প্রকাশ: ০৭ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভূমিকম্পপ্রবণ দেশ ফিলিপাইনে আবারও শক্তিশালী ভূমিকম্পের আঘাত অনুভূত হয়েছে। বুধবার দক্ষিণ ফিলিপাইনের বিস্তীর্ণ এলাকায় ৬ দশমিক ৭ মাত্রার একটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে। ভূমিকম্পের কম্পনে কেঁপে ওঠে উপকূলীয় শহর ও আশপাশের জনপদ। মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএস জানায়, ভূমিকম্পটি মাঝারি থেকে শক্তিশালী হলেও তাৎক্ষণিকভাবে কোনো সুনামি সতর্কতা জারি করা হয়নি।
ইউএসজিএসের তথ্য অনুযায়ী, ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল দক্ষিণ ফিলিপাইনের মিন্দানাও দ্বীপের সান্তিয়াগো শহর থেকে প্রায় ২৭ কিলোমিটার পূর্বে, উপকূলীয় অঞ্চলের কাছাকাছি এলাকায়। ভূপৃষ্ঠের প্রায় ৫৮ দশমিক ৫ কিলোমিটার গভীরে এই ভূমিকম্প সংঘটিত হয়। গভীরতা তুলনামূলক বেশি হওয়ায় ভূমিকম্পের প্রভাব কিছুটা কম হলেও কম্পন ছিল বেশ স্পষ্ট, যা বহু মানুষকে আতঙ্কিত করে তোলে।
ভূমিকম্পের সময় স্থানীয় সময় সকাল থেকে সন্ধ্যার দিকে জনবহুল এলাকায় মানুষ হঠাৎ করে ঘরবাড়ি ছেড়ে খোলা জায়গায় বেরিয়ে আসেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ও পোস্টে দেখা যায়, অনেক ভবনে ঝুলন্ত বাতি ও আসবাবপত্র দুলে ওঠে। কিছু এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ সাময়িকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, যদিও তা দ্রুত পুনরুদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
ফিলিপাইনের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত ভূমিকম্পে কোনো প্রাণহানি বা বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি। তবে সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কায় স্থানীয় প্রশাসন, পুলিশ ও উদ্ধারকারী দলগুলোকে সতর্ক অবস্থানে রাখা হয়েছে। জরুরি সেবা সংস্থাগুলো বিভিন্ন এলাকায় যোগাযোগ করে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং জনগণকে আতঙ্কিত না হয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে।
ভূমিকম্পের পরপরই মিন্দানাও দ্বীপের বিভিন্ন শহর ও গ্রামীণ এলাকায় সরকারি কর্মকর্তারা মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ শুরু করেন। স্কুল, হাসপাতাল এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোতে কোনো ধরনের কাঠামোগত ক্ষতি হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, যদি কোথাও ভবন ফাটল বা ভূমিধসের ঝুঁকি দেখা দেয়, তবে সেসব এলাকা দ্রুত খালি করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ফিলিপাইন পৃথিবীর অন্যতম ভূমিকম্পপ্রবণ দেশ। দেশটি প্রশান্ত মহাসাগরীয় ‘রিং অব ফায়ার’-এর ওপর অবস্থিত, যেখানে ঘন ঘন ভূমিকম্প ও আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত ঘটে। এই অঞ্চলে প্রশান্ত মহাসাগরীয় টেকটোনিক প্লেটের সঙ্গে অন্যান্য প্লেটের সংঘর্ষ ও সঞ্চালনের কারণে ভূমিকম্প প্রায় নিয়মিত ঘটনা। বিশেষজ্ঞদের মতে, ফিলিপাইনে মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প প্রায়ই অনুভূত হলেও বড় ধরনের ভূমিকম্প দেশটির জন্য নতুন কিছু নয়।
ভূতত্ত্ববিদরা বলছেন, ৬ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্প সাধারণত শক্তিশালী হিসেবে বিবেচিত হয় এবং এটি দুর্বল বা পুরোনো স্থাপনায় ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তবে এই ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল তুলনামূলক গভীরে হওয়ায় এবং উপকূল থেকে কিছুটা দূরে থাকায় বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি এড়ানো সম্ভব হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবুও পরবর্তী আফটারশকের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
এদিকে ভূমিকম্পের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর ফিলিপাইনের নাগরিকদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়। অনেকেই স্মরণ করছেন অতীতের ভয়াবহ ভূমিকম্পগুলোর কথা, যেগুলো দেশটিতে বড় ধরনের প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি ডেকে এনেছিল। বিশেষ করে ২০১৩ সালের বোহোল ভূমিকম্প এবং ২০২২ সালের উত্তর লুজোনে সংঘটিত শক্তিশালী ভূমিকম্প এখনও মানুষের স্মৃতিতে তাজা। সেসব অভিজ্ঞতা থেকেই অনেকে দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার চেষ্টা করেন।
সরকারি সূত্র জানায়, ভূমিকম্পের পর সুনামি সতর্কতা জারি না করা হলেও উপকূলীয় এলাকায় নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। ফিলিপাইনের ভূকম্পন পর্যবেক্ষণ সংস্থা জানিয়েছে, সমুদ্রপৃষ্ঠে অস্বাভাবিক কোনো পরিবর্তন দেখা যায়নি এবং বড় ধরনের ঢেউয়ের আশঙ্কা নেই। তবে মৎস্যজীবী ও উপকূলবর্তী বাসিন্দাদের সাময়িকভাবে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়লেও ভূমিকম্প সরাসরি জলবায়ু পরিবর্তনের ফল নয়। তবে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় দুর্যোগ মোকাবিলার প্রস্তুতি ও ভবন নির্মাণে নিরাপত্তা মান বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। ফিলিপাইনের মতো দেশে, যেখানে ঘন ঘন ভূমিকম্প ঘটে, সেখানে দুর্যোগ সহনশীল অবকাঠামো গড়ে তোলার বিকল্প নেই বলে মনে করছেন তারা।
ফিলিপাইনের সরকার ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো দীর্ঘদিন ধরেই ভূমিকম্প ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় জনগণের সচেতনতা বাড়াতে কাজ করছে। স্কুল পর্যায়ে নিয়মিত ভূমিকম্প মহড়া, ভবন নির্মাণে কঠোর নীতিমালা এবং জরুরি সাড়া দেওয়ার সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবুও বাস্তবতা হলো, প্রতিটি ভূমিকম্পই নতুন করে আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তা তৈরি করে।
সর্বশেষ এই ভূমিকম্প বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি ছাড়াই কেটে যাওয়ায় স্বস্তি প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তবে অনেকেই মনে করছেন, এটি একটি সতর্কবার্তা—ভবিষ্যতে আরও শক্তিশালী ভূমিকম্পের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তাই এখনই প্রয়োজন আরও কার্যকর প্রস্তুতি, ঝুঁকিপূর্ণ ভবন চিহ্নিত করা এবং জনগণকে দুর্যোগ মোকাবিলায় আরও প্রশিক্ষিত করে তোলা।
সবশেষে বলা যায়, দক্ষিণ ফিলিপাইনে আঘাত হানা এই ৬ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্প আবারও মনে করিয়ে দিল, প্রকৃতির শক্তির কাছে মানুষ কতটা অসহায়। যদিও এবার বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়নি, তবে সতর্কতা ও প্রস্তুতির গুরুত্ব নতুন করে সামনে এসেছে। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ অব্যাহত রেখেছে স্থানীয় প্রশাসন, আর জনগণও আশায় আছে—এই ভূমিকম্প যেন কেবল একটি সতর্ক সংকেত হিসেবেই থেকে যায়, ভয়াবহ বিপর্যয়ের পূর্বাভাস না হয়।