প্রকাশ: ০৬ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
আমেরিকা মহাদেশ কোনো একক দেশ বা শক্তির সম্পত্তি নয়—এমন স্পষ্ট ও তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য করেছেন মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লাউডিয়া শেইনবাউম। সোমবার দেওয়া এক বক্তব্যে তিনি বলেন, এই মহাদেশ কোনো মতবাদ, আধিপত্য বা প্রভাব বলয়ের অধীনে নয়; বরং এটি এখানকার প্রতিটি স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশের জনগণের। আন্তর্জাতিক রাজনীতির বর্তমান প্রেক্ষাপটে শেইনবাউমের এই বক্তব্য কেবল একটি কূটনৈতিক প্রতিক্রিয়া নয়, বরং পশ্চিম গোলার্ধে শক্তির ভারসাম্য, সার্বভৌমত্ব ও ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা উসকে দিয়েছে।
শেইনবাউমের এই মন্তব্য আসে এমন এক সময়ে, যখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভেনেজুয়েলার নেতা নিকোলাস মাদুরোকে আটক করার সম্ভাব্য সামরিক অভিযান প্রসঙ্গে পশ্চিম গোলার্ধে ওয়াশিংটনের ‘প্রাধান্য’ থাকার কথা উল্লেখ করেন। ওই বক্তব্যে তিনি মনরো ডকট্রিনের আধুনিক রূপের কথা টেনে আনেন। ট্রাম্পের এই অবস্থান অনেক লাতিন আমেরিকান দেশের মধ্যে উদ্বেগ ও প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয়, কারণ অঞ্চলটি অতীতে বহিরাগত হস্তক্ষেপ ও ক্ষমতার রাজনীতির কঠিন অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছে।
মনরো ডকট্রিন ১৮২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জেমস মনরো ঘোষণা করেছিলেন। এর মূল বক্তব্য ছিল, ইউরোপীয় শক্তিগুলো যেন লাতিন আমেরিকার নবগঠিত রাষ্ট্রগুলোতে হস্তক্ষেপ না করে। সে সময় এটি অনেকের কাছে উপনিবেশবাদবিরোধী অবস্থান হিসেবে বিবেচিত হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই নীতিকে যুক্তরাষ্ট্র তার আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে—এমন সমালোচনা লাতিন আমেরিকার ইতিহাসে বারবার উঠে এসেছে। শেইনবাউমের বক্তব্য সেই দীর্ঘ ঐতিহাসিক বিতর্ককে নতুন করে সামনে এনেছে।
মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট বলেন, আমেরিকা মহাদেশের প্রতিটি দেশ স্বাধীনভাবে নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করার অধিকার রাখে। কোনো একটি শক্তি নিজেকে এই অঞ্চলের অভিভাবক বা নিয়ন্ত্রক হিসেবে উপস্থাপন করতে পারে না। তার ভাষায়, “এই মহাদেশ কোনো একক মতবাদ বা শক্তির অধীনে নয়। এটি এখানকার মানুষের, তাদের ইতিহাস, সংগ্রাম ও স্বপ্নের।” তিনি আরও বলেন, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভিত্তি হওয়া উচিত পারস্পরিক সম্মান, সমতা ও সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি।
শেইনবাউমের বক্তব্যকে অনেক বিশ্লেষক যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক অবস্থানের সরাসরি ও কৌশলগত জবাব হিসেবে দেখছেন। বিশেষ করে ভেনেজুয়েলা ইস্যুতে সামরিক অভিযানের সম্ভাবনার কথা ওঠার পর লাতিন আমেরিকার একাধিক দেশ কূটনৈতিকভাবে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। মেক্সিকো ঐতিহ্যগতভাবেই পররাষ্ট্রনীতিতে হস্তক্ষেপবিরোধী ও সংলাপপন্থী অবস্থান গ্রহণ করে এসেছে। শেইনবাউম সেই ধারাবাহিকতাকেই সামনে আনছেন বলে মনে করছেন কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা।
লাতিন আমেরিকার রাজনৈতিক ইতিহাসে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা সবসময়ই আলোচনার কেন্দ্রে ছিল। ঠান্ডা যুদ্ধের সময় থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক দশকগুলো পর্যন্ত, এই অঞ্চলের অনেক দেশে রাজনৈতিক পরিবর্তন, সামরিক অভ্যুত্থান কিংবা অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণে ওয়াশিংটনের প্রভাব নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। এই বাস্তবতায় শেইনবাউমের বক্তব্য অনেক দেশের সাধারণ মানুষের অনুভূতির প্রতিফলন বলেও মনে করছেন কেউ কেউ।
ভেনেজুয়েলা প্রসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান দীর্ঘদিন ধরেই কঠোর। নিকোলাস মাদুরোর সরকারকে অবৈধ আখ্যা দিয়ে ওয়াশিংটন বিভিন্ন ধরনের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে এবং বিরোধী পক্ষকে সমর্থন দিয়েছে। ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মন্তব্যে সামরিক অভিযানের প্রসঙ্গ আসায় সেই উত্তেজনা নতুন মাত্রা পেয়েছে। শেইনবাউমের বক্তব্য এই প্রেক্ষাপটে কেবল ভেনেজুয়েলার পক্ষে নয়, বরং পুরো অঞ্চলের সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে একটি নীতিগত অবস্থান হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, শেইনবাউমের এই বক্তব্য মেক্সিকোর নতুন নেতৃত্বের কূটনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিরও ইঙ্গিত দেয়। প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি সামাজিক ন্যায়বিচার, আঞ্চলিক সংহতি ও বহুপাক্ষিক কূটনীতির ওপর জোর দিচ্ছেন। তার এই অবস্থান মেক্সিকোকে লাতিন আমেরিকায় একটি নৈতিক ও কূটনৈতিক কণ্ঠ হিসেবে আরও দৃশ্যমান করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এখনো শেইনবাউমের বক্তব্যের সরাসরি প্রতিক্রিয়া আসেনি। তবে ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারক মহলে বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে পর্যালোচনা করা হচ্ছে বলে কূটনৈতিক সূত্রগুলো ইঙ্গিত দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিম গোলার্ধে নিজেদের প্রভাব ও নিরাপত্তার যুক্তি তুলে ধরলেও, বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় সেই অবস্থান নতুন করে প্রশ্নের মুখে পড়ছে।
শেইনবাউমের বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশের নাগরিকেরা তার বক্তব্যকে স্বাগত জানিয়ে মন্তব্য করছেন যে, অঞ্চলটির ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার এখানকার মানুষের হাতেই থাকা উচিত। আবার কেউ কেউ বলছেন, বাস্তব রাজনীতিতে শক্তির ভারসাম্য সবসময় আদর্শের সঙ্গে মেলে না, তবুও এমন বক্তব্য আঞ্চলিক আত্মমর্যাদার প্রশ্নে গুরুত্বপূর্ণ।
এই বক্তব্যের আরেকটি দিক হলো বহুপাক্ষিক বিশ্বব্যবস্থার প্রশ্ন। শেইনবাউম পরোক্ষভাবে একক শক্তির আধিপত্যের বদলে বহুপাক্ষিকতা ও আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধার কথা তুলে ধরেছেন। তার মতে, কোনো অঞ্চলের স্থিতিশীলতা ও শান্তি নিশ্চিত করতে হলে সামরিক হুমকি নয়, বরং কূটনৈতিক সংলাপ ও সহযোগিতাই সবচেয়ে কার্যকর পথ।
সব মিলিয়ে, “আমেরিকা কোনো একক শক্তির সম্পত্তি নয়”—এই বক্তব্যটি কেবল একটি বাক্য নয়; এটি লাতিন আমেরিকার দীর্ঘ ইতিহাস, সংগ্রাম ও আত্মপরিচয়ের প্রতিফলন। ক্লাউডিয়া শেইনবাউমের এই অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রসহ বৈশ্বিক শক্তিগুলোর জন্য একটি স্পষ্ট বার্তা বহন করে—এই মহাদেশের দেশগুলো নিজেদের সার্বভৌমত্ব ও মর্যাদা নিয়ে আপস করতে প্রস্তুত নয়। আন্তর্জাতিক রাজনীতির অস্থির এই সময়ে তার বক্তব্য ভবিষ্যতে পশ্চিম গোলার্ধের কূটনৈতিক আলোচনায় কী প্রভাব ফেলে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।