প্রথম ভোটে আনন্দ-আশায় মুখর জবিয়ান শিক্ষার্থীরা

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ৬ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৫৯ বার
প্রথম ভোটে আনন্দ-আশায় মুখর জবিয়ান শিক্ষার্থীরা

প্রকাশ: ০৬ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

প্রতিষ্ঠার ২১ বছর পর জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ, জকসু নির্বাচনের ভোটগ্রহণ শুরু হওয়ায় ক্যাম্পাসজুড়ে তৈরি হয়েছে এক ভিন্ন আবহ। মঙ্গলবার সকাল ৯টার পর বহুল প্রতীক্ষিত এই নির্বাচনে ভোটগ্রহণ শুরু হলে বিশেষ করে প্রথমবার ভোট দিতে আসা শিক্ষার্থীদের চোখেমুখে স্পষ্ট হয়ে ওঠে উচ্ছ্বাস, আনন্দ ও প্রত্যাশার ছাপ। দীর্ঘদিনের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে শিক্ষার্থী সংসদের প্রতিনিধি নির্বাচনে অংশ নিতে পেরে নিজেদের ভাগ্যবান মনে করছেন অনেকেই।

সকাল থেকেই ক্যাম্পাসে প্রবেশপথগুলোতে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি বাড়তে থাকে। কেউ বন্ধুদের সঙ্গে, কেউ একা, আবার কেউ দলবদ্ধভাবে ভোটকেন্দ্রে আসছেন। বিশেষ করে নতুন ব্যাচের শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রথম ভোট দেওয়ার অনুভূতি ছিল আলাদা। অনেকেই বলছিলেন, জাতীয় নির্বাচন সম্পর্কে তারা শুনেছেন, দেখেছেন, কিন্তু শিক্ষার্থী সংসদের ভোটে নিজের ভবিষ্যৎ প্রতিনিধি বেছে নেওয়ার সুযোগ পাওয়া একেবারেই নতুন অভিজ্ঞতা। তাদের ভাষায়, কে জিতবে বা হারবে সেটাই মুখ্য নয়; বরং ভোট দেওয়ার অধিকার প্রয়োগ করতে পারাটাই বড় প্রাপ্তি।

মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের ১৭তম ব্যাচের শিক্ষার্থী জুনায়েদ খান চৌধুরী ভোট দেওয়ার পর নিজের অনুভূতি প্রকাশ করে বলেন, তিনি সত্যিই অনেক আনন্দিত। প্রথমবার ভোট দিতে পেরে তার মধ্যে এক ধরনের দায়িত্ববোধ কাজ করছে। তিনি জানান, জকসু নির্বাচন জাতীয় নির্বাচনের আগে হবে কি না, তা নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে দীর্ঘদিন শঙ্কা ছিল। বিশেষ করে একবার নির্বাচন স্থগিত হওয়ার পর অনেকেই ধরে নিয়েছিলেন জাতীয় নির্বাচনের আগে আর জকসু নির্বাচন হবে না। কিন্তু শিক্ষার্থীদের ধারাবাহিক চাপ ও দাবি শেষ পর্যন্ত প্রশাসনকে এই নির্বাচন আয়োজন করতে বাধ্য করেছে বলে তিনি মনে করেন। তার মতে, এই নির্বাচন শিক্ষার্থীদের ঐক্যেরও একটি উদাহরণ।

উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী মৌ বলেন, প্রথমবার ভোট দিতে পারাটা তার জন্য খুবই ভালো লাগার বিষয়। তবে তিনি মনে করেন, স্থগিতের দিন যে উত্তেজনা ও আমেজ ছিল, আজ তা কিছুটা কম। সে কারণে সকালবেলায় শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি তুলনামূলক কম দেখা গেছে। তবে বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে উপস্থিতি বাড়তে পারে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। মৌর মতে, অনেক শিক্ষার্থী ক্লাস, পরীক্ষা কিংবা ব্যক্তিগত কারণে সকালে আসতে পারেননি, কিন্তু ভোট দেওয়ার আগ্রহ তাদের মধ্যে রয়েছে।

শুধু প্রথমবার ভোট দেওয়া শিক্ষার্থীরাই নন, সিনিয়র শিক্ষার্থীরাও এই নির্বাচনকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছেন। তাদের অনেকেই বলেন, দীর্ঘ সময় জকসু না থাকায় শিক্ষার্থীদের দাবি-দাওয়া ও সমস্যাগুলো সংগঠিতভাবে তুলে ধরার সুযোগ ছিল না। আবাসন সংকট, পরিবহন সমস্যা, একাডেমিক জটিলতা কিংবা ক্যাম্পাস নিরাপত্তা—এসব বিষয়ে শিক্ষার্থীদের কথা বলার একটি কার্যকর প্ল্যাটফর্ম প্রয়োজন ছিল। এই নির্বাচন সেই শূন্যতা পূরণের পথে একটি বড় পদক্ষেপ বলে তারা মনে করছেন।

নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, এবারের জকসু ও হল সংসদ নির্বাচনে মোট ভোটার ১৬ হাজার ৪৪৫ জন। এর মধ্যে নারী ভোটার ৮ হাজার ৪৭৯ জন এবং পুরুষ ভোটার ৮ হাজার ১৭০ জন। কেন্দ্রীয় সংসদ ও হল সংসদ মিলিয়ে মোট প্রার্থী রয়েছেন ১৯০ জন। এই সংখ্যাগুলোই ইঙ্গিত দেয়, নির্বাচনে প্রতিযোগিতা যেমন রয়েছে, তেমনি ভোটার উপস্থিতিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

কমিশন সূত্র জানায়, ভোটগ্রহণের জন্য মোট ৩৯টি কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে এবং এসব কেন্দ্রে বসানো হয়েছে ১৭৮টি বুথ। কেন্দ্রীয় সংসদের জন্য ৩৮টি কেন্দ্র এবং একটি হল সংসদের জন্য আলাদা কেন্দ্র নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রতিটি কেন্দ্রে ভোটারদের সুবিধার্থে প্রয়োজনীয় ব্যালট পেপার, ব্যালট বাক্স ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক সরঞ্জাম প্রস্তুত রাখা হয়েছে। সকাল থেকেই প্রিসাইডিং অফিসার ও পোলিং অফিসাররা নিজ নিজ কেন্দ্রে দায়িত্ব পালন করছেন।

নির্বাচন সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও স্বেচ্ছাসেবক দল মোতায়েন করা হয়েছে। ক্যাম্পাসের ভেতরে ও বাইরে নিরাপত্তা জোরদার থাকায় শিক্ষার্থীরা স্বস্তির সঙ্গে ভোট দিতে পারছেন বলে অনেকেই মন্তব্য করেন। ভোটকেন্দ্রগুলোর সামনে শৃঙ্খলাবদ্ধ লাইন, স্বেচ্ছাসেবকদের দিকনির্দেশনা এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের তৎপরতা নজরে এসেছে।

ভোটগ্রহণকে ঘিরে প্রার্থী ও সমর্থকদের মধ্যেও উৎসবমুখর পরিবেশ দেখা গেছে। বিভিন্ন প্যানেল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ভোটারদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করছেন, কেউ কেউ শেষবারের মতো ভোট ও দোয়া চাইছেন। তবে নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী এসব কার্যক্রম নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে রাখা হচ্ছে, যাতে ভোটগ্রহণে কোনো ধরনের প্রভাব বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি না হয়।

প্রথমবার ভোট দিতে আসা অনেক শিক্ষার্থীই বলছেন, তারা প্রার্থীদের দলীয় পরিচয়ের চেয়ে শিক্ষার্থীদের সমস্যা সমাধানে কারা আন্তরিকভাবে কাজ করতে পারবেন, সেটাই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। কেউ কেউ জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রার্থীদের বক্তব্য, প্রতিশ্রুতি ও অতীত কর্মকাণ্ড দেখে তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এই প্রবণতাকে শিক্ষার্থীদের রাজনৈতিক সচেতনতার ইতিবাচক দিক হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষকও মনে করছেন, শিক্ষার্থী সংসদ নির্বাচন শিক্ষার্থীদের নেতৃত্ব গড়ে ওঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। এখান থেকেই ভবিষ্যতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে শিক্ষার্থীদের স্বার্থরক্ষার কাজ হবে। একজন শিক্ষক বলেন, ভোট দেওয়ার অভ্যাস ও গণতান্ত্রিক চর্চা শিক্ষাজীবনেই শুরু হলে তা ভবিষ্যৎ সমাজের জন্যও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রথম ভোট দেওয়ার অভিজ্ঞতা শেয়ার করছেন অনেক শিক্ষার্থী। কেউ ছবি পোস্ট করছেন, কেউ অনুভূতি লিখছেন। অনেকেই লিখেছেন, “প্রথম ভোট, প্রথম অনুভূতি—ভুলবার নয়।” এই আবেগই প্রমাণ করে, জকসু নির্বাচন শিক্ষার্থীদের জীবনে একটি স্মরণীয় অধ্যায় হয়ে থাকবে।

সব মিলিয়ে, প্রতিষ্ঠার দুই দশকের বেশি সময় পর অনুষ্ঠিত জকসু নির্বাচন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য শুধু একটি আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া নয়; বরং এটি তাদের অধিকার, কণ্ঠস্বর ও ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব গঠনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। প্রথমবার ভোট দিতে পেরে উচ্ছ্বসিত শিক্ষার্থীদের এই অংশগ্রহণ দেখিয়ে দিচ্ছে, প্রতিনিধিত্বের সুযোগ পেলে তরুণ প্রজন্ম দায়িত্ব নিতে প্রস্তুত। এখন দেখার বিষয়, এই ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা শিক্ষার্থীদের সেই প্রত্যাশা কতটা পূরণ করতে পারেন এবং জকসুকে কতটা কার্যকর ও শক্তিশালী একটি প্ল্যাটফর্মে রূপ দিতে সক্ষম হন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত