প্রকাশ: ০৮ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বিশ্বজুড়ে স্বাস্থ্যকর, নিরাপদ ও নৈতিক উৎপাদন প্রক্রিয়ার প্রতি ভোক্তাদের আগ্রহ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হালাল পণ্যের চাহিদা দ্রুতগতিতে বৃদ্ধি পাচ্ছে। ধর্মীয় অনুশাসনের গণ্ডি পেরিয়ে হালাল এখন বৈশ্বিক খাদ্যনিরাপত্তা ও মানের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে ভোক্তাদের এই ঝোঁক হালাল পণ্যের বাজারকে পৌঁছে দিয়েছে সোয়া তিন ট্রিলিয়ন ডলারের বিশাল পরিসরে। বিশেষজ্ঞদের পূর্বাভাস, আগামী এক দশকে এই বাজার প্রায় তিনগুণ হয়ে যেতে পারে। অথচ মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ হয়েও বাংলাদেশ এই সম্ভাবনাময় বাজারে এখনো উল্লেখযোগ্য অবস্থান তৈরি করতে পারেনি। দেশের হালাল পণ্য রপ্তানির পরিমাণ মাত্র ৮৫ কোটি ডলার, যা বৈশ্বিক বাজারের তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য।
রপ্তানিকারক ও খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, এই পিছিয়ে থাকার পেছনে সবচেয়ে বড় বাধা আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য হালাল সনদের অভাব। পাশাপাশি আধুনিক যন্ত্রপাতির সীমিত ব্যবহার, দুর্বল ব্র্যান্ডিং, সমন্বিত নীতিমালার ঘাটতি, কাঠামোগত দুর্বলতা এবং সাপ্লাই চেইনের অদক্ষতা হালাল খাতের বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করছে। সম্ভাবনা যেখানে বিশাল, সেখানে রপ্তানির এই সীমিত পরিসর নীতিনির্ধারকদের জন্যও বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
হালাল পণ্য বলতে সাধারণত কৃষি ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্যকে বোঝানো হলেও বাস্তবে এর পরিধি অনেক বিস্তৃত। পোশাক, কসমেটিকস, ওষুধ, এমনকি পরিষেবা খাতও হালাল মানদণ্ডের আওতায় আসছে। বাংলাদেশ থেকে বর্তমানে প্রক্রিয়াজাত হালাল খাদ্য হিসেবে মাংস, মাছ, ফলমূল ও কৃষিপণ্য মধ্যপ্রাচ্য, এশিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হচ্ছে। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, পাকিস্তান ও তুরস্কের মতো বড় বাজারে কিছু পণ্য গেলেও পরিমাণ খুবই সীমিত। রপ্তানিকারকরা বলছেন, চাহিদা থাকা সত্ত্বেও সনদসংক্রান্ত জটিলতায় বড় অর্ডার পাওয়া যাচ্ছে না।
খাতসংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে হালাল পণ্যের বৈশ্বিক বাজারের আকার প্রায় ৩ দশমিক ৩০ ট্রিলিয়ন ডলার। বার্ষিক প্রবৃদ্ধি প্রায় ১৩ শতাংশ। এই ধারা অব্যাহত থাকলে ২০৩৪ সালের মধ্যে বাজারটি ৯ দশমিক ৪৫ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। অথচ এই বিশাল বাজারে বাংলাদেশের অংশীদারত্ব মাত্র দশমিক শূন্য তিন শতাংশ। অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, সঠিক নীতিগত সহায়তা ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পূরণ করা গেলে এই হিস্যা কয়েক গুণ বাড়ানো সম্ভব।
বাংলাদেশে হালাল সনদ প্রদানের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো একক কর্তৃত্বশীল ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত কোনো সংস্থার অভাব। দেশে এখনো জাতীয় হালাল নীতি বা কেন্দ্রীয় হালাল বোর্ড গঠিত হয়নি। ফলে ইসলামিক ফাউন্ডেশন এবং বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) পৃথকভাবে হালাল সনদ দিচ্ছে। ইসলামিক ফাউন্ডেশন এ পর্যন্ত ২৬০টি এবং বিএসটিআই ৩০টি কোম্পানিকে সনদ দিয়েছে। দুই সংস্থার ভিন্ন ভিন্ন সনদ থাকায় আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে। অনেক আমদানিকারকই এই সনদকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডসম্পন্ন হিসেবে গ্রহণ করছে না।
বিশেষ করে মালয়েশিয়ার ‘জাকিম’ বা সৌদি আরবের ‘এসএফডিএ’র মতো প্রভাবশালী সংস্থার স্বীকৃতি ছাড়া ওইসব বাজারে প্রবেশ কঠিন। ইউরোপীয় ইউনিয়নের ক্ষেত্রেও রয়েছে কঠোর মানদণ্ড। রপ্তানিকারকরা অভিযোগ করছেন, বাংলাদেশের সনদদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো সেই মানে পৌঁছাতে পারেনি। ফলে অনেক সময় অর্ডার বাতিল হয়ে যাচ্ছে, যা ব্যবসায়ীদের জন্য বড় আর্থিক ক্ষতির কারণ হচ্ছে।
বিএসটিআইয়ের হালাল সনদ বিভাগের সহকারী পরিচালক জিশান আহমেদ তালুকদার বলেন, হালাল পণ্য এখন শুধু ধর্মীয় বিষয় নয়, এটি স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত। তাঁর মতে, অনেক অমুসলিম দেশেও হালাল পণ্যের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ছে এবং সেখানে বিএসটিআইয়ের মানসনদের স্বীকৃতি রয়েছে। তাই দেশের সনদ পুরোপুরি অগ্রাহ্য করা যায় না। তবে তিনি স্বীকার করেন, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে গ্রহণযোগ্যতা আরও বাড়াতে মান উন্নয়নের প্রয়োজন রয়েছে।
হালাল পণ্য নিয়ে গবেষণা করা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস এগ্রিকালচার অ্যান্ড টেকনোলজির সহকারী অধ্যাপক মমিনুল ইসলাম বলেন, বিশ্বের অধিকাংশ দেশে হালাল সনদ দেয় একটি কেন্দ্রীয় সংস্থা। বাংলাদেশে দুটি সংস্থা থেকে সনদ দেওয়ায় জটিলতা তৈরি হয়েছে। তাঁর মতে, রপ্তানি বাড়াতে হলে একক কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন সনদ চালু করা জরুরি। পাশাপাশি উদ্যোক্তাদের পণ্যের মান উন্নয়ন এবং স্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে।
শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. ওবায়দুর রহমান বলেন, বাস্তবে হালাল সনদের কারিগরি কাজটি করে বিএসটিআই। এই সনদকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আরও পরিচিত ও গ্রহণযোগ্য করতে মন্ত্রণালয় নানা উদ্যোগ নিচ্ছে। ভবিষ্যতে সনদের দায়িত্ব কাঠামোগতভাবে পুনর্বিন্যাসের সম্ভাবনাও রয়েছে বলে তিনি ইঙ্গিত দেন।
রপ্তানিতে পিছিয়ে থাকার আরেকটি বড় কারণ হলো দুর্বল ব্র্যান্ডিং। ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে অন্যতম শীর্ষ হালাল পণ্যের হাবে পরিণত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলেও বাস্তবতায় সেই লক্ষ্য অর্জনের প্রস্তুতি এখনো অপর্যাপ্ত। আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের ব্র্যান্ড পরিচিতি দুর্বল, দেশটি এখনো কাঁচামাল বা কমমূল্যের পণ্য সরবরাহকারীর পরিচয় থেকে বের হতে পারেনি। আধুনিক পরীক্ষাগার, কোল্ড চেইন ব্যবস্থা, ট্রেসেবিলিটি প্রযুক্তি এবং বিশেষায়িত হালাল শিল্পপার্কের অভাব রপ্তানির সক্ষমতাকে সীমিত করছে।
রপ্তানিকারকদের অভিজ্ঞতাও একই কথা বলছে। বেঙ্গল মিটের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আহমদ আসিফ বলেন, শুধু ‘হালাল’ সিল থাকলেই আন্তর্জাতিক ক্রেতারা সন্তুষ্ট হন না। তারা পশুর জন্ম থেকে শুরু করে জবাই, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও প্যাকেজিং পর্যন্ত প্রতিটি ধাপের বিস্তারিত ডিজিটাল তথ্য চান। কোন ফার্মে পশু বড় হয়েছে, কী খাবার খেয়েছে, কী ধরনের ভ্যাকসিন দেওয়া হয়েছে—সবকিছুই এখন ক্রেতাদের নজরে।
তিনি আরও বলেন, বিশ্ব প্রাণী স্বাস্থ্য সংস্থার মতো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের স্বীকৃতি অর্জনে সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে। পাশাপাশি রপ্তানি বাড়াতে হলে ক্রেতা দেশগুলোর সঙ্গে সরকারি পর্যায়ে প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়কে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। আন্তর্জাতিক মানের পরীক্ষাগার ও সনদ না থাকলে বাজারে টিকে থাকা কঠিন।
প্রাণ গ্রুপের পরিচালক কামরুজ্জামান কামালও একই মত প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক মানের ল্যাব না থাকায় পণ্যের মান যাচাই ও সনদ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। এর ফলে রপ্তানি বাজারে বাংলাদেশের গ্রহণযোগ্যতা কমে যায় এবং শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
সব মিলিয়ে, হালাল পণ্যের বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের সম্ভাবনা বিশাল হলেও আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য সনদ ও সমন্বিত কাঠামোর অভাবে সেই সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ নিচ্ছে না। নীতিনির্ধারকদের দ্রুত পদক্ষেপ, একক ও স্বীকৃত সনদ ব্যবস্থা, আধুনিক অবকাঠামো এবং শক্তিশালী ব্র্যান্ডিং ছাড়া এই খাতে বড় সাফল্য অর্জন কঠিন। সময়মতো উদ্যোগ নেওয়া গেলে হালাল পণ্য রপ্তানি বাংলাদেশের অর্থনীতির নতুন চালিকাশক্তি হয়ে উঠতে পারে—এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।