বকেয়া বেতনের দাবিতে কালিয়াকৈরে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরোধ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ৭ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৫৭ বার
কালিয়াকৈর শ্রমিক বেতন বিক্ষোভ

প্রকাশ: ০৭ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বকেয়া বেতনের দাবিতে গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার সফিপুর এলাকায় ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন মাহমুদ ডেনিম লিমিটেডের শ্রমিকরা। বুধবার সকাল থেকে শতাধিক শ্রমিক আনসার ভিডিপি একাডেমি সংলগ্ন সড়কে অবস্থান নিয়ে তাদের ন্যায্য পাওনা পরিশোধের দাবিতে আন্দোলনে নামেন। এতে করে দেশের অন্যতম ব্যস্ত এই মহাসড়কে যান চলাচল সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে যায় এবং উভয় পাশে প্রায় এক কিলোমিটার দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত চরম ভোগান্তিতে পড়েন অফিসগামী মানুষ, দূরপাল্লার যাত্রী ও পণ্যবাহী যানচালকরা।

শ্রমিকদের অভিযোগ, মাহমুদ ডেনিম লিমিটেডে কর্মরত শ্রমিকদের দীর্ঘদিন ধরে নিয়মিত বেতন দেওয়া হচ্ছে না। কেউ কেউ তিন থেকে চার মাসের বেতন বকেয়া থাকার কথা জানিয়েছেন। বারবার কারখানা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করেও কোনো কার্যকর সমাধান পাওয়া যায়নি। আশ্বাসের পর আশ্বাস মিললেও বাস্তবে বেতন পরিশোধ না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে তারা রাজপথে নামেন বলে দাবি শ্রমিকদের।

বিক্ষোভরত শ্রমিকরা জানান, বেতন না পেয়ে পরিবার নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করতে হচ্ছে। ঘরভাড়া, সন্তানদের পড়াশোনার খরচ, চিকিৎসা ব্যয় এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম—সবকিছু মিলিয়ে তারা চরম আর্থিক সংকটে পড়েছেন। কারখানায় নিয়মিত কাজ করেও মাসের পর মাস বেতন না পাওয়াকে তারা শ্রমিক অধিকারের চরম লঙ্ঘন বলে মনে করছেন।

কারখানার এক নারী শ্রমিক রাবেয়া আক্তার বলেন, গত চার মাস ধরে আমরা কোনো বেতন পাইনি। প্রতিবার কর্তৃপক্ষ বলে, সামনের মাসে সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু বাস্তবে কিছুই হয় না। সন্তানদের স্কুলের বেতন দিতে পারছি না, সংসারে খাবার জোগাড় করাই কঠিন হয়ে পড়েছে। বাধ্য হয়েই আমরা রাস্তায় নেমেছি।

মেশিন অপারেটর লাল মিয়া বলেন, কারখানার বেতন বন্ধ, ঘরে খাবার নেই, বাড়ির মালিক ভাড়ার জন্য চাপ দিচ্ছে, দোকানদার বাকি টাকা চাইছে। এসব চাপ সহ্য করতে না পেরে আমরা আন্দোলনে নেমেছি। অথচ শান্তিপূর্ণভাবে দাবি জানাতে গিয়ে আমাদের ওপর পুলিশ টিয়ারশেল নিক্ষেপ করেছে। এতে শ্রমিকদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

শ্রমিকদের সড়ক অবরোধের ফলে সকাল থেকেই ঢাকা ও টাঙ্গাইলমুখী যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। বাস, ট্রাক, ব্যক্তিগত গাড়ি ও মোটরসাইকেল আটকে পড়ে দীর্ঘ সময়। অনেক যাত্রী নির্ধারিত গন্তব্যে পৌঁছাতে না পেরে বিকল্প সড়ক খুঁজতে বাধ্য হন। কেউ কেউ গাড়ি থেকে নেমে হেঁটে গন্তব্যের উদ্দেশে রওনা দেন।

খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে শিল্প পুলিশ, থানা পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনের সদস্যরা উপস্থিত হন। তারা শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করেন। তবে শ্রমিকরা স্পষ্ট জানিয়ে দেন, বকেয়া বেতন পরিশোধের সুনির্দিষ্ট আশ্বাস না পাওয়া পর্যন্ত তারা সড়ক ছাড়বেন না। তাদের ভাষায়, বহুবার কথার আশ্বাস শুনেছেন, এবার বাস্তব সমাধান চান।

এক পর্যায়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে পুলিশ শ্রমিকদের সড়ক থেকে সরিয়ে দিতে টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে। এতে কিছু সময়ের জন্য বিশৃঙ্খলা তৈরি হলেও পরে শ্রমিকরা ধীরে ধীরে মহাসড়ক ছেড়ে সরে যান। এরপর যান চলাচল স্বাভাবিক হতে শুরু করে।

এ বিষয়ে কারখানা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কোনো দায়িত্বশীল ব্যক্তিকে পাওয়া যায়নি। শ্রমিকদের অভিযোগের বিষয়ে কর্তৃপক্ষের বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি। তবে স্থানীয়ভাবে জানা গেছে, আর্থিক সংকটের অজুহাতে কারখানাটি দীর্ঘদিন ধরে শ্রমিকদের বেতন পরিশোধে গড়িমসি করে আসছে।

কালিয়াকৈর থানার অফিসার ইনচার্জ খন্দকার নাসির উদ্দিন ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, শ্রমিকরা বেতন না পেয়ে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরোধ করেছিল। প্রথমে আমরা তাদের বুঝিয়ে রাস্তা থেকে সরাতে চেষ্টা করি। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এক পর্যায়ে টিয়ারশেল নিক্ষেপ করতে হয়েছে। পরে শ্রমিকরা সড়ক ছেড়ে দিলে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়। বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং পুলিশ সতর্ক অবস্থানে আছে।

শ্রমিক আন্দোলন বিশ্লেষকরা বলছেন, শিল্প এলাকায় বেতন বকেয়ার মতো সমস্যা নতুন নয়। তবে সময়মতো শ্রমিকদের পাওনা পরিশোধ না হলে ক্ষোভ জমে উঠে এবং তা সড়ক অবরোধের মতো পরিস্থিতির জন্ম দেয়। এতে একদিকে সাধারণ মানুষ ভোগান্তিতে পড়ে, অন্যদিকে শিল্প খাতের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তারা মনে করেন, শ্রমিক-কর্তৃপক্ষ-প্রশাসনের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় ও সময়মতো সমাধানই এ ধরনের সংকট এড়ানোর একমাত্র পথ।

এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলেও শ্রমিকদের মধ্যে অনিশ্চয়তা কাটেনি। তারা জানিয়েছেন, যদি দ্রুত বকেয়া বেতন পরিশোধের ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তাহলে আবারও কঠোর কর্মসূচিতে যেতে বাধ্য হবেন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত