সাবেক প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ হাসপাতালে ভর্তি

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ৬ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৫৯ বার
সাবেক প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ হাসপাতালে ভর্তি

প্রকাশ: ০৬ জানুয়ারী ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মালয়েশিয়ার রাজনীতির জীবন্ত কিংবদন্তি, শতবর্ষী সাবেক প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ হঠাৎ অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। নিজ বাসভবনে পড়ে যাওয়ার ঘটনার পর মঙ্গলবার তাকে কুয়ালালামপুরের জাতীয় হার্ট ইনস্টিটিউটে নেওয়া হয়। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন তার ঘনিষ্ঠ এক সহকারী। এই খবরে মালয়েশিয়া জুড়ে যেমন উদ্বেগ ছড়িয়েছে, তেমনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও শুরু হয়েছে তার শারীরিক অবস্থা নিয়ে কৌতূহল ও উৎকণ্ঠা।

বার্তা সংস্থা এএফপিকে মাহাথিরের সহকারী সুফি ইউসুফ জানান, বাসভবনের বারান্দা থেকে বসার ঘরে যাওয়ার সময় হোঁচট খেয়ে পড়ে যান মাহাথির মোহাম্মদ। সঙ্গে সঙ্গে তাকে চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে নেওয়া হয়। আপাতত পর্যবেক্ষণের জন্য হাসপাতালে রাখা হয়েছে তাকে। তিনি পুরোপুরি সচেতন রয়েছেন এবং চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলছেন। তবে তাকে স্থায়ীভাবে ভর্তি রাখা হবে কি না, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।

১০০ বছর বয়সী এই রাজনীতিক দীর্ঘদিন ধরেই নানা স্বাস্থ্যগত জটিলতায় ভুগছেন। বিশেষ করে হৃদরোগজনিত সমস্যার কারণে অতীতে একাধিকবার তাকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছে। তার হৃদযন্ত্রে বাইপাস সার্জারিও করা হয়েছিল। বয়সের ভারে শরীর দুর্বল হলেও মানসিকভাবে এখনো তিনি যথেষ্ট সক্রিয়—এ কথা তার ঘনিষ্ঠজনেরা বারবার উল্লেখ করে আসছেন।

মাহাথির মোহাম্মদের অসুস্থতার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার ঝড় উঠেছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি এবং সাধারণ মানুষ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার দ্রুত সুস্থতা কামনা করছেন। মালয়েশিয়ার রাজনীতিতে তার অবদান এতটাই গভীর যে, রাজনৈতিক মতাদর্শের ভিন্নতা সত্ত্বেও মাহাথিরের প্রতি সম্মান ও শ্রদ্ধা সর্বস্তরে বিদ্যমান।

দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে মাহাথির মোহাম্মদ মালয়েশিয়াকে একটি কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি থেকে আধুনিক শিল্প ও প্রযুক্তিনির্ভর রাষ্ট্রে রূপান্তরের পথে নেতৃত্ব দিয়েছেন। ১৯৮১ সালে প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি প্রায় ২২ বছর টানা ক্ষমতায় ছিলেন। এই সময়কালে অবকাঠামো উন্নয়ন, শিল্পায়ন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে ব্যাপক সংস্কার আনেন তিনি। কুয়ালালামপুরের আধুনিক নগরায়ণ, পেট্রোনাস টুইন টাওয়ারের মতো স্থাপনা এবং ‘ভিশন ২০২০’ কর্মসূচির মাধ্যমে দেশকে একটি উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত করার স্বপ্ন দেখান মাহাথির।

২০০৩ সালে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর পর অনেকেই ভেবেছিলেন, তার রাজনৈতিক অধ্যায় বুঝি শেষ। কিন্তু সময় আবারও ভিন্ন কিছু দেখায়। ২০১৮ সালে, ৯৪ বছর বয়সে, তিনি আবারও প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। বিশ্বের ইতিহাসে তিনি তখন সবচেয়ে বয়স্ক নির্বাচিত সরকারপ্রধান হিসেবে স্বীকৃতি পান। তার এই প্রত্যাবর্তন শুধু মালয়েশিয়ার রাজনীতিতেই নয়, বিশ্ব রাজনীতিতেও একটি বিরল ঘটনা হিসেবে আলোচিত হয়।

দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় এসে মাহাথির দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান এবং শাসনব্যবস্থায় সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দেন। যদিও তার এই মেয়াদ তুলনামূলকভাবে স্বল্পস্থায়ী ছিল এবং ২০২০ সালে রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যে তার সরকারের পতন ঘটে, তবুও তার নেতৃত্ব ও অভিজ্ঞতা মালয়েশিয়ার রাজনীতিতে একটি আলাদা ছাপ রেখে যায়।

মাহাথির মোহাম্মদের রাজনৈতিক জীবন ছিল নানা বিতর্ক ও সাহসী সিদ্ধান্তে ভরপুর। একদিকে যেমন তিনি পশ্চিমা বিশ্বের সমালোচক হিসেবে পরিচিত ছিলেন, অন্যদিকে উন্নয়ন ও শৃঙ্খলার প্রশ্নে ছিলেন আপসহীন। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তিনি উন্নয়নশীল দেশগুলোর কণ্ঠস্বর হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। তার বক্তব্য ও অবস্থান অনেক সময় বিতর্ক সৃষ্টি করলেও বিশ্বনেতাদের কাছে তিনি ছিলেন এক অনন্য ব্যক্তিত্ব।

বর্তমানে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার খবরে সেই দীর্ঘ রাজনৈতিক যাত্রাই নতুন করে আলোচনায় এসেছে। অনেকেই বলছেন, মাহাথির শুধু একজন রাজনীতিক নন, তিনি মালয়েশিয়ার আধুনিক ইতিহাসের একটি অধ্যায়। তার সুস্থতা মানে শুধু একজন ব্যক্তির সুস্থতা নয়, বরং একটি জাতির আবেগের সঙ্গেও তা জড়িত।

চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, পড়ে যাওয়ার ঘটনায় গুরুতর কোনো আঘাত লেগেছে কি না, তা নিশ্চিত হতে পর্যবেক্ষণ চলছে। বয়স বিবেচনায় নিয়ে সব ধরনের সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে। পরিবার ও ঘনিষ্ঠজনেরা তার পাশে রয়েছেন এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিত করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মাহাথির মোহাম্মদের স্বাস্থ্যগত অবস্থা শুধু ব্যক্তিগত বিষয় নয়, বরং এটি মালয়েশিয়ার রাজনৈতিক ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। তার জীবন ও কর্ম আগামী প্রজন্মের রাজনীতিকদের জন্য এক অনন্য পাঠ। বয়সের শতবর্ষ ছুঁয়েও যেভাবে তিনি রাজনীতি ও জনজীবনে সক্রিয় থেকেছেন, তা বিশ্ব রাজনীতিতে বিরল দৃষ্টান্ত।

সব মিলিয়ে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদের হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার খবর মালয়েশিয়া ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গভীর আগ্রহের জন্ম দিয়েছে। আপাতত তিনি সচেতন ও স্থিতিশীল থাকলেও তার বয়স ও পূর্ববর্তী স্বাস্থ্যগত ইতিহাসের কারণে সবাই তাকিয়ে আছেন চিকিৎসকদের পরবর্তী ঘোষণার দিকে। তার দীর্ঘ ও বর্ণাঢ্য জীবনের এই মুহূর্তে, বিশ্ববাসী আশা করছে—মালয়েশিয়ার এই প্রবীণ রাষ্ট্রনায়ক আবারও সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসবেন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত