লালমনিরহাট সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে আহত যুবক হাসপাতালে

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ৭ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৭১ বার
বিএসএফের গুলিতে হাসপাতালে যুবক

প্রকাশ: ০৭ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলার গোতামারী সীমান্তে আবারও গুলির শব্দে আতঙ্ক ছড়িয়েছে। ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের গুলিতে আহত হয়েছেন এক বাংলাদেশি যুবক। আহত মো. রনি (২২) বর্তমানে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। চিকিৎসকদের মতে, তার অবস্থা আপাতত আশঙ্কামুক্ত হলেও পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। সীমান্ত এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে চলমান উত্তেজনা ও অনাকাঙ্ক্ষিত সংঘর্ষের প্রেক্ষাপটে এই ঘটনা নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে স্থানীয়দের মধ্যে।

বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সূত্র জানায়, মঙ্গলবার দিবাগত রাত আনুমানিক ১২টা ১০ মিনিটে লালমনিরহাট ব্যাটালিয়ন (১৫ বিজিবি)-এর অধীনস্থ দৈখাওয়া বিওপির একটি টহল দল নিয়মিত দায়িত্ব পালন করছিল। এ সময় হঠাৎ সীমান্ত এলাকা থেকে গুলির শব্দ ভেসে আসে। টহলদল দ্রুত পরিস্থিতি যাচাই করতে সীমান্ত পিলার নম্বর ৯০২-এর নিকটবর্তী এলাকায় এগিয়ে যায়। সেখানে কয়েকজন ব্যক্তিকে দৌড়াদৌড়ি করতে এবং একজন গুলিবিদ্ধ ব্যক্তিকে ঘটনাস্থল থেকে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করতে দেখা যায়। বিজিবি সদস্যরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনে আহত যুবককে নিজেদের তত্ত্বাবধানে নেন।

পরে আহত মো. রনিকে দ্রুত অ্যাম্বুলেন্সে করে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, গুলিটি তার শরীরের একটি অংশে আঘাত করেছে এবং তাৎক্ষণিক অস্ত্রোপচার ও চিকিৎসার মাধ্যমে তার অবস্থা স্থিতিশীল করা সম্ভব হয়েছে। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, গুরুতর কোনো অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি, তবে সংক্রমণ এড়াতে তাকে পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।

আহত মো. রনি লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলার গোতামারী ইউনিয়নের বাসিন্দা। তিনি মো. হারুন অর রশিদের ছেলে। পরিবারের সদস্যরা জানান, ঘটনার খবর পেয়ে তারা দ্রুত হাসপাতালে ছুটে যান। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, সীমান্ত এলাকায় গুলিবর্ষণের ঘটনা নতুন নয়, তবে একজন তরুণ এভাবে গুলিবিদ্ধ হওয়ায় তারা আতঙ্কিত ও দুশ্চিন্তাগ্রস্ত।

বিজিবি পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, মো. রনি সীমান্ত এলাকায় মাদক বহনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। বিজিবির ভাষ্য অনুযায়ী, এর আগেও গত ২২ ডিসেম্বর বিএসএফের ছোড়া ছররা গুলিতে আহত হয়ে তিনি আত্মগোপনে চলে যান। সে সময় পুলিশ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তার বাড়িতে গেলেও পরিবারের পক্ষ থেকে তার উপস্থিতির বিষয়টি অস্বীকার করা হয়। এরপর থেকেই তিনি পলাতক ছিলেন বলে দাবি বিজিবির। সর্বশেষ এই ঘটনায় তাকে আবারও গুলিবিদ্ধ অবস্থায় উদ্ধার করা হয়।

বিজিবি আরও জানায়, মো. রনির বিরুদ্ধে সীমান্তে অবৈধ অনুপ্রবেশ এবং পাসপোর্ট আইনে মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। আইনগত প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে তার শারীরিক অবস্থা উন্নত হলে প্রয়োজনীয় জিজ্ঞাসাবাদ ও তদন্ত সম্পন্ন করা হবে বলে জানানো হয়েছে। তবে মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে তার চিকিৎসা ও নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলেও উল্লেখ করেছে বিজিবি।

এ বিষয়ে লালমনিরহাট ব্যাটালিয়ন (১৫ বিজিবি)-এর কমান্ডিং অফিসার লেফটেন্যান্ট কর্নেল মেহেদী ইমাম, পিএসসি বলেন, সীমান্ত এলাকায় বারবার সতর্ক করার পরও অবৈধ অনুপ্রবেশ, চোরাচালান এবং মাদক সংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ড চলতে থাকায় বিজিবি উদ্বিগ্ন। তিনি বলেন, সীমান্তকে নিরাপদ রাখতে এবং দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা এড়াতে স্থানীয় জনগণ ও জনপ্রতিনিধিদের সহযোগিতা অত্যন্ত জরুরি। সীমান্ত আইন মেনে চলা এবং অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকাই এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার ঝুঁকি কমাতে পারে।

স্থানীয়রা বলছেন, গোতামারী সীমান্ত এলাকা দীর্ঘদিন ধরেই চোরাচালান ও মাদক পাচারের একটি ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল হিসেবে পরিচিত। সীমান্তের দুই পাশে কাঁটাতারের ফাঁকফোকর, রাতের অন্ধকার এবং সীমিত জীবিকার সুযোগ অনেক তরুণকে ঝুঁকিপূর্ণ পথে ঠেলে দেয়। তবে এসব কর্মকাণ্ডের ফল যে কতটা ভয়াবহ হতে পারে, মো. রনির ঘটনাই তার একটি বাস্তব উদাহরণ বলে মন্তব্য করেন স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা।

মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, সীমান্তে গুলিবর্ষণের ঘটনা প্রতিবারই নতুন করে প্রশ্ন তোলে সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সমন্বয় নিয়ে। তারা বলছে, সীমান্তে অপরাধ দমনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোরতা প্রয়োজন হলেও প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের বিষয়ে আরও সংযমী হওয়া উচিত। একই সঙ্গে সীমান্ত এলাকায় বসবাসকারী সাধারণ মানুষের জীবিকা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ জোরদার করার তাগিদ দিচ্ছেন তারা।

বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গুলিবর্ষণের ঘটনা কমাতে দুই দেশের মধ্যে একাধিক বৈঠক ও সমঝোতা হয়েছে। তবুও বাস্তবে মাঝেমধ্যেই এ ধরনের ঘটনা ঘটছে, যা দুই দেশের জনগণের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করছে। কূটনৈতিক পর্যায়ে এসব ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দায় নির্ধারণের দাবি উঠছে নিয়মিত।

সীমান্ত এলাকার বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, কেবল আইন প্রয়োগ নয়, বরং সীমান্তবর্তী জনগোষ্ঠীর জন্য বিকল্প কর্মসংস্থান, সামাজিক সচেতনতা এবং সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ালে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি কমানো সম্ভব। একই সঙ্গে দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ ও আস্থার পরিবেশ তৈরি করাও জরুরি।

সবশেষে বলা যায়, লালমনিরহাটের গোতামারী সীমান্তে মো. রনির গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনা আবারও সীমান্তের নাজুক বাস্তবতা সামনে এনেছে। একজন তরুণের জীবন ঝুঁকির মুখে পড়া যেমন মানবিক দিক থেকে বেদনাদায়ক, তেমনি এটি সীমান্ত নিরাপত্তা, অপরাধ দমন এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের জটিলতার প্রতিফলনও বটে। এখন দেখার বিষয়, এই ঘটনার পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কীভাবে কার্যকর পদক্ষেপ নেয় এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা রোধে কতটা সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত