প্রকাশ: ০৭ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
নওগাঁর সাপাহার সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) শ্যামলী রানী বর্মণের বিরুদ্ধে এক বাসচালককে কার্যালয়ে ডেকে এনে শারীরিকভাবে নির্যাতনের অভিযোগ ঘিরে দেশজুড়ে আলোচনা ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া অভিযোগ এবং পরবর্তীতে গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে নওগাঁ জেলা পুলিশ তিন সদস্যের একটি অনুসন্ধান কমিটি গঠন করেছে। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম)-এর নেতৃত্বে গঠিত এই কমিটিকে দ্রুত সময়ের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ প্রশাসন।
বুধবার (৭ জানুয়ারি) দুপুরে নওগাঁর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম ‘পুলিশ মিডিয়া গ্রুপ’ নামে একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে পাঠানো লিখিত বিবৃতিতে তদন্ত কমিটি গঠনের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। বিবৃতিতে বলা হয়, গত রোববার (৪ জানুয়ারি) সাপাহার সার্কেলের একজন সহকারী পুলিশ সুপার ও এক বাসচালকের মধ্যে সংঘটিত একটি অপ্রীতিকর ও অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ৬ জানুয়ারি বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। বিষয়টি পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নজরে আসার পরপরই অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের স্বার্থে এই অনুসন্ধান কমিটি গঠন করা হয়েছে।
অভিযোগের সূত্র ধরে জানা যায়, ৪ জানুয়ারি সকাল সাড়ে ৯টার দিকে নওগাঁ জেলার সাপাহার থেকে রাজশাহীর উদ্দেশ্যে হিমাচল পরিবহনের একটি যাত্রীবাহী বাস ছেড়ে যায়। ওই বাসে যাত্রী হিসেবে ওঠেন সাপাহার সার্কেলের এএসপি শ্যামলী রানী বর্মণের স্বামী জয়ন্ত বর্মণ, যিনি পেশায় একজন কলেজ শিক্ষক। বাসচালক বাদল ও সুপারভাইজার সিয়ামের অভিযোগ অনুযায়ী, জয়ন্ত বর্মণ কোনো টিকিট না কেটেই বাসে ওঠেন এবং ধানসুরা এলাকায় নামার কথা জানান। বিষয়টি নিয়ে বাসের ভেতরেই প্রথমে বাকবিতণ্ডা শুরু হয়।
বাসটি দিঘার মোড়ে পৌঁছানোর পর যে সিটে জয়ন্ত বর্মণ বসেছিলেন, সেই সিটের নির্ধারিত যাত্রী বাসে ওঠেন। তখন নিয়ম অনুযায়ী সুপারভাইজার সিয়াম তাকে সিট ছেড়ে দেওয়ার অনুরোধ জানান। অভিযোগ রয়েছে, এ অনুরোধে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন জয়ন্ত বর্মণ এবং নিজেকে সার্কেল এএসপির স্বামী পরিচয় দিয়ে সুপারভাইজারকে ভয়ভীতি ও হুমকি দেন। একপর্যায়ে বিষয়টি চালকের সঙ্গেও বাকবিতণ্ডায় রূপ নেয়। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হলেও শেষ পর্যন্ত জয়ন্ত বর্মণ ধানসুরা এলাকায় নেমে যান।
ঘটনার এখানেই শেষ হয়নি বলে অভিযোগ। চালক বাদল ও সুপারভাইজারের দাবি অনুযায়ী, ওই দিন রাত আনুমানিক ১০টার দিকে বাসটি সাপাহারে ফিরে এলে চালক বাদলকে বাসস্ট্যান্ড থেকে সার্কেল অফিসে ডেকে নেওয়া হয়। সেখানে পৌঁছানোর পর তার মোবাইল ফোন জব্দ করা হয় এবং এএসপি শ্যামলী রানী বর্মণ ও তার স্বামী মিলে তাকে শারীরিকভাবে মারধর করেন। অভিযোগে বলা হয়, একপর্যায়ে তিনি গুরুতরভাবে আহত হন এবং পরে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নেন।
ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি দ্রুতই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, একজন সাধারণ পরিবহন শ্রমিককে অফিসে ডেকে এনে এভাবে শারীরিকভাবে নির্যাতন করা হলে তা আইনের শাসন ও মানবাধিকারের পরিপন্থী কি না। বিশেষ করে একজন দায়িত্বশীল পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ ওঠায় সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ ও উদ্বেগ দুইই লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
এ বিষয়ে সহকারী পুলিশ সুপার শ্যামলী রানী বর্মণের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি অভিযোগগুলো সরাসরি অস্বীকার করেন। তার ভাষ্যমতে, পুরো ঘটনাটি অতিরঞ্জিতভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে এবং বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে মিল নেই। তিনি বলেন, বাসে তার স্বামীর সঙ্গে চালক ও সুপারভাইজার দুর্ব্যবহার করেছিলেন। সেই কারণেই রাতে তাদের অফিসে ডাকা হয়। সেখানে তারা নিজেদের ভুল স্বীকার করেন এবং পরে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়। তার দাবি, কোনো ধরনের শারীরিক নির্যাতনের ঘটনা ঘটেনি এবং বিষয়টি মূলত ভুল বোঝাবুঝির ফল।
পুলিশ সুপার কার্যালয়ের বিবৃতিতে আরও বলা হয়, অনুসন্ধান কমিটি অভিযোগকারী, অভিযুক্ত এবং সংশ্লিষ্ট প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য গ্রহণ করবে। পাশাপাশি চিকিৎসা সংক্রান্ত নথি, ঘটনাস্থলের তথ্য এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক উপাত্ত পর্যালোচনা করে একটি নিরপেক্ষ প্রতিবেদন দাখিল করা হবে। তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর প্রয়োজন অনুযায়ী আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলেও আশ্বস্ত করেছে জেলা পুলিশ।
এই ঘটনার প্রেক্ষাপটে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং সাধারণ মানুষের অধিকার রক্ষার প্রশ্ন নতুন করে সামনে এসেছে। মানবাধিকারকর্মীদের মতে, অভিযোগ প্রমাণিত হলে দোষী ব্যক্তির পরিচয় বা পদমর্যাদা যাই হোক না কেন, তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে তারা আশা প্রকাশ করেছেন, তদন্ত প্রক্রিয়া যেন সম্পূর্ণ স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ হয়, যাতে প্রকৃত সত্য উদঘাটিত হয় এবং কোনো পক্ষই অবিচারের শিকার না হয়।
স্থানীয় পরিবহন শ্রমিকদের মধ্যেও ঘটনার প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। অনেকে জানিয়েছেন, এ ধরনের ঘটনায় তারা আতঙ্কিত বোধ করেন এবং ন্যায়বিচার পাওয়া নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়। তবে তদন্ত কমিটি গঠনের সিদ্ধান্তকে তারা ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন এবং আশা করছেন, তদন্তের মাধ্যমে সত্য বেরিয়ে আসবে।
সব মিলিয়ে, নওগাঁর সাপাহারের এই ঘটনা শুধু একটি ব্যক্তিগত বিরোধের অভিযোগ নয়, বরং প্রশাসনিক জবাবদিহিতা ও আইনের শাসনের প্রশ্নকেও সামনে নিয়ে এসেছে। এখন সবার দৃষ্টি অনুসন্ধান কমিটির প্রতিবেদন ও পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে।