলেন, ৫ আগস্টের পর এমন একটি দৃশ্য দেখা গেছে, যা রাজনৈতিক বাস্তবতায় নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। যে সব গণমাধ্যম একসময় বিএনপিকে ‘আগুন সন্ত্রাসী’ হিসেবে চিহ্নিত করেছিল, সেই সব মাধ্যম ও তাদের মালিকদের এখন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক জিয়াকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানাতে দেখা যাচ্ছে। হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, ব্যক্তিগতভাবে তিনি বিষয়টি কীভাবে নেবেন তা বড় কথা নয়, কিন্তু যারা দীর্ঘদিন ধরে গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করেছেন, তারা বিষয়টি কীভাবে নেবেন—সেটাই আসল প্রশ্ন।

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক জিয়াকে উদ্দেশ করে তিনি সতর্কবার্তা দেন। তাঁর ভাষায়, গত দেড় দশকে যেসব ব্যবসায়ী, মিডিয়া ও প্রশাসনের একটি অংশ তারেক জিয়াকে ‘মাফিয়া’ বানানোর চেষ্টায় লিপ্ত ছিল, তারাই এখন বিএনপির ভেতরে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে। তিনি এটিকে অত্যন্ত আশঙ্কাজনক প্রবণতা হিসেবে উল্লেখ করেন। হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, এভাবে ক্ষমতার নিকটবর্তী একটি গোষ্ঠী রাজনীতির ভেতরে ঢুকে পড়লে ধীরে ধীরে একটি নতুন ফ্যাসিস্ট কাঠামো তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

তিনি বলেন, ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, রাজনীতি যখন ব্যবসা, প্রশাসন ও মিডিয়ার একটি সংকীর্ণ নেক্সাসের মধ্যে বন্দী হয়ে পড়ে, তখন গণতন্ত্র দুর্বল হয়ে যায়। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি তারেক জিয়াকে সতর্ক থাকতে আহ্বান জানান, যেন তিনি প্রশাসন, ব্যবসায়ী ও মিডিয়ার এই জটিল সমীকরণের ফাঁদে না পড়েন। তাঁর মতে, বিএনপির শক্তি এসেছে তৃণমূলের সংগ্রাম থেকে, ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা গোষ্ঠীর কাছ থেকে নয়।

হাসনাত আবদুল্লাহের এই বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার জন্ম দেয়। সমর্থক ও সমালোচক উভয় পক্ষই তার বক্তব্য নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানাতে শুরু করে। কেউ কেউ তার মন্তব্যকে বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ কেউ এটিকে অতিরঞ্জিত অভিযোগ বলেও আখ্যা দিচ্ছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা, প্রশাসন ও পুলিশের ভূমিকা এবং রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র—এই তিনটি বিষয়ই আসন্ন নির্বাচনকে ঘিরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে উঠেছে। হাসনাত আবদুল্লাহের বক্তব্য সেই প্রশ্নগুলোকে আরও জোরালোভাবে সামনে এনেছে। নির্বাচন কমিশন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কীভাবে এই অভিযোগগুলোর জবাব দেবে এবং আস্থা ফিরিয়ে আনতে কী পদক্ষেপ নেয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

এই প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক অঙ্গনের অনেকেই মনে করছেন, নির্বাচনকে বিশ্বাসযোগ্য করতে হলে কেবল বক্তব্য বা আশ্বাস নয়, বাস্তব পদক্ষেপের মাধ্যমে নিরপেক্ষতা প্রমাণ করা জরুরি। প্রশাসন ও পুলিশের ওপর নির্বাচন কমিশনের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ, আইনের সমান প্রয়োগ এবং রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতরে ত্যাগী নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন—এই বিষয়গুলোই আগামী দিনের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য নির্ধারক হয়ে উঠতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত