সেন্টমার্টিন রক্ষায় টেকসই মাস্টারপ্ল্যান চূড়ান্তের তাগিদ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ৬ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ২৫ বার
সেন্টমার্টিন রক্ষায় টেকসই মাস্টারপ্ল্যান চূড়ান্তের তাগিদ

প্রকাশ: ০৬ জানুয়ারী ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিনকে রক্ষা করতে এখনই দীর্ঘমেয়াদি, টেকসই এবং বাস্তবভিত্তিক ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা গ্রহণ জরুরি বলে মন্তব্য করেছেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন, তথ্য ও সম্প্রচার এবং পানি সম্পদ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, পর্যটন উন্নয়নের আগে সেন্টমার্টিনের ভঙ্গুর ও অনন্য প্রতিবেশ সংরক্ষণই হতে হবে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। এই দ্বীপ শুধু একটি পর্যটন গন্তব্য নয়, বরং এটি বাংলাদেশের পরিবেশগত ঐতিহ্যের এক অমূল্য অংশ, যা অবহেলার কারণে আজ মারাত্মক ঝুঁকির মুখে।

মঙ্গলবার পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় পরিবেশ অধিদপ্তরের সহযোগিতায় এবং জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি)-এর সহায়তায় আয়োজিত ‘স্ট্রাটেজিক কনসাল্টেশন ওয়ার্কশপ হোল্ড অন সেন্টমার্টিনস আইল্যান্ড মাস্টারপ্ল্যান’ শীর্ষক উচ্চপর্যায়ের কৌশলগত পরামর্শ কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। রাজধানীতে অনুষ্ঠিত এই কর্মশালায় সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন পর্যায়ের অংশীজনদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো, যা সেন্টমার্টিন ইস্যুতে জাতীয় পর্যায়ে বাড়তে থাকা সচেতনতারই প্রতিফলন।

উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, “সেন্টমার্টিনকে ইতোমধ্যেই ইকোলজিক্যালি ক্রিটিক্যাল এরিয়া বা পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। এর অর্থ হলো, এখানে যেকোনো উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের আগে পরিবেশ সংরক্ষণকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। ট্যুরিজম অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তা যদি এই দ্বীপের প্রতিবেশ ধ্বংসের কারণ হয়, তাহলে সেই পর্যটন কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।” তার বক্তব্যে স্পষ্টভাবে উঠে আসে, উন্নয়নের নামে প্রকৃতি ধ্বংসের যে পুরোনো ধারা, সেন্টমার্টিনের ক্ষেত্রে তা আর চলতে দেওয়া যাবে না।

তিনি আরও বলেন, প্রণয়নাধীন মাস্টারপ্ল্যান এমনভাবে তৈরি করতে হবে, যাতে সেখানে দ্বীপ সংরক্ষণ, জীববৈচিত্র পুনরুদ্ধার এবং পরিবেশ রক্ষায় কী করা যাবে আর কী করা যাবে না—তা পরিষ্কারভাবে উল্লেখ থাকে। এতে করে স্থানীয় জনগোষ্ঠী, প্রশাসন ও পর্যটন সংশ্লিষ্ট সবাই সহজেই এই পরিকল্পনা অনুসরণ করতে পারবে। উপদেষ্টার মতে, অস্পষ্ট বা বাস্তবায়নযোগ্য নয়—এমন পরিকল্পনা কাগজে-কলমে সুন্দর হলেও বাস্তবে কোনো সুফল বয়ে আনে না।

সেন্টমার্টিনে অনিয়ন্ত্রিত পর্যটনের নেতিবাচক প্রভাব তুলে ধরে তিনি বলেন, “সংরক্ষণের স্বার্থে এখানে ট্যুরিজমকে অবশ্যই নিয়ন্ত্রিত করতে হবে। বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ের বেশি বা নির্দিষ্ট সংখ্যার বেশি পর্যটক প্রবেশ করলে দ্বীপের পরিবেশ তার ভার বহন করতে পারে না।” পাশাপাশি তিনি আঞ্চলিক জনগোষ্ঠীর ওপর বহিরাগত ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর আধিপত্য নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তার ভাষায়, স্থানীয় মানুষের স্বার্থ উপেক্ষা করে বাইরের লোকজন শুধু মুনাফার জন্য দ্বীপকে ব্যবহার করলে, তার দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি অনিবার্য।

স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবন-জীবিকার বিষয়টিকেও গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেন উপদেষ্টা। তিনি বলেন, মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে দ্বীপবাসীর সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। শুধুমাত্র নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলেই হবে না; বরং যারা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে সেখানে বসবাস করছেন, তাদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। মাছ ধরা, শুঁটকি ব্যবসা, হস্তশিল্প এমনকি পরিবেশবান্ধব ট্যুরিজম—এসবই হতে পারে টেকসই জীবিকার পথ। এতে একদিকে যেমন স্থানীয়দের জীবনমান উন্নত হবে, অন্যদিকে তারা নিজেরাই দ্বীপ সংরক্ষণের অংশীদার হয়ে উঠবেন।

কর্মশালায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সচিব বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়কালে সেন্টমার্টিন সংরক্ষণে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। এরই অংশ হিসেবে একটি সমন্বিত মাস্টারপ্ল্যানের খসড়া প্রস্তুত করা হয়েছে। তিনি এই পরিকল্পনা প্রণয়নে সহযোগিতাকারী সব সংস্থা, বিশেষ করে ইউএনডিপি এবং সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের ধন্যবাদ জানান। সচিবের বক্তব্যে ইঙ্গিত পাওয়া যায়, সরকার এই পরিকল্পনাকে শুধু নীতিগত দলিল হিসেবে নয়, বাস্তবায়নের উপযোগী একটি রোডম্যাপ হিসেবে দেখতে চায়।

কর্মশালায় সেন্টমার্টিন দ্বীপের বর্তমান পরিবেশগত অবস্থার একটি বিশদ চিত্র তুলে ধরা হয়। জানানো হয়, অসাধারণ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও পরিবেশগত গুরুত্ব থাকা সত্ত্বেও দ্বীপটি আজ বহুমুখী হুমকির মুখে। অনিয়ন্ত্রিত পর্যটনের ফলে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ বর্জ্য উৎপন্ন হচ্ছে, যার সঠিক ব্যবস্থাপনা নেই। প্রবাল ও ঝিনুক নির্বিচারে আহরণ করা হচ্ছে, যা সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। পাশাপাশি টেকসই নয়—এমন মৎস্য আহরণ পদ্ধতি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও চরম আবহাওয়ার ঝুঁকি দ্বীপটির অস্তিত্বকেই প্রশ্নের মুখে ফেলছে।

এই প্রেক্ষাপটেই স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়, পরিবেশ অধিদপ্তর ১৯৯৯ সালে সেন্টমার্টিন দ্বীপ ও এর আশপাশের সামুদ্রিক এলাকাকে পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা বা ইকোলজিক্যালি ক্রিটিক্যাল এরিয়া হিসেবে ঘোষণা করে। সেই ঘোষণার উদ্দেশ্য ছিল, দ্বীপটির প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা করা। তবে বাস্তবতায় দেখা যাচ্ছে, আইন ও নীতিমালা থাকা সত্ত্বেও কার্যকর প্রয়োগের অভাবে পরিস্থিতি দিন দিন অবনতি হয়েছে।

কর্মশালায় উপস্থিত গবেষক ও পরিবেশবিদরা মত দেন, এখনই যদি কঠোর ও সমন্বিত পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তাহলে ভবিষ্যতে সেন্টমার্টিনকে আর আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে না। তারা বলেন, এই দ্বীপ শুধু বাংলাদেশের নয়, পুরো অঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবেশগত সম্পদ। তাই একে রক্ষার দায়িত্বও সামষ্টিক।

সব মিলিয়ে, পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের বক্তব্য ও এই কর্মশালার আলোচনা স্পষ্ট করে দিয়েছে—সেন্টমার্টিনকে বাঁচাতে হলে উন্নয়ন ও সংরক্ষণের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতেই হবে। টেকসই মাস্টারপ্ল্যান চূড়ান্ত ও কার্যকর বাস্তবায়নই হতে পারে সেই পথের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। এখন দেখার বিষয়, এই পরিকল্পনা কতটা দ্রুত ও কতটা আন্তরিকতার সঙ্গে বাস্তবে রূপ নেয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত