আইসিই কর্মকর্তার গুলিতে মিনিয়াপোলিসে নারী নিহত

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ৮ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৫৪ বার
যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন কর্মকর্তার গুলিতে এক নারী নিহত

প্রকাশ: ০৮ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

যুক্তরাষ্ট্রের মিনিয়াপোলিসে অভিবাসন সংক্রান্ত এক অভিযানের সময় ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (আইসিই)–এর এক কর্মকর্তার গুলিতে ৩৭ বছর বয়সী এক নারী নিহত হওয়ার ঘটনায় দেশজুড়ে তীব্র বিতর্ক ও বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। নিহত নারী রেনি নিকোল গুড একজন মার্কিন নাগরিক ছিলেন। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ট্রাম্প প্রশাসন ও ফেডারেল কর্তৃপক্ষের বক্তব্যের সঙ্গে স্থানীয় প্রশাসন, অঙ্গরাজ্য নেতৃত্ব এবং জাতীয় পর্যায়ের ডেমোক্র্যাট রাজনীতিকদের অবস্থান সরাসরি মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়িয়েছে।

ফেডারেল কর্তৃপক্ষের দাবি অনুযায়ী, মিনিয়াপোলিসে পরিচালিত একটি বড় ধরনের অভিবাসন দমন অভিযানের সময় গুড তার গাড়িকে ‘অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার’ করে আইসিই এজেন্টদের চাপা দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। তাদের ভাষ্য, ওই পরিস্থিতিতে একজন এজেন্ট আত্মরক্ষার্থে গুলি চালান, যার ফলেই গুড প্রাণ হারান। তবে শহর ও অঙ্গরাজ্যের নেতৃত্ব এই ব্যাখ্যা প্রত্যাখ্যান করে ঘটনাটিকে ‘বেপরোয়া ক্ষমতার ব্যবহার’ এবং ‘প্রতিরোধযোগ্য মৃত্যু’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।

ঘটনাস্থলের ভিডিও ফুটেজ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। বিভিন্ন দিক থেকে ধারণ করা ভিডিওতে দেখা যায়, স্থানীয় সময় সকাল ১০টা ২৫ মিনিটের দিকে মিনিয়াপোলিসের একটি আবাসিক সড়কে একটি গাঢ় লাল রঙের এসইউভি রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে ছিল। ফুটপাতে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকা একদল মানুষকে দেখা যায়, যাদের অনেকের হাতে প্ল্যাকার্ড ছিল এবং তারা বিক্ষোভকারীদের মতো আচরণ করছিলেন। আশেপাশে একাধিক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গাড়িও অবস্থান করছিল।

ভিডিওতে দেখা যায়, আইসিই কর্মকর্তারা রাস্তার মাঝখানে পার্ক করা গাড়িটির কাছে এগিয়ে যান। একজন এজেন্ট গাড়ির চালকের পাশের দরজার হাতল টানতে থাকেন এবং ভেতরে থাকা নারীকে বের হয়ে আসতে নির্দেশ দেন। আরেকজন এজেন্ট গাড়ির সামনের দিকে অবস্থান নেন। ঠিক এই সময় এসইউভিটি সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। তখনই তিনটি গুলির শব্দ শোনা যায়। গুলির পর গাড়িটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পাশের রাস্তায় পার্ক করা একটি সাদা গাড়ির সঙ্গে ধাক্কা খায়। ঘটনাস্থলেই রেনি নিকোল গুড গুরুতর আহত হন এবং পরে তার মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়।

ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটির সেক্রেটারি ক্রিস্টি নোয়েম এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ওই এজেন্ট আত্মরক্ষার অধিকার প্রয়োগ করেছেন। তার ভাষায়, গুড তার গাড়িটিকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন, যা একজন কর্মকর্তার জীবনের জন্য তাৎক্ষণিক হুমকি তৈরি করেছিল। নোয়েম আরও দাবি করেন, নিহত নারীর কর্মকাণ্ড ‘অভ্যন্তরীণ সন্ত্রাসবাদের শামিল’। যদিও তিনি স্বীকার করেন যে এই মৃত্যু ‘প্রতিরোধযোগ্য’ হতে পারত, তবুও আইসিইর অভিযান অব্যাহত থাকবে বলে জানান।

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার মাইক জনসনও আইসিই কর্মকর্তার পদক্ষেপকে আত্মরক্ষা হিসেবে সমর্থন করেছেন। ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প লেখেন, এক আইসিই কর্মকর্তাকে ‘নৃশংসভাবে গাড়িচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল’। তিনি আরও দাবি করেন, ওই কর্মকর্তা গুরুতর আহত হলেও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সুস্থ হয়ে উঠছেন। ট্রাম্প তার পোস্টে ‘র‍্যাডিক্যাল লেফট’-এর বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে বলেন, তারা নিয়মিতভাবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও আইসিই এজেন্টদের লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে।

তবে মিনিয়াপোলিসের মেয়র জ্যাকব ফ্রে এই বর্ণনাকে কঠোর ভাষায় প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি বলেন, ‘এটি ছিল একজন এজেন্টের বেপরোয়া ক্ষমতার ব্যবহার, যার ফলে একজন মানুষের মৃত্যু হয়েছে।’ মেয়র আইসিই এজেন্টদের উদ্দেশে সরাসরি বলেন, ‘আমাদের শহর ছেড়ে চলে যাও।’ তার মতে, মিনিয়াপোলিসে এ ধরনের ফেডারেল অভিযান স্থানীয় নিরাপত্তা ও সামাজিক স্থিতিশীলতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

মিনেসোটা অঙ্গরাজ্যের গভর্নর টিম ওয়ালজও ফেডারেল কর্তৃপক্ষের বক্তব্যের বিরোধিতা করেছেন। তিনি অভিযোগ করেন, ঘটনার পর ফেডারেল এজেন্টরা গাড়িটি স্পর্শ করায় ঘটনাস্থলের গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ প্রভাবিত হয়ে থাকতে পারে। ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটির একটি পোস্টের জবাবে ওয়ালজ লেখেন, ‘এই প্রোপাগান্ডা যন্ত্রে বিশ্বাস করবেন না।’ তিনি আরও বলেন, অঙ্গরাজ্য সরকার একটি পূর্ণাঙ্গ, ন্যায্য ও দ্রুত তদন্ত নিশ্চিত করবে, যাতে দায়বদ্ধতা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়।

জাতীয় পর্যায়ের ডেমোক্র্যাট নেতারাও এই ঘটনায় তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। ডেমোক্র্যাট কংগ্রেসওম্যান আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও-কর্তেজ ঘটনাটিকে ‘প্রকাশ্য হত্যাকাণ্ড’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে এর নিন্দা করেছেন। সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট কমালা হ্যারিস ট্রাম্প প্রশাসনের ঘটনার বর্ণনাকে ‘গ্যাসলাইটিং’ বলে উল্লেখ করেন, যেখানে ভিকটিমকে দায়ী করে মূল ঘটনা আড়াল করার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। প্রতিনিধি পরিষদের সংখ্যালঘু দলনেতা হাকিম জেফ্রিসও পৃথক বিবৃতিতে ঘটনার স্বচ্ছ তদন্তের দাবি জানান।

এদিকে মিনিয়াপোলিস সিটি কাউন্সিল বলেছে, রেনি গুড কোনো সহিংস কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন না। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি কেবল নিজের প্রতিবেশীদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন এবং সেই সময় তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এই বক্তব্য ফেডারেল কর্তৃপক্ষের দাবির সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক, যা ঘটনাটিকে আরও বিতর্কিত করে তুলেছে।

বাংলাদেশের বড় দুশ্চিন্তা ব্যাটিং

গুলির ঘটনার পর মিনিয়াপোলিস শহরের বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। স্থানীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়, গুলির স্থানে একটি অস্থায়ী স্মরণসভা কেন্দ্র গড়ে তোলা হয়েছে। তুষারের ওপর ফুল ও মোমবাতি রেখে নিহত নারীর স্মরণে শ্রদ্ধা জানাচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। বিক্ষোভকারীরা স্লোগান দিয়ে আইসিই এজেন্টদের শহর ছাড়ার দাবি তুলছেন। মিনিয়াপোলিস স্টার-ট্রিবিউনের খবরে বলা হয়, প্রায় ৫০ জন বিক্ষোভকারী একটি ফেডারেল আদালতের প্রবেশপথে মানববন্ধন গড়ে তোলেন, যেখানে আইসিই কর্মকর্তারা অবস্থান করছিলেন। এক পর্যায়ে একটি কাচের জানালা ভাঙার ঘটনা ঘটলে পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেয়।

মিনিয়াপোলিসের বাইরেও এই ঘটনার প্রতিবাদ ছড়িয়ে পড়ছে। নিউ অরলিন্স, মায়ামি ও নিউইয়র্ক সিটিতে বিক্ষোভ ও সমাবেশের পরিকল্পনা করা হয়েছে বলে জানিয়েছে বিভিন্ন সংগঠন। অভিবাসন নীতি ও ফেডারেল বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে আগে থেকেই তীব্র রাজনৈতিক বিভাজন রয়েছে। এই ঘটনা সেই বিভাজনকে আরও প্রকট করে তুলেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

ঘটনাটির তদন্ত ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে এবং ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (এফবিআই) বিষয়টি খতিয়ে দেখছে বলে জানিয়েছেন ক্রিস্টি নোয়েম। তিনি আরও জানান, যিনি গুলি চালিয়েছেন, সেই এজেন্ট এর আগেও জুন মাসে দায়িত্ব পালনের সময় একটি গাড়ির ধাক্কায় আহত হয়েছিলেন। এই তথ্যও তদন্তের অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

রেনি নিকোল গুডের মৃত্যু শুধু একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন নীতি, ফেডারেল ক্ষমতার প্রয়োগ এবং নাগরিক অধিকার নিয়ে চলমান বিতর্কের প্রতীক হয়ে উঠেছে। একদিকে প্রশাসনের দাবি আত্মরক্ষা, অন্যদিকে স্থানীয় নেতৃত্ব ও নাগরিক সমাজের অভিযোগ অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ—এই দুই অবস্থানের মধ্যে সত্য উদঘাটন এখন তদন্তের ওপরই নির্ভর করছে। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট, এই মৃত্যু মিনিয়াপোলিস ও এর বাইরেও গভীর ক্ষোভ, শোক ও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে, যার প্রতিধ্বনি যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিসরে দীর্ঘদিন শোনা যাবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত