পাতানো নির্বাচন নয়, সুষ্ঠুতার আশ্বাস সিইসির

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ৮ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৫৮ বার
সিইসি এ এম এম নাসির উদ্দিন

প্রকাশ: ০৮ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের নির্বাচন ব্যবস্থা ও গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ নিয়ে চলমান বিতর্কের প্রেক্ষাপটে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিনের বক্তব্য নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, এবার আগের মতো পাতানো নির্বাচন হবে না। নির্বাচন কমিশন সব রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ এবং একটি প্রকৃত অর্থেই লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড গড়ে তোলাই তাদের মূল লক্ষ্য। বৃহস্পতিবার সকালে এক অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি এই আশ্বাস দেন।

সিইসির এই মন্তব্য এমন এক সময়ে এসেছে, যখন দেশের নির্বাচন ব্যবস্থা নিয়ে জনগণের আস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে বিভিন্ন মহলে। অতীতের কয়েকটি জাতীয় ও স্থানীয় নির্বাচনে অনিয়ম, সহিংসতা এবং প্রশাসনিক পক্ষপাতের অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনায় রয়েছে। এসব অভিযোগের প্রেক্ষিতে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা ও স্বাধীনতা নিয়ে সমালোচনা হয়েছে রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজ এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের পক্ষ থেকেও। ফলে নতুন নির্বাচন কমিশনের অধীনে আসন্ন নির্বাচন কতটা গ্রহণযোগ্য হবে, তা নিয়ে জনমনে স্বাভাবিকভাবেই কৌতূহল ও উদ্বেগ রয়েছে।

প্রধান নির্বাচন কমিশনার বলেন, নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিক দায়িত্ব হলো জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিত করা। এই দায়িত্ব পালনে কোনো ধরনের আপস করা হবে না। তিনি জানান, কমিশন ইতোমধ্যে নির্বাচন ব্যবস্থাকে শক্তিশালী ও স্বচ্ছ করতে বিভিন্ন প্রশাসনিক ও কাঠামোগত উদ্যোগ নিয়েছে। ভোটকেন্দ্র ব্যবস্থাপনা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিরপেক্ষ ভূমিকা এবং নির্বাচনী আচরণবিধি কঠোরভাবে বাস্তবায়নের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

তার বক্তব্যে উঠে আসে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের বিষয়টি। সিইসি বলেন, সব রাজনৈতিক দল যাতে সমান সুযোগ পায়, সেটি নিশ্চিত করাই কমিশনের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। কোনো দল বা প্রার্থী যেন রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা বা প্রশাসনিক প্রভাব ব্যবহার করে অন্যদের থেকে বাড়তি সুবিধা না নিতে পারে, সে বিষয়ে কমিশন সতর্ক থাকবে। তিনি আরও বলেন, নির্বাচন কমিশন শুধু ভোটের দিন নয়, পুরো নির্বাচনী প্রক্রিয়াজুড়ে নজরদারি করবে।

নির্বাচন কমিশনের এই অবস্থান রাজনৈতিক অঙ্গনেও প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। ক্ষমতাসীন দল এবং বিরোধী দল—উভয় পক্ষ থেকেই এই বক্তব্য নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। বিরোধী দলের নেতারা দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছেন, অতীতের নির্বাচনগুলোতে জনগণের প্রকৃত মতামত প্রতিফলিত হয়নি। তাদের মতে, সিইসির এই আশ্বাস বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, সেটাই এখন দেখার বিষয়। অন্যদিকে ক্ষমতাসীন দলের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, নির্বাচন কমিশন স্বাধীনভাবে কাজ করলে দেশের গণতান্ত্রিক ধারাই আরও শক্তিশালী হবে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সিইসির এই বক্তব্য প্রতীকীভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তবে শুধু বক্তব্যই যথেষ্ট নয়, বাস্তবায়নই আসল চ্যালেঞ্জ। তারা বলছেন, নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা প্রমাণের সবচেয়ে বড় সুযোগ আসে নির্বাচনের আগে ও ভোটের দিনে নেওয়া সিদ্ধান্তগুলোর মাধ্যমে। প্রার্থী মনোনয়ন থেকে শুরু করে প্রচারণা, প্রশাসনের ভূমিকা, ভোটগ্রহণ এবং ফল ঘোষণার প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে না পারলে আস্থার সংকট কাটানো কঠিন হবে।

সিইসি তার বক্তব্যে আরও ইঙ্গিত দেন যে, কমিশন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করবে, তবে কোনো অবস্থাতেই তাদের নিরপেক্ষতা ক্ষুণ্ন হতে দেওয়া হবে না। তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশন প্রয়োজনে কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে দ্বিধা করবে না। আচরণবিধি লঙ্ঘন করলে যে কোনো প্রার্থী বা দলকে আইনের আওতায় আনা হবে, সে ক্ষেত্রে পরিচয় বা রাজনৈতিক অবস্থান বিবেচনায় নেওয়া হবে না।

বাংলাদেশের ইতিহাসে নির্বাচন সবসময়ই একটি স্পর্শকাতর বিষয়। স্বাধীনতার পর থেকে বিভিন্ন সময়ে নির্বাচন গণতন্ত্রকে এগিয়ে নিয়েছে, আবার কখনো তা রাজনৈতিক সংকটও তৈরি করেছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভোটার উপস্থিতি কমে যাওয়া এবং ভোটাধিকার নিয়ে প্রশ্ন ওঠা একটি বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক ভোটারই মনে করেন, তাদের ভোটের মূল্য নেই। এই মনোভাব পরিবর্তনের জন্য নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

সিইসির বক্তব্যে ভোটারদের উদ্দেশেও একটি বার্তা রয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষ ভূমিকার ফলে সাধারণ মানুষ আবার ভোটকেন্দ্রে যেতে আগ্রহী হবে। ভোটার উপস্থিতি বাড়লে নির্বাচন আরও গ্রহণযোগ্য ও অর্থবহ হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন। গণতন্ত্রের ভিত্তি হিসেবে ভোটারদের সক্রিয় অংশগ্রহণকে তিনি অপরিহার্য বলে উল্লেখ করেন।

সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরাও মনে করছেন, নির্বাচন কমিশনের ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যম এবং রাজনৈতিক দলগুলোরও দায়িত্ব রয়েছে। তারা বলেন, শুধু নির্বাচন কমিশনের ওপর সব দায় চাপালে হবে না। নির্বাচনকে সুষ্ঠু করতে হলে সব পক্ষের সম্মিলিত সদিচ্ছা প্রয়োজন। বিশেষ করে গণমাধ্যমের স্বাধীন ভূমিকা ও নাগরিক পর্যবেক্ষণ নির্বাচনকে স্বচ্ছ রাখতে সহায়ক হতে পারে।

আন্তর্জাতিক পরিসরেও বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে নজর রয়েছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও উন্নয়ন সহযোগীরা সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনকে গণতন্ত্রের অপরিহার্য শর্ত হিসেবে বিবেচনা করে। সিইসির এই বক্তব্য তাদের কাছেও একটি ইতিবাচক বার্তা দিতে পারে বলে মনে করছেন কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা। তবে তারা একই সঙ্গে বলছেন, আন্তর্জাতিক মহল শুধু কথায় নয়, বাস্তব চিত্রের দিকেই বেশি গুরুত্ব দেয়।

সব মিলিয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের ঘোষণা একটি প্রত্যাশার জন্ম দিয়েছে। ‘পাতানো নির্বাচন নয়’—এই বার্তাটি বাস্তবে রূপ পেলে তা দেশের গণতান্ত্রিক যাত্রায় একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হতে পারে। এখন দেখার বিষয়, নির্বাচন কমিশন তার এই অবস্থানকে কীভাবে কার্যকর পদক্ষেপের মাধ্যমে প্রমাণ করে। জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারলেই নির্বাচন কমিশনের এই ঘোষণা ইতিহাসে অর্থবহ হয়ে থাকবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত