বিজেপিশাসিত রাজ্যে পরিযায়ী মুসলিম কর্মীদের ওপর হামলা বাড়ছে

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ৭ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৪৫ বার
বিজেপিশাসিত রাজ্যে পরিযায়ী মুসলিম কর্মীদের ওপর হামলা বাড়ছে

প্রকাশ: ০৭ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে কাজের সন্ধানে পাড়ি জমানো পরিযায়ী শ্রমিকদের জীবন দিন দিন অনিরাপদ হয়ে উঠছে। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদসহ একাধিক জেলা থেকে যাওয়া মুসলিম কর্মীরা বিজেপিশাসিত রাজ্যগুলোতে ক্রমবর্ধমান সহিংসতা, নিপীড়ন ও ভয়ভীতির মুখে পড়ছেন। কাজের আশায় রাজ্যের সীমানা পেরিয়ে যাওয়া এসব মানুষ এখন নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতেই লড়াই করছেন। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ওড়িশা ও ছত্তিশগড়সহ একাধিক রাজ্যে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো সেই উদ্বেগজনক বাস্তবতারই প্রতিফলন।

ভারতের অভ্যন্তরীণ শ্রমবাজারে পশ্চিমবঙ্গের পরিযায়ী কর্মীদের ভূমিকা দীর্ঘদিনের। নির্মাণ, কৃষি, হোটেল-রেস্তোরাঁ, ক্ষুদ্র ব্যবসা কিংবা ফেরিওয়ালার কাজে যুক্ত থেকে তারা দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখছেন। মুর্শিদাবাদ জেলার মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষেরা তুলনামূলকভাবে বেশি সংখ্যায় পরিযায়ী শ্রমিক হিসেবে অন্য রাজ্যে যান, কারণ নিজ জেলায় কাজের সুযোগ সীমিত এবং মজুরি কম। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে এই শ্রমিকরাই হয়ে উঠেছেন টার্গেট, যেখানে ধর্মীয় পরিচয় ও ‘বাংলাদেশি’ তকমা ব্যবহার করে তাদের ওপর চালানো হচ্ছে নির্যাতন।

২০২৫ সালজুড়ে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে মুসলিম নির্যাতনের ঘটনা ছিল চোখে পড়ার মতো। নতুন বছর শুরুর কয়েক দিনের মধ্যেই সেই ধারাবাহিকতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। চলতি বছরের ৪ জানুয়ারি ওড়িশার সম্বলপুর জেলায় ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম টেলিগ্রাফ ইন্ডিয়ার এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, সেখানে পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলা থেকে যাওয়া এক মুসলিম কর্মীকে মারধর করে গুরুতর আহত করা হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, হামলাকারীরা বিজেপি সমর্থক গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত।

ওই ঘটনার শিকার ২৭ বছর বয়সি এজাজ আলী। তিনি মুর্শিদাবাদের ধুলিয়ান এলাকার বাসিন্দা এবং পেশায় একজন রাজমিস্ত্রি। দুই মাস আগে ভালো আয়ের আশায় তিনি আরও ১৪ জন সহকর্মীর সঙ্গে ঠিকাদারের মাধ্যমে সম্বলপুর জেলার পিঠেবালি এলাকায় একটি নির্মাণ প্রকল্পে কাজ করতে যান। স্থানীয়ভাবে কাজ করলে যেখানে দৈনিক ৪০০ রুপি আয় হতো, সেখানে বাইরে গিয়ে প্রতিদিন প্রায় এক হাজার রুপি পাওয়ার আশা ছিল। কিন্তু সেই আশাই শেষ পর্যন্ত তার জীবনে ভয়াবহ অভিজ্ঞতা ডেকে আনে।

এজাজ আলীর ভাষ্য অনুযায়ী, তারা কাজ শেষে নিজেরাই রান্না করে খেতেন এবং শান্তিপূর্ণভাবেই বসবাস করছিলেন। গত সপ্তাহে হঠাৎ গেরুয়া পোশাক পরা ও কপালে তিলক লাগানো সাতজনের একটি দল তাদের থাকার জায়গায় ঢুকে আধার ও ভোটার পরিচয়পত্র দেখতে চায়। কাগজপত্রে মুসলিম নাম দেখেই তারা শ্রমিকদের ‘বাংলাদেশি’ বলে অভিযুক্ত করে। শুধু তাই নয়, পরিচয়পত্র ছিঁড়ে ফেলে তাদের ওপর লাঠি ও লোহার রড দিয়ে হামলা চালানো হয়। এতে এজাজ আলীর বাম হাত ভেঙে যায় এবং তার সহকর্মী কাবের শেখ ও রাশেদ শেখ গুরুতর আহত হন।

হামলার পর ওড়িশায় কোনো চিকিৎসা সহায়তা না পেয়ে এজাজ আলী পরদিন ট্রেনে করে নিজ বাড়ি ধুলিয়ানে ফিরে আসেন। স্থানীয় হাসপাতালে তার ভাঙা হাতে প্লাস্টার করা হয়। বর্তমানে তিনি কর্মক্ষম নন এবং ঘরে বসেই দিন কাটাচ্ছেন। স্ত্রী ও সন্তানসহ সংসার চালাতে গিয়ে চরম অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছেন তিনি। এজাজ বলেন, “কাজের জন্য বাইরে গিয়ে যদি প্রাণের ভয় নিয়ে ফিরতে হয়, তাহলে সেই কাজের মূল্য কী?” তার কণ্ঠে ক্ষোভের পাশাপাশি অসহায়ত্ব স্পষ্ট।

ওড়িশার ঘটনাটি বিচ্ছিন্ন নয়। ছত্তিশগড়েও একই ধরনের মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে। মুর্শিদাবাদের সাগরদিঘি এলাকার বাসিন্দা ২৮ বছর বয়সি ইয়াদুল শেখ, ৩০ বছর বয়সি নিয়ামত শেখ এবং ৬৫ বছর বয়সি হানিফ শেখ মোটরসাইকেলে করে বিভিন্ন এলাকায় কম্বল ও অন্যান্য জিনিসপত্র বিক্রি করতেন। ওড়িশা ও আশপাশের অঞ্চলে অর্ডার নেওয়ার উদ্দেশ্যে তারা ছত্তিশগড়ের নারায়ণপুর শহরের দিকে যাচ্ছিলেন। পথে তাদের আটকে একটি গেরুয়া বাহিনী আধার ও ভোটার কার্ড দেখতে চায়। মুসলিম নাম দেখেই শুরু হয় নির্যাতন।

তিনজনকে লাঠি ও রড দিয়ে বেধড়ক মারধর করা হয়। ইয়াদুল ও নিয়ামতকে একটি বৈদ্যুতিক খুঁটির সঙ্গে বেঁধে তাদের শরীরে পেট্রোল ঢেলে আগুন দেওয়ার চেষ্টাও করা হয় বলে অভিযোগ। শেষ পর্যন্ত কোনো কারণে সেই চেষ্টা ব্যর্থ হলে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়। গুরুতর আহত হলেও ভয় ও আতঙ্কের কারণে তারা পুলিশের কাছে কোনো অভিযোগ দায়ের করতে পারেননি। এই নীরবতাই যেন আরও বড় সংকেত দিচ্ছে—নির্যাতনের শিকাররা কতটা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, বিজেপিশাসিত রাজ্যগুলোতে ‘বাংলাদেশি’ তকমা একটি ভয়ংকর অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। মুসলিম পরিচয় দেখলেই অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় বা উগ্র গোষ্ঠীগুলো আইন নিজের হাতে তুলে নিচ্ছে। এতে পরিযায়ী শ্রমিকরা দ্বিগুণ ঝুঁকিতে পড়ছেন—একদিকে তারা ভিনরাজ্যের মানুষ, অন্যদিকে ধর্মীয় সংখ্যালঘু। কাজ হারিয়ে অনেকেই বাধ্য হচ্ছেন নিজ রাজ্যে ফিরে আসতে, ফলে পরিবারগুলো অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে।

মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, এসব ঘটনা ভারতের সাংবিধানিক কাঠামো ও নাগরিক অধিকারের জন্য মারাত্মক হুমকি। একজন ভারতীয় নাগরিক দেশের যেকোনো প্রান্তে কাজ করার অধিকার রাখেন, সেখানে ধর্মের ভিত্তিতে তাকে হেনস্তা করা আইনত অপরাধ। কিন্তু বাস্তবতা হলো, মাঠপর্যায়ে সেই আইন প্রয়োগের ঘাটতি রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে পুলিশ নিষ্ক্রিয় থাকে বা অভিযোগ নিতেও অনাগ্রহ দেখায়, যা হামলাকারীদের আরও উৎসাহিত করে।

পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন এলাকায় ফিরে আসা পরিযায়ী শ্রমিকদের পরিবারগুলো এখন আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে। যারা এখনও বাইরে রয়েছেন, তাদের নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। স্থানীয় সমাজকর্মীরা বলছেন, এভাবে চলতে থাকলে পরিযায়ী শ্রমের ওপর নির্ভরশীল বহু পরিবার চরম দারিদ্র্যের মুখে পড়বে। একইসঙ্গে ভারতের অভ্যন্তরীণ শ্রম চলাচল ও সামাজিক সম্প্রীতিও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

সব মিলিয়ে, বিজেপিশাসিত রাজ্যগুলোতে ভিন্ন রাজ্যের মুসলিম কর্মীদের ওপর বাড়তে থাকা হামলা শুধু কয়েকটি ব্যক্তির দুর্ভোগ নয়, এটি একটি বৃহত্তর সামাজিক সংকটের ইঙ্গিত। কাজের সন্ধানে বের হওয়া মানুষদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। সেই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা যেমন মানবিক বিপর্যয় ডেকে আনছে, তেমনি ভারতের বহুত্ববাদী চরিত্রকেও প্রশ্নের মুখে দাঁড় করাচ্ছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত