জকসু নির্বাচনে গণনা শুরুর মিনিটেই বন্ধ, কেন থামল ফল

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ৬ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ২১ বার
জকসু নির্বাচনে গণনা শুরুর মিনিটেই বন্ধ, কেন থামল ফল

প্রকাশ: ০৬ জানুয়ারী ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দীর্ঘ প্রতীক্ষা, অনিশ্চয়তা ও নানা নাটকীয়তার পর অনুষ্ঠিত জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জকসু) নির্বাচনের ফলাফল গণনা শুরু হওয়ার মাত্র তিন মিনিটের মধ্যেই বন্ধ হয়ে যাওয়ায় নতুন করে উত্তেজনা ও কৌতূহল তৈরি হয়েছে। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় হঠাৎ এই সিদ্ধান্ত নেওয়াকে ঘিরে ক্যাম্পাসজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে আলোচনা, উৎকণ্ঠা ও নানা জল্পনা-কল্পনা।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশন সূত্র জানায়, মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি) সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার পর ফলাফল গণনা শুরু হয়। তবে গণনা শুরুর অল্প সময়ের মধ্যেই গণনার কক্ষে অতিরিক্ত মানুষের উপস্থিতি পরিস্থিতিকে অস্বাভাবিক করে তোলে। আইনশৃঙ্খলা ও সুষ্ঠু গণনা প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে প্রশাসন দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে ভোট গণনা সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয়। নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে মাইকে ঘোষণা দিয়ে জানানো হয়, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলে পুনরায় গণনা শুরু হবে, তবে তখন শিক্ষক এবং টেলিভিশন সাংবাদিক ছাড়া অন্য কাউকে গণনার কক্ষে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ফলাফল গণনার কক্ষে একসঙ্গে বিপুল সংখ্যক প্রার্থী, তাদের সমর্থক, পর্যবেক্ষক ও বিভিন্ন সংগঠনের নেতাকর্মী ঢুকে পড়ায় ভিড় নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। অনেকেই ফলাফল জানতে উদগ্রীব হয়ে কক্ষের ভেতরে প্রবেশের চেষ্টা করেন। এতে করে গণনার স্বচ্ছতা ও নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা দেখা দেয়। এমন পরিস্থিতিতে নির্বাচন কমিশন ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন গণনা বন্ধ রাখাকেই সবচেয়ে যৌক্তিক সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচনা করে।

এর আগে মঙ্গলবার সকাল ৯টায় শান্তিপূর্ণভাবে ভোটগ্রহণ শুরু হয় এবং তা চলে বিকেল ৩টা পর্যন্ত। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, এবারের জকসু ও হল সংসদ নির্বাচনে মোট ভোটার সংখ্যা ছিল ১৬ হাজার ৬৪৫ জন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩৯টি কেন্দ্রে ১৭৮টি বুথে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। দীর্ঘদিন পর অনুষ্ঠিত হওয়া এই নির্বাচনে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ ছিল চোখে পড়ার মতো। সকাল থেকেই বিভিন্ন কেন্দ্রের সামনে ভোটারদের দীর্ঘ সারি দেখা যায়, যা জকসু নির্বাচন নিয়ে শিক্ষার্থীদের আগ্রহ ও প্রত্যাশার প্রতিফলন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এই নির্বাচন ঘিরে আবেগের পেছনে রয়েছে একটি দীর্ঘ প্রেক্ষাপট। গত ৩০ ডিসেম্বর জকসু নির্বাচনের ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকলেও দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে আসে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর খবরে। ওই পরিস্থিতিতে জরুরি সিন্ডিকেট সভা ডেকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জকসু নির্বাচন স্থগিত ঘোষণা করে। এতে করে ক্যাম্পাসে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। অনেক শিক্ষার্থী সিদ্ধান্তকে অপ্রত্যাশিত ও অযৌক্তিক বলে অভিহিত করে বিক্ষোভে নামেন। কয়েকদিনের টানা আন্দোলন, অবস্থান কর্মসূচি ও আলোচনার পর প্রশাসন শিক্ষার্থীদের দাবির মুখে পিছু হটে এবং নতুন তারিখ হিসেবে ৬ জানুয়ারি নির্ধারণ করে।

ফলে এই নির্বাচন শুধুই একটি ছাত্র সংসদ নির্বাচন নয়, বরং শিক্ষার্থীদের অধিকার, অংশগ্রহণ ও মতপ্রকাশের প্রতীক হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে। সে কারণেই ফলাফল নিয়ে আগ্রহ ও উত্তেজনাও ছিল তুঙ্গে। ভোট গণনা শুরুর সঙ্গে সঙ্গেই বিভিন্ন প্যানেলের সমর্থকরা কক্ষের আশপাশে জড়ো হতে থাকেন। মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যেই ভিড় এতটাই বেড়ে যায় যে গণনার স্বাভাবিক পরিবেশ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।

নির্বাচনে অংশ নেওয়া উল্লেখযোগ্য প্যানেলগুলোর মধ্যে ছিল ছাত্রদল সমর্থিত ‘ঐক্যবদ্ধ নির্ভীক জবিয়ান’, ছাত্রশিবির সমর্থিত ‘অদম্য জবিয়ান ঐক্য’, ছাত্রশক্তি সমর্থিত ‘ঐক্যবদ্ধ জবিয়ান’ এবং বামপন্থি সমর্থিত ‘মওলানা ভাসানী ব্রিগেড’। এ ছাড়াও একটি আংশিক প্যানেল ও একাধিক স্বতন্ত্র প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। ফলে প্রতিটি পদেই হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হয়েছে বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টরা। এই প্রতিযোগিতামূলক পরিস্থিতিই ফলাফল ঘোষণার সময় উত্তেজনা বাড়িয়ে তোলে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, “আমাদের মূল লক্ষ্য হলো সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছভাবে ভোট গণনা সম্পন্ন করা। গণনার কক্ষে অতিরিক্ত মানুষের উপস্থিতিতে সেই পরিবেশ বিঘ্নিত হচ্ছিল। তাই সাময়িকভাবে গণনা বন্ধ রাখা হয়েছে।” নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকেও জানানো হয়েছে, পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে এলেই পুনরায় গণনা শুরু হবে এবং ফলাফল দ্রুত প্রকাশের চেষ্টা করা হবে।

এদিকে ভোট গণনা বন্ধ হওয়ার খবরে অনেক শিক্ষার্থী হতাশা প্রকাশ করলেও অনেকে প্রশাসনের সিদ্ধান্তকে যৌক্তিক বলে মনে করছেন। তাদের মতে, বিশৃঙ্খল পরিবেশে গণনা চালিয়ে গেলে বিতর্ক ও অভিযোগের সৃষ্টি হতে পারত। বরং সাময়িক বিরতি দিয়ে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে গণনা শুরু করাই সঠিক পথ।

ক্যাম্পাসে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সতর্ক অবস্থানে রাখা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন শিক্ষার্থীদের ধৈর্য ধরার আহ্বান জানিয়ে বলেছে, গণনা প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত গুজব ও অপপ্রচারে কান না দেওয়াই সবার জন্য মঙ্গলজনক।

সব মিলিয়ে, গণনা শুরুর তিন মিনিটের মাথায় ভোট গণনা বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনা জকসু নির্বাচনের নাটকীয়তাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। এখন শিক্ষার্থীদের দৃষ্টি একটাই—কবে আবার গণনা শুরু হবে এবং দীর্ঘ অপেক্ষার পর কাঙ্ক্ষিত ফলাফল প্রকাশ পাবে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররাজনীতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণে এই ফলাফল যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত