মাদারীপুরে ডেঙ্গু পরিস্থিতি উদ্বেগজনক: বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা, ছড়িয়ে পড়ছে আতঙ্ক

নিজস্ব সংবাদদাতা
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ১২ জুলাই, ২০২৫
  • ২৯ বার
মাদারীপুরে ডেঙ্গু পরিস্থিতি উদ্বেগজনক: বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা, ছড়িয়ে পড়ছে আতঙ্ক

প্রকাশ: ১২ জুলাই’ ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা । একটি বাংলাদেশ অনলাইন

বর্ষা মৌসুমের শুরুতেই মাদারীপুর জেলাজুড়ে ডেঙ্গু জ্বরের প্রকোপ আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে চলেছে। জেলার শহরাঞ্চল থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত ডেঙ্গু সংক্রমণের বিস্তার উদ্বেগজনক মাত্রায় পৌঁছেছে। সরকারি হাসপাতালে প্রতিদিন নতুন রোগী ভর্তি হচ্ছেন, বাড়ছে মৃত্যুঝুঁকি এবং আতঙ্কিত হয়ে উঠছে সাধারণ মানুষ।

স্বাস্থ্য বিভাগের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে জেলায় অন্তত ২০০ জন রোগী ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন। আক্রান্তদের মধ্যে অর্ধেকের বেশি রাজৈর উপজেলার বাসিন্দা। সীমান্তবর্তী গোপালগঞ্জ ও ফরিদপুর জেলার কাছাকাছি অবস্থান হওয়ায় এই এলাকায় সংক্রমণের হার তুলনামূলক বেশি বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

রাজৈরের চরকাকৈর গ্রামের কৃষক সামাদ মাদবর ও তার ছেলে হারুণ মাদবর দুজনেই জ্বরে আক্রান্ত হয়ে শিবচর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি হন। পরীক্ষায় তাদের শরীরে ডেঙ্গু ভাইরাস শনাক্ত হয়। একইভাবে, দিনমজুর শাহীন মাদবর কয়েক দিন ধরে প্রচণ্ড জ্বর ও মাথাব্যথায় ভুগছিলেন। টেকেরহাটে কাজের ফাঁকে অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। পরে হাসপাতালে এসে জানা যায়, তিনিও ডেঙ্গুতে আক্রান্ত।

অপরদিকে, জেলা সদর হাসপাতালে ভর্তি ফল বিক্রেতা নুর ইসলাম জানান, গ্রামের চিকিৎসকদের দেখিয়েও তার জ্বর ও কাঁপুনি কমছিল না। পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় তিনি জেলা হাসপাতালে আসেন এবং ভর্তি হওয়ার পর নিশ্চিত হন যে তিনি ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন। অবস্থার এখনও উন্নতি হয়নি বলে জানান তিনি।

শুধু প্রাপ্তবয়স্ক নয়, শিশুরাও এই জ্বর থেকে রেহাই পাচ্ছে না। মাত্র ছয় বছরের শিশু তাইজুলকে নিয়ে হাসপাতালে ছুটে আসেন তার নানা আনসার উদ্দিন সরদার। হঠাৎ করে জ্বর ওঠার পর বাড়িতে প্রাথমিক চিকিৎসা করা হলেও কাজ হয়নি। এক পর্যায়ে তারা হাসপাতালমুখী হন, যেখানে শিশুটির ডেঙ্গু ধরা পড়ে।

পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুধাবন করে জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ ইতিমধ্যেই বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। মাদারীপুরের সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ শরীফুল আবেদীন কমল জানান, ডেঙ্গু প্রতিরোধে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে আলাদা ইউনিট চালু করা হয়েছে। প্রয়োজনীয় ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম মজুত রয়েছে এবং স্বাস্থ্যকর্মীরা দিনরাত কাজ করে যাচ্ছেন।

তবে চিকিৎসা ব্যবস্থার পাশাপাশি ডেঙ্গু প্রতিরোধে জনসচেতনতাকেই প্রধান হাতিয়ার হিসেবে দেখছেন তিনি। তার মতে, মানুষ নিজ নিজ বাসা-বাড়ির আঙিনা পরিষ্কার না রাখলে এবং জমে থাকা পানি সরিয়ে না ফেললে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। এডিস মশা সাধারণত পরিষ্কার পানিতে ডিম পাড়ে এবং এটাই ডেঙ্গুর বিস্তার ঘটায়।

তিনি আরও বলেন, “ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে লড়াই কেবল সরকারের নয়, এটি হতে হবে জনসম্পৃক্ত একটি সম্মিলিত প্রচেষ্টা। আমরা যতই ওষুধ দেই, হাসপাতাল প্রস্তুত করি—যদি মানুষ সচেতন না হয়, তবে পরিস্থিতির উন্নতি হবে না।”

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়েছেন, মাদারীপুরের বর্তমান পরিস্থিতি যদি এই গতিতে অব্যাহত থাকে এবং এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর উদ্যোগ না নেওয়া হয়, তবে আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই জেলার পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। পরিস্থিতি বিবেচনায়, এখনই মশক নিধন কর্মসূচি, পরিচ্ছন্নতা অভিযান ও জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার করা জরুরি হয়ে পড়েছে।

মাদারীপুরে ডেঙ্গুর এই বিস্তারের পেছনে স্থানীয় প্রশাসনের প্রস্তুতির ঘাটতি, নাগরিক সচেতনতার অভাব এবং আবহাওয়াজনিত কারণগুলোকে দায়ী করছেন বিশ্লেষকরা। এই সংকট মোকাবেলায় এখন দরকার দ্রুত ও সমন্বিত পদক্ষেপ—যাতে একদিকে চিকিৎসা নিশ্চিত করা যায়, অন্যদিকে রোগের বিস্তার রোধ করা সম্ভব হয়।

ডেঙ্গু শুধুই একটি মৌসুমি রোগ নয়—এর পেছনে রয়েছে অব্যবস্থাপনা, অবহেলা এবং আমাদের শহর ও গ্রাম ব্যবস্থার একটি বড় দুর্বলতা। মাদারীপুরের অভিজ্ঞতা সেই দুর্বলতাকে আবারও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত