প্রকাশ: ০৮ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দীর্ঘদিনের অপেক্ষা ও অনিশ্চয়তার অবসান ঘটাতে বেসরকারি শিক্ষা খাতে বড় সুখবর নিয়ে এলো সরকার। সারাদেশের নন-এমপিওভুক্ত স্কুল ও কলেজগুলোকে আবারও এমপিওভুক্ত করার আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ জানিয়েছে, আগামী ১৪ জানুয়ারি থেকে অনলাইনে নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আবেদন গ্রহণ শুরু হবে, যা চলবে ২৫ জানুয়ারি পর্যন্ত। এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে দেশের হাজারো বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীর দীর্ঘদিনের বেতন-ভাতা অনিশ্চয়তা কাটার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
বুধবার মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের উপসচিব সাইয়েদ এ জেড মোরশেদ আলী স্বাক্ষরিত এক গণবিজ্ঞপ্তিতে বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে প্রণীত নতুন এমপিও নীতিমালার আলোকে যোগ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে এমপিওভুক্ত করা হবে। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে পুরো প্রক্রিয়াটি ডিজিটাল পদ্ধতিতে পরিচালিত হবে এবং কেবল অনলাইনের মাধ্যমেই আবেদন গ্রহণ করা হবে।
এমপিওভুক্তি বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। কারণ এমপিওভুক্ত হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও কর্মচারীরা সরকারি সহায়তায় নিয়মিত বেতন-ভাতা পেয়ে থাকেন। দীর্ঘদিন ধরে দেশের অনেক বেসরকারি স্কুল ও কলেজ এমপিওর বাইরে থাকায় সেখানে কর্মরত শিক্ষকরা অল্প বেতনে কিংবা কখনো বেতন ছাড়াই শিক্ষাদান করে আসছেন। ফলে পেশাগত নিরাপত্তাহীনতা, আর্থিক সংকট ও সামাজিক অনিশ্চয়তা তাদের নিত্যসঙ্গী হয়ে উঠেছিল।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছর থেকেই নির্বাচিত নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো এমপিও সুবিধার আওতায় আসতে পারে। অর্থাৎ আবেদন যাচাই-বাছাই ও চূড়ান্ত অনুমোদন শেষে দ্রুত সময়ের মধ্যেই এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীরা সরকারি বেতন কাঠামোর সুবিধা পেতে শুরু করবেন। এটি শুধু ব্যক্তিগত আর্থিক স্বস্তিই নয়, বরং সামগ্রিকভাবে শিক্ষা ব্যবস্থার মানোন্নয়নে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নতুন এমপিও নীতিমালায় যোগ্যতার ক্ষেত্রে বেশ কিছু মানদণ্ড নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো, শিক্ষার্থী সংখ্যা, শিক্ষক নিয়োগের বৈধতা, ফলাফলের ধারাবাহিকতা এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতা। মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আগের মতো রাজনৈতিক বা অন্য কোনো প্রভাব নয়, বরং নির্ধারিত নীতিমালার আলোকে যাচাই করেই প্রতিষ্ঠানগুলোকে এমপিওভুক্ত করা হবে। এতে করে প্রকৃত যোগ্য প্রতিষ্ঠানগুলোই সুযোগ পাবে এবং অনিয়মের আশঙ্কা কমবে।
ডিজিটাল আবেদন প্রক্রিয়া চালুর ফলে এমপিওভুক্তির ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। আবেদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্ধারিত ওয়েবসাইটে প্রয়োজনীয় তথ্য ও কাগজপত্র আপলোড করবে। সেখান থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রাথমিক যাচাই সম্পন্ন হবে এবং পরবর্তী ধাপে মাঠপর্যায়ের পরিদর্শন ও চূড়ান্ত মূল্যায়ন করা হবে। এই পদ্ধতির মাধ্যমে সময় ও খরচ কমার পাশাপাশি দুর্নীতি ও তদবিরের সুযোগও হ্রাস পাবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে গড়ে ওঠা অনেক বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে এমপিওভুক্তির অপেক্ষায় ছিল। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলের স্কুল ও কলেজগুলোতে কর্মরত শিক্ষকরা সীমিত আয়ের মধ্যেই শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ গড়ার দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছিলেন। সরকারের এই সিদ্ধান্ত তাদের জন্য নতুন আশার আলো হিসেবে দেখা দিয়েছে। অনেক শিক্ষক মনে করছেন, এমপিওভুক্তি হলে তারা আরও মনোযোগ দিয়ে পাঠদানে সময় দিতে পারবেন এবং শিক্ষার মান বাড়াতে ভূমিকা রাখতে পারবেন।
শিক্ষাবিদদের মতে, এমপিওভুক্তির এই উদ্যোগ শুধু আর্থিক সহায়তার বিষয় নয়, বরং এটি দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার একটি কৌশলগত পদক্ষেপ। কারণ নিয়মিত বেতন-ভাতা নিশ্চিত হলে শিক্ষকরা পেশার প্রতি আরও দায়বদ্ধ হন, যা সরাসরি শিক্ষার্থীদের শেখার মানে প্রভাব ফেলে। পাশাপাশি প্রান্তিক পর্যায়ে শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
তবে কিছু শিক্ষাবিদ সতর্ক করে বলেছেন, এমপিওভুক্তির পাশাপাশি শিক্ষার গুণগত মান তদারকিও জরুরি। শুধু এমপিও সুবিধা দিলেই হবে না, বরং নিয়মিত মনিটরিং, শিক্ষক প্রশিক্ষণ এবং পাঠ্যক্রমের মানোন্নয়ন নিশ্চিত করতে হবে। নাহলে এমপিওভুক্তির সুফল পুরোপুরি পাওয়া যাবে না।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নতুন নীতিমালায় এসব বিষয় বিবেচনায় রাখা হয়েছে। এমপিওভুক্ত হওয়ার পরও প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হবে এবং মানদণ্ড বজায় না রাখলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এতে করে দীর্ঘমেয়াদে একটি জবাবদিহিমূলক ও মানসম্মত শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্য রয়েছে সরকারের।
সামগ্রিকভাবে, এমপিওভুক্তি পুনরায় শুরু করার এই সিদ্ধান্ত দেশের শিক্ষা খাতে একটি ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে। দীর্ঘদিনের দাবির পর সরকার এই উদ্যোগ নেওয়ায় শিক্ষক সমাজে স্বস্তি ও প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। এখন আবেদন প্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ ও কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়, তার ওপর নির্ভর করবে এই উদ্যোগের সাফল্য। তবে আপাতত বলা যায়, নতুন বছরের শুরুতেই এমপিওভুক্তি নিয়ে এই ঘোষণাটি বেসরকারি শিক্ষা খাতের জন্য নিঃসন্দেহে বড় সুখবর।