আলেপ্পোতে সংঘর্ষে বাস্তুচ্যুত হাজার হাজার মানুষ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ৮ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৬৭ বার
আলেপ্পোতে সংঘর্ষে বাস্তুচ্যুত হাজার হাজার মানুষ

প্রকাশ: ০৮ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

সিরিয়ার দীর্ঘদিনের সংঘাত নতুন করে ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে উত্তরাঞ্চলীয় শহর আলেপ্পোতে। কুর্দি নেতৃত্বাধীন সিরিয়ান ডেমোক্রেটিক ফোর্সেস (এসডিএফ) এবং সিরিয়ার সরকারি সেনাবাহিনীর মধ্যে চলমান তীব্র সংঘর্ষে প্রাণ বাঁচাতে শহর ছেড়ে পালাচ্ছেন হাজার হাজার সাধারণ মানুষ। যুদ্ধের গোলাগুলির শব্দ, বিস্ফোরণের আতঙ্ক এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ—সব মিলিয়ে আলেপ্পোর বাসিন্দারা আবারও শরণার্থী জীবনের দিকে ঠেলে যাচ্ছেন। বুধবার রাতে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানায়, এই সংঘর্ষের কারণে শহরের ৪৫ হাজারের বেশি মানুষ ইতোমধ্যে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন, যা সিরিয়ার মানবিক সংকটকে আরও গভীর করে তুলেছে।

আলেপ্পো এক সময় ছিল সিরিয়ার অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রাণকেন্দ্র। কিন্তু গত এক দশকের বেশি সময় ধরে চলা গৃহযুদ্ধ শহরটিকে বারবার ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছে। সাম্প্রতিক এই সংঘর্ষ সেই পুরোনো ক্ষতকে আবারও উসকে দিয়েছে। মঙ্গলবার থেকে শুরু হওয়া সংঘর্ষে এখন পর্যন্ত অন্তত নয়জন নিহত হয়েছেন বলে এক সরকারি কর্মকর্তার বরাতে জানা গেছে। নিহতদের মধ্যে বেসামরিক নাগরিকের সংখ্যাও রয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রগুলো ইঙ্গিত দিয়েছে, যদিও বিস্তারিত তথ্য এখনো নিশ্চিত করা হয়নি।

কর্তৃপক্ষের ভাষ্যমতে, বাস্তুচ্যুত মানুষের বেশিরভাগই উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের আফরিন উপত্যকার দিকে যাচ্ছেন। কেউ কেউ গাড়িতে করে, আবার অনেকেই সিরিয়ার সেনাবাহিনীর তৈরি করা তথাকথিত মানবিক করিডোর দিয়ে পায়ে হেঁটে আলেপ্পো ছাড়ছেন। শীতের মধ্যে শিশু, নারী ও বৃদ্ধদের নিয়ে এই দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়া তাদের জন্য চরম কষ্টকর হয়ে উঠেছে। কোথায় গিয়ে আশ্রয় পাবেন, কখন বা আদৌ নিজের ঘরে ফিরতে পারবেন কি না—এসব প্রশ্নের কোনো উত্তর তাদের কাছে নেই।

আলেপ্পোর বাসিন্দা আহমেদের কণ্ঠে ধরা পড়েছে সেই অনিশ্চয়তার প্রতিচ্ছবি। তিনি বলেন, ‘আমরা সংঘর্ষ থেকে পালিয়ে এসেছি। জানি না কোথায় যাব, কীভাবে বাঁচব।’ তার মতো হাজারো মানুষ এখন পথে পথে আশ্রয়ের খোঁজে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। কেউ আত্মীয়ের বাড়িতে যাওয়ার চেষ্টা করছেন, কেউ বা খোলা আকাশের নিচে রাত কাটাতে বাধ্য হচ্ছেন।

৪১ বছর বয়সী বাস্তুচ্যুত বাসিন্দা আম্মার রাজির গল্প আরও হৃদয়বিদারক। ছয় সন্তান নিয়ে তিনি পরিবারসহ আলেপ্পো ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। তার ভাষায়, ‘আমার দুইটি সন্তান খুব ছোট। গোলাগুলির মধ্যে তাদের নিয়ে থাকা সম্ভব ছিল না। আমরা জানি না, আর কখনও নিজের বাড়িতে ফিরতে পারব কি না।’ এই অনিশ্চয়তা শুধু একটি পরিবারের নয়, বরং হাজারো সিরীয় পরিবারের প্রতিদিনের বাস্তবতা।

সংঘর্ষের তীব্রতার কারণে বুধবার আলেপ্পোর স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয় ও সরকারি অফিস বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। শিক্ষা কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ায় শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। একই সঙ্গে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত আলেপ্পো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সব ফ্লাইট স্থগিত রাখার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এতে শহরের সঙ্গে দেশের অন্যান্য অংশ ও বাইরের বিশ্বের যোগাযোগ আরও সীমিত হয়ে পড়েছে।

স্থানীয় প্রশাসন বলছে, নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক এতটাই প্রবল যে, অনেকেই মনে করছেন পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে যেতে পারে। অতীত অভিজ্ঞতা তাদের সেই আশঙ্কাকে আরও জোরালো করছে। আলেপ্পো এর আগেও বহুবার সংঘর্ষের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে এবং প্রতিবারই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সাধারণ মানুষ।

বিশ্লেষকদের মতে, এসডিএফ ও সিরিয়ান সেনাবাহিনীর মধ্যে এই সংঘর্ষ কেবল স্থানীয় শক্তির দ্বন্দ্ব নয়, বরং এর পেছনে রয়েছে বৃহত্তর আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রভাব। কুর্দি নিয়ন্ত্রিত অঞ্চল, কেন্দ্রীয় সরকারের কর্তৃত্ব এবং বিদেশি শক্তির ভূমিকা—সব মিলিয়ে সিরিয়ার সংঘাত এখনো বহুমাত্রিক ও জটিল। এর ফল ভোগ করতে হচ্ছে নিরস্ত্র নাগরিকদের, যারা কোনো পক্ষের লড়াইয়ে সরাসরি জড়িত নন।

মানবাধিকার সংগঠনগুলো ইতোমধ্যে পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তারা বেসামরিক নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানিয়েছে। বাস্তুচ্যুত মানুষের জন্য জরুরি খাদ্য, পানি, চিকিৎসা ও আশ্রয়ের প্রয়োজনীয়তা দিন দিন বাড়ছে। শীতের এই সময়ে আশ্রয়হীন মানুষের দুর্ভোগ আরও তীব্র হয়ে উঠেছে, বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের ক্ষেত্রে।

আন্তর্জাতিক সহায়তা সংস্থাগুলো সতর্ক করে বলছে, যদি দ্রুত মানবিক সহায়তা পৌঁছানো না যায়, তাহলে পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। সিরিয়া এমনিতেই দীর্ঘ যুদ্ধ, অর্থনৈতিক সংকট ও অবরোধের কারণে নাজুক অবস্থায় রয়েছে। তার ওপর নতুন করে এই বাস্তুচ্যুতি সংকট দেশটির মানবিক পরিস্থিতিকে আরও বিপর্যস্ত করছে।

সিরিয়ার সাধারণ মানুষের কাছে যুদ্ধ মানে কেবল রাজনৈতিক সংঘাত নয়, বরং প্রতিদিনের জীবনের নিরাপত্তাহীনতা। আলেপ্পোর রাস্তায় এখনো ধ্বংসস্তূপ, পোড়া বাড়িঘর আর স্মৃতির ভার বহন করে দাঁড়িয়ে আছে। নতুন করে শুরু হওয়া এই সংঘর্ষ সেই ক্ষতচিহ্নের ওপর আরও এক স্তর যন্ত্রণার যোগ করছে। যারা শহর ছেড়ে যাচ্ছেন, তারা জানেন না ভবিষ্যতে কী অপেক্ষা করছে। আবার যারা থেকে যাচ্ছেন, তাদের জীবনও ঝুলে আছে অনিশ্চয়তার দোলাচলে।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সামরিক সমাধানের পরিবর্তে রাজনৈতিক সংলাপ ছাড়া সিরিয়ার এই সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। কিন্তু বাস্তবতায় দেখা যাচ্ছে, প্রতিটি নতুন সংঘর্ষ আগের চেয়ে আরও বেশি মানুষকে বাস্তুচ্যুত করছে। আলেপ্পো থেকে পালিয়ে যাওয়া হাজার হাজার মানুষের চোখে এখন একটাই প্রশ্ন—এই যুদ্ধ কবে শেষ হবে, আর তারা কবে আবার নিরাপদ জীবনে ফিরতে পারবেন?

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত