প্রকাশ: ০৭ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ইসরাইলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের হয়ে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে ইরানে একজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার খবর দেশটিতে চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতা ও গণবিক্ষোভকে আরও গভীর করেছে। ইরানের বিচার বিভাগ-ঘনিষ্ঠ সংবাদমাধ্যম মিজান বুধবার জানিয়েছে, সর্বোচ্চ আদালতের অনুমোদন ও আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই আলি আরদেসতানির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। রাষ্ট্রের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি দেশের সংবেদনশীল ও নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট তথ্য বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার কাছে সরবরাহ করেছিলেন।
মিজানের প্রতিবেদনে বলা হয়, আলি আরদেসতানি দীর্ঘদিন ধরে মোসাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছিলেন এবং রাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক হুমকি সৃষ্টি করেছিলেন। তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় এবং সব ধরনের আপিল নিষ্পত্তির পরই রায় কার্যকর করা হয়েছে বলে জানানো হয়। তবে মানবাধিকার সংস্থাগুলো বরাবরের মতোই এ ধরনের মামলায় স্বচ্ছ বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
গত চার দশকেরও বেশি সময় ধরে ইসরাইল ও ইরানের মধ্যে তীব্র বৈরিতা চলে আসছে। মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব বিস্তার, পারমাণবিক কর্মসূচি এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা ইস্যুকে কেন্দ্র করে দুই দেশের সম্পর্ক শত্রুতার পর্যায়ে রয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইরান দাবি করছে, ইসরাইলি গোয়েন্দা সংস্থাগুলো দেশটির ভেতরে নাশকতা, গুপ্তচরবৃত্তি এবং বিজ্ঞানী হত্যার সঙ্গে জড়িত। এসব অভিযোগের প্রেক্ষাপটে গুপ্তচরবৃত্তির মামলায় মৃত্যুদণ্ডের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, চলতি বছরের জুন মাসে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের কথিত হামলার পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। ওই ঘটনার পর দুই দেশের মধ্যে সরাসরি সংঘর্ষের আশঙ্কা বাড়ে এবং অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা জোরদার করতে ইরান আরও কঠোর অবস্থান নেয়। এরই ধারাবাহিকতায় সাম্প্রতিক মাসগুলোতে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে একাধিক ফাঁসি কার্যকর হয়েছে।
এই কঠোর পদক্ষেপের পাশাপাশি ইরান বর্তমানে এক গভীর অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। অর্থনৈতিক দুরবস্থা, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এবং লাগামহীন মূল্যস্ফীতির প্রতিবাদে দেশজুড়ে ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হয়েছে। তেহরান থেকে শুরু হয়ে এই আন্দোলন দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে অন্তত ২৭টি প্রদেশ ও ৯২টি শহরে। টানা দশ দিন ধরে চলা এই বিক্ষোভে এখন পর্যন্ত অন্তত ৩৬ জন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে, যাদের মধ্যে দুজন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য। গ্রেফতার করা হয়েছে দুই হাজারেরও বেশি আন্দোলনকারীকে।
বিক্ষোভের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে রাজধানী তেহরানের ঐতিহাসিক গ্র্যান্ড বাজার। দেশের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত এই বাজারে দোকানদার ও ব্যবসায়ীরা টানা দশম দিনের মতো দোকান বন্ধ রেখে আন্দোলনে অংশ নিয়েছেন। বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে নিরাপত্তা বাহিনী কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করছে, যা পরিস্থিতিকে আরও উত্তেজনাপূর্ণ করে তুলেছে।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, বিক্ষোভ দমনে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করা হচ্ছে এবং গ্রেফতার হওয়া অনেকের অবস্থান সম্পর্কে পরিবারের সদস্যরা এখনো নিশ্চিত তথ্য পাচ্ছেন না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায় দেখা যাচ্ছে, নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষ ক্রমেই সহিংস রূপ নিচ্ছে।
এই প্রেক্ষাপটে ইরান নতুন একটি প্রতিরক্ষা কাউন্সিল গঠন করেছে। মঙ্গলবার দেওয়া এক বিবৃতিতে কাউন্সিল জানিয়েছে, দেশের নিরাপত্তা, স্বাধীনতা ও ভূখণ্ডের অখণ্ডতা তাদের জন্য ‘লালরেখা’। এসব বিষয়ে কোনো স্পষ্ট হুমকি দেখা দিলে কেবল প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানে সীমাবদ্ধ না থেকে আগাম পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে বলেও হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, যেকোনো বিদেশি হস্তক্ষেপ বা অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা নষ্টের প্রচেষ্টার জবাব হবে লক্ষ্যভিত্তিক ও কঠোর।
ইরানের সরকারি কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, চলমান বিক্ষোভে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল পরোক্ষভাবে ইন্ধন জোগাচ্ছে। তাদের অভিযোগ, বিদেশি শক্তিগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও গোপন নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সহিংসতা উসকে দিচ্ছে। অন্যদিকে, গত রোববার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ইরান যদি বিক্ষোভকারীদের ওপর হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে যায়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র শক্তিশালী প্রতিক্রিয়া দেখাবে। এই বক্তব্য মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
অর্থনৈতিক দিক থেকেও পরিস্থিতি ক্রমেই ভয়াবহ আকার নিচ্ছে। ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে ইরানের মুদ্রা রিয়ালের মান। মঙ্গলবার আনুষ্ঠানিক বাজারে এক মার্কিন ডলারের বিনিময় হার দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৫ লাখ রিয়াল, ইউরো প্রায় ১৭ লাখ রিয়াল এবং ব্রিটিশ পাউন্ড প্রায় দুই কোটি রিয়াল। মুদ্রার এই অবমূল্যায়নের ফলে আমদানি নির্ভর পণ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।
সরকারি ভর্তুকি নীতিতে পরিবর্তনের পর খাদ্যপণ্যের দাম হঠাৎ করেই বেড়ে গেছে। রান্নার তেল, চিজ ও মুরগির মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। সাধারণ মানুষ অভিযোগ করছে, মাসিক আয়ের বড় অংশ ব্যয় করেও ন্যূনতম প্রয়োজন মেটানো কঠিন হয়ে পড়েছে। এই আর্থিক চাপই বিক্ষোভকে আরও তীব্র করে তুলছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে ফাঁসি কার্যকর, একদিকে রাষ্ট্রের কঠোর নিরাপত্তা নীতি আর অন্যদিকে ক্রমবর্ধমান গণঅসন্তোষ—এই দুইয়ের মাঝে দাঁড়িয়ে ইরান এক জটিল সন্ধিক্ষণে পৌঁছেছে। পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেবে, তা নির্ভর করছে সরকারের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, আন্তর্জাতিক চাপ এবং দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সংস্কারের ওপর। তবে আপাতত স্পষ্ট, ইরানের রাজপথে ক্ষোভের আগুন সহজে নিভে যাওয়ার কোনো লক্ষণ নেই।