মাদুরোকে ‘অপহৃত’ না বলতে বিবিসির অভ্যন্তরীণ নির্দেশনা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ৭ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৫৩ বার
মাদুরো অপহরণ বিবিসি বিতর্ক

প্রকাশ: ০৭ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ বাহিনীর হাতে আটক করার ঘটনাকে ‘অপহরণ’ হিসেবে উল্লেখ না করতে নিজস্ব সাংবাদিকদের নির্দেশনা দিয়েছে ব্রিটিশ ব্রডকাস্টিং কর্পোরেশন (বিবিসি)। সম্প্রতি ফাঁস হওয়া একটি অভ্যন্তরীণ নথিকে ঘিরে এই তথ্য সামনে আসার পর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সংবাদমাধ্যমের নিরপেক্ষতা, শব্দচয়ন এবং রাজনৈতিক চাপ নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে।

রুশ টেলিভিশন চ্যানেল আরটি এক প্রতিবেদনে দাবি করেছে, বিবিসির অভ্যন্তরীণ একটি সম্পাদকীয় মেমোতে তাদের সাংবাদিকদের স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে—ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে তুলে নেওয়ার ঘটনাকে বর্ণনা করার সময় যেন ‘কিডন্যাপড’ বা ‘অপহৃত’ শব্দটি ব্যবহার না করা হয়। এর পরিবর্তে ‘ক্যাপচারড’ বা ‘সিজড’ শব্দ ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যেগুলোর অর্থ মূলত ‘আটক’ বা ‘ধরা’ হিসেবে বিবেচিত।

ঘটনাটি এমন এক সময়ে সামনে এলো, যখন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে মাদুরোকে যুক্তরাষ্ট্রের অভিযানে আটক করার ঘটনাকে ব্যাপকভাবে ‘অপহরণ’ হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে। এমনকি নিকোলাস মাদুরো নিজেও নিউইয়র্কের আদালতে হাজির হয়ে দাবি করেছেন, তাকে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে অপহরণ করা হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে বিবিসির ভাষাগত নির্দেশনা অনেকের কাছেই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠেছে।

ঘটনার সূত্রপাত গত শনিবার, ৩ জানুয়ারি। ওই দিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিশেষ বাহিনী ভেনেজুয়েলায় সামরিক অভিযান চালায় বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়। অভিযানের সময় ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো এবং তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে আটক করা হয়। পরে তাদের প্রথমে হেলিকপ্টারে এবং এরপর একটি জাহাজে করে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে নেওয়া হয়। সেখানে মাদুরোকে আদালতে হাজির করা হয়। এই পুরো ঘটনাপ্রবাহ বিশ্বজুড়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয়।

বিশ্লেষকদের মতে, একটি সার্বভৌম দেশের বর্তমান প্রেসিডেন্টকে অন্য একটি দেশের সামরিক বাহিনী দ্বারা আটক করে বিদেশে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে অত্যন্ত স্পর্শকাতর। সে কারণেই অনেক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এই ঘটনাকে সরাসরি ‘অপহরণ’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। তবে বিবিসির অভ্যন্তরীণ নির্দেশনায় সেই শব্দ ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করায় প্রশ্ন উঠেছে—এটি কি নিছক সম্পাদকীয় সতর্কতা, নাকি রাজনৈতিক চাপের প্রতিফলন।

এই নির্দেশিকা ফাঁস হওয়ার পর বিষয়টি প্রথম প্রকাশ্যে আনেন ব্রিটিশ কলামিস্ট, ভাষ্যকার ও সাংবাদিক ওয়েন জোন্স। গত সোমবার, ৫ জানুয়ারি, তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পোস্টে দাবি করেন, বিবিসি ব্যবস্থাপনার পক্ষ থেকে তাকে একটি মেমো পাঠানো হয়েছে। ওই মেমোতে মাদুরো সংক্রান্ত সংবাদ পরিবেশনে নির্দিষ্ট শব্দ ব্যবহার না করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। ওয়েন জোন্সের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দশ লক্ষেরও বেশি অনুসারী রয়েছে। ফলে তার এই দাবি দ্রুতই ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেক ব্যবহারকারী ও বিশ্লেষক মন্তব্য করেছেন, ‘অপহরণ’ শব্দটি ব্যবহার না করে ‘আটক’ বা ‘ধরা’ শব্দ ব্যবহার করলে ঘটনার রাজনৈতিক ও আইনি গুরুত্ব অনেকটাই হালকা হয়ে যায়। তাদের মতে, শব্দচয়ন শুধু ভাষার বিষয় নয়, বরং তা পাঠক ও দর্শকের উপলব্ধিকে প্রভাবিত করে। একটি ঘটনার বর্ণনায় ব্যবহৃত শব্দই অনেক সময় ঠিক করে দেয় মানুষ সেটিকে কীভাবে দেখবে।

এই বিতর্কের মধ্যেই ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এর আগে সাংবাদিকরা তাকে প্রশ্ন করেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের হাতে নিকোলাস মাদুরোকে আটক করার ঘটনাটি আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন কি না। তবে সেই প্রশ্নের সরাসরি কোনো জবাব দেননি তিনি। প্রধানমন্ত্রীর নীরবতার পরপরই বিবিসির অভ্যন্তরীণ মেমো ফাঁস হওয়ায় অনেকেই দুই ঘটনাকে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত করে দেখছেন।

বিবিসির পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে এখনো এই মেমো বা নির্দেশিকার বিষয়ে কোনো প্রকাশ্য ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। তবে প্রতিষ্ঠানটির সম্পাদকীয় নীতিমালার সঙ্গে পরিচিত ব্যক্তিদের কেউ কেউ বলছেন, বিবিসি সাধারণত এমন ক্ষেত্রে শব্দ ব্যবহারে সতর্ক থাকে, যেখানে কোনো ঘটনার আইনি ব্যাখ্যা এখনো চূড়ান্তভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তাদের যুক্তি হলো, ‘অপহরণ’ শব্দটি একটি শক্তিশালী আইনি ও নৈতিক অভিযোগ বহন করে, যা আদালতের রায় বা আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ছাড়া ব্যবহার করলে নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে।

অন্যদিকে সমালোচকদের দাবি, নিরপেক্ষতার দোহাই দিয়ে বাস্তবতাকে নরম ভাষায় উপস্থাপন করাও একধরনের পক্ষপাত। তারা বলছেন, একজন রাষ্ট্রপ্রধানকে অন্য দেশের বাহিনী জোরপূর্বক তুলে নিয়ে গেলে সাধারণ ভাষায় সেটিকে অপহরণ বলাই স্বাভাবিক। বিশেষ করে যখন ভুক্তভোগী নিজেই আদালতে সেই দাবি করছেন এবং বহু আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম একই শব্দ ব্যবহার করছে।

ভেনেজুয়েলা সরকারের সমর্থকরা এই ঘটনাকে দেশটির সার্বভৌমত্বের ওপর সরাসরি আঘাত হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, এটি শুধু একজন ব্যক্তিকে আটক করার ঘটনা নয়, বরং একটি দেশের নির্বাচিত নেতৃত্বকে লক্ষ্য করে পরিচালিত একটি রাজনৈতিক অভিযান। তারা অভিযোগ করছেন, পশ্চিমা গণমাধ্যমের একটি অংশ ভাষার মাধ্যমে এই ঘটনার গুরুত্ব কমিয়ে দেখানোর চেষ্টা করছে।

এই পরিস্থিতিতে সংবাদমাধ্যমের দায়িত্ব ও স্বাধীনতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। সাংবাদিকতা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বড় আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোর শব্দচয়ন প্রায়ই বৈশ্বিক জনমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই এমন সংবেদনশীল ঘটনায় কোন শব্দ ব্যবহার করা হবে, সেটি শুধু সম্পাদকীয় সিদ্ধান্ত নয়, বরং নৈতিক দায়বদ্ধতার প্রশ্নও বটে।

সব মিলিয়ে নিকোলাস মাদুরোকে আটক করার ঘটনা এবং সেটিকে কীভাবে বর্ণনা করা হবে—এই বিতর্ক এখন আর কেবল একটি শব্দের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। এটি আন্তর্জাতিক রাজনীতি, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও ক্ষমতার সঙ্গে গণমাধ্যমের সম্পর্ক নিয়ে বিস্তৃত প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। বিবিসির অভ্যন্তরীণ নির্দেশনা ফাঁস হওয়ার পর সেই প্রশ্নগুলো আরও জোরালোভাবে সামনে এসেছে, যা আগামী দিনগুলোতে রাজনৈতিক ও গণমাধ্যম অঙ্গনে আলোচনার কেন্দ্রে থাকবে বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত