প্রকাশ: ১২ জুলাই’ ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন
বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ঘিরে সাম্প্রতিক সময়ে যে সব গোপন তথ্য ও অডিও প্রকাশ্যে এসেছে, তা শুধু বাংলাদেশ নয়, গোটা দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক বাস্তবতাকে নাড়িয়ে দিয়েছে। একসময় যিনি উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতার প্রতীক হিসেবে গণ্য হতেন, সেই নেত্রী আজ মানবাধিকার লঙ্ঘন ও রাষ্ট্রীয় সহিংসতার প্রত্যক্ষ নির্দেশদাতা হিসেবে অভিযুক্ত হচ্ছেন—এমন অভিযোগ আর কেবল রাজনৈতিক নয়, তা এখন আন্তর্জাতিকভাবে যাচাইকৃত তথ্যপ্রমাণ ও ফরেনসিক বিশ্লেষণের আলোকে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে।
বিশেষত গত বছরের ৫ আগস্ট ঢাকা ও অন্যান্য শহরে ছাত্র-যুবদের ওপর যে নজিরবিহীন সহিংসতা চালানো হয়, তার পেছনে শেখ হাসিনার প্রত্যক্ষ নির্দেশ ছিল—এমন ভয়াবহ সত্যই উঠে এসেছে একটি আন্তর্জাতিক তদন্তে। প্রকাশিত অডিওর ভয়েস-ম্যাচিং বিশ্লেষণ নিশ্চিত করেছে, শেখ হাসিনাই ওই রাতে মাঠে থাকা নিরাপত্তা বাহিনীকে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ দেন। এই নির্দেশ বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে ঢাকার রাজপথ রঞ্জিত হয় শত শত তরুণের রক্তে।
প্রথমদিকে সরকারি চাকরিতে সংস্কার দাবিতে শুরু হওয়া ছাত্র-আন্দোলন দ্রুতই জাতীয় পর্যায়ে গণআন্দোলনে রূপ নেয়। এই অভ্যুত্থান রাজনৈতিক ব্যবস্থার দুর্বলতা ও গণতন্ত্রহীনতার নগ্ন বহিঃপ্রকাশ ঘটায়। কিন্তু তার জবাবে সরকার যে পন্থা বেছে নেয়, তা ছিল একেবারে সহিংস, পরিকল্পিত এবং রাষ্ট্রীয় মদদে পরিচালিত। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর দাবি, ওই এক সপ্তাহে নিহতের সংখ্যা এক হাজার ছাড়িয়ে যায়। গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা, গণগ্রেফতার এবং পঙ্গু করে দেওয়ার মতো নৃশংস ঘটনা তখন ছিল নিয়মিত সংবাদ।
এই সহিংসতার পেছনে সরকারের সর্বোচ্চ স্তরের অনুমোদন ছিল—এখন তা অস্বীকারের সুযোগ নেই। কারণ, রেকর্ড করা নির্দেশনায় শেখ হাসিনাকে বলতে শোনা যায়, “সময় থাকতেই থামাও ওদের, যেভাবে হোক।” ওই বক্তব্যে কোনো দ্বিধা নেই, কোনো অস্পষ্টতা নেই। আছে একটি সুসংগঠিত রাষ্ট্রীয় দমননীতির স্পষ্ট প্রতিফলন।
একসময় স্বাধীন বিচারব্যবস্থা, বাকস্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকার রক্ষায় প্রতিশ্রুতিশীল শেখ হাসিনা, গত এক দশকে ধীরে ধীরে এক ব্যক্তিকেন্দ্রিক, কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রযন্ত্র নির্মাণ করেছেন—যেখানে বিরোধিতা মানেই ছিল নিঃশব্দ নির্মূল। তার প্রশাসনের অধীনে গড়ে ওঠে নজরদারি প্রযুক্তি, যার মাধ্যমে সমালোচকদের অবস্থান, যোগাযোগ ও আন্দোলনের পরিকল্পনা আগেভাগেই ভেঙে দেওয়া হতো।
এই প্রেক্ষাপটে ‘গণতান্ত্রিক ম্যান্ডেট’ আর ‘উন্নয়নের গল্প’ যে আসলে ছিল এক স্বৈরশাসনের পর্দা, তা এখন আন্তর্জাতিক সমাজের কাছেও স্পষ্ট। তবুও, হাসিনার দল আওয়ামী লীগ এখনো প্রকাশ্যে দাবি করে চলেছে যে এসব পদক্ষেপ ছিল “নিরাপত্তা রক্ষায় জরুরি ও যুক্তিযুক্ত”। কিন্তু হাজারো মা-বাবা যারা তাদের সন্তানদের হারিয়েছেন, তারা জানেন—এই হত্যাযজ্ঞের কোনো নৈতিক ব্যাখ্যা হয় না।
এই সংকট আরও জটিল আকার ধারণ করেছে আন্তর্জাতিক রাজনীতির কারণে। শেখ হাসিনার আশ্রয়দাতা হিসেবে ভারতের ভূমিকা, এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ‘কৌশলগত নীরবতা’ পরিস্থিতিকে আরও বিপজ্জনক করে তুলছে। অনেকেই আশঙ্কা করছেন, যদি এই দমননীতি জবাবদিহিতা ছাড়াই পার পেয়ে যায়, তাহলে দক্ষিণ এশিয়ার অন্য স্বৈরতান্ত্রিক প্রবণতাগুলোও উৎসাহিত হবে।
বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নেতৃত্বে থাকা নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস এবং তার দল গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছেন ঠিকই, কিন্তু তাদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে অতীতের এই ভয়াবহ অন্যায়ের বিচার নিশ্চিত করা। গণতন্ত্র কেবল নির্বাচন নয়—জনগণের সঙ্গে সরকারের সম্পর্কের ন্যায্যতা এবং নৈতিকতা নিশ্চিত করার নাম। সেই বিচারে শেখ হাসিনার সরকার একটি পুরো প্রজন্মের আস্থা ধ্বংস করে দিয়েছে।
এই বিচারপ্রক্রিয়া প্রতিশোধ নয়, বরং ভবিষ্যতের জন্য সতর্কতা। যাতে আগামীতে আর কেউ—কোনো জনপ্রিয় নেতা, কোনো রক্তসূত্রে উত্তরাধিকারপ্রাপ্ত শাসক—রাষ্ট্রীয় শক্তিকে জনগণের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে না পারে। ইতিহাস এখন লিখিত হচ্ছে, এবং সেই ইতিহাস শেখ হাসিনাকে মনে রাখবে, গণতন্ত্র রক্ষার ব্যর্থতাই নয়—গণতন্ত্র ধ্বংসের এক নিষ্ঠুর নির্দেশদাতা হিসেবে।
তাই প্রশ্ন শুধু বাংলাদেশের নয়—প্রশ্ন গোটা অঞ্চলের: কীভাবে একজন নেতা গণতন্ত্রের রক্ষক থেকে হয়ে উঠেন গণতন্ত্রের ঘাতক? শেখ হাসিনাকে ঘিরে ফাঁস হওয়া তথ্যগুলোর মধ্যে সেই উত্তরের ছায়া স্পষ্ট হয়ে উঠছে।