অস্ট্রেলিয়ার জয়ে শেষ অ্যাশেজ, আবেগে ভাসালেন খাজা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ৮ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৫১ বার
অস্ট্রেলিয়ার জয়ে শেষ অ্যাশেজ, আবেগে ভাসালেন খাজা

প্রকাশ: ০৮ জানুয়ারি, ২০২৬  । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

সিডনি ক্রিকেট গ্রাউন্ডে শেষ দিনের নাটকীয়তায় পর্দা নামল আরেকটি ঐতিহ্যবাহী অ্যাশেজ সিরিজের। ১৬০ রানের লক্ষ্য তাড়া করে পাঁচ উইকেটের জয় তুলে নেয় অস্ট্রেলিয়া। এই জয়ের মধ্য দিয়ে ৪-১ ব্যবধানে সিরিজ নিজেদের করে নেয় স্বাগতিকরা। ফলাফল যেমন অস্ট্রেলিয়ার আধিপত্যের সাক্ষ্য দেয়, তেমনি পুরো সিরিজ জুড়ে প্রত্যাশা আর বাস্তবতার মাঝে কিছুটা ব্যবধানও চোখে পড়েছে। তবে সিরিজের শেষ ম্যাচটি ছিল আলাদা—রোমাঞ্চ, আবেগ আর বিদায়ের ভারে ভারী এক টেস্ট, যা অ্যাশেজ ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

এই ম্যাচটি বিশেষভাবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে উসমান খাজার বিদায়ের জন্য। নিজের ৮৮তম এবং শেষ টেস্ট খেলতে নেমেছিলেন এই বাঁহাতি ব্যাটার। ক্যারিয়ারের শেষ ইনিংসে তিনি হয়তো রূপকথার মতো কোনো সেঞ্চুরি বা ম্যাচজয়ী পারফরম্যান্স দিতে পারেননি, কিন্তু মাঠ ছাড়ার মুহূর্তটি ছিল হৃদয়ছোঁয়া। মধ্যাহ্নভোজের পর ব্যাট করতে নেমে মাত্র ৬ রান করে আউট হলেও, আউট হওয়ার পর মাঠে সিজদা দেওয়া এবং চারদিক থেকে ভেসে আসা দর্শকদের করতালি খাজার বিদায়কে এনে দেয় এক অনন্য মর্যাদা। ক্রিকেট শুধু পরিসংখ্যানের খেলা নয়, আবেগ আর সম্মানের জায়গাও—খাজার বিদায় সেই কথাই আবার মনে করিয়ে দিল।

১৬০ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে অস্ট্রেলিয়ার শুরুটা ছিল একেবারেই আত্মবিশ্বাসী। উদ্বোধনী জুটিতে কোনো উইকেট না হারিয়েই দল পৌঁছে যায় ৬২ রানে। মনে হচ্ছিল, ম্যাচ বুঝি খুব সহজেই শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু ক্রিকেট যেমন অনিশ্চয়তার খেলা, ঠিক তেমনই হঠাৎ করে তিনটি উইকেট হারিয়ে ম্যাচে ফিরে আসে ইংল্যান্ড। এক পর্যায়ে দ্রুত আরও কয়েকটি উইকেট পড়ে গেলে স্বাগতিকদের ডাগআউটেও কিছুটা চাপের ছাপ দেখা যায়।

এই চাপের মুহূর্তেই দায়িত্ব নেন অ্যালেক্স ক্যারি এবং ক্যামেরুন গ্রিন। ক্যারি নিজের স্বভাবসুলভ শান্ত ও হিসেবি ব্যাটিংয়ে ইনিংস গুছিয়ে নেন, আর গ্রিন দেখান পরিণত মানসিকতা। দুজনের মধ্যে গড়ে ওঠা ৪০ রানের গুরুত্বপূর্ণ জুটিই কার্যত ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করে দেয়। এই জুটির মাধ্যমে অস্ট্রেলিয়া আবারও নিয়ন্ত্রণ নেয় এবং শেষ পর্যন্ত লক্ষ্য ছুঁয়ে ফেলে। ম্যাচ শেষে দেখা যায়, জয় উদযাপনের পাশাপাশি দলের খেলোয়াড়রা খাজার দিকে এগিয়ে গিয়ে তাকে ঘিরে ধরেছেন—এ যেন এক যুগের সমাপ্তি উপলক্ষে সম্মিলিত শ্রদ্ধা।

পুরো সিরিজে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিংয়ের সবচেয়ে বড় ভরসা ছিলেন ট্রাভিস হেড। শেষ টেস্টেও তিনি আক্রমণাত্মক মেজাজে খেলতে নামেন। যদিও ২৯ রানে আউট হন, তবু সিরিজজুড়ে তার অবদান ছিল অসাধারণ। পাঁচ ম্যাচে ৬২৯ রান করে তিনি ছিলেন অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিংয়ের মূল চালিকাশক্তি। চাপের মুখে দ্রুত রান তোলা এবং ম্যাচের গতি নিজের পক্ষে নেওয়ার যে দক্ষতা, তা আবারও প্রমাণ করেছেন হেড। অ্যাশেজে তার এই পারফরম্যান্স নিঃসন্দেহে ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হবে।

ইংল্যান্ডের দৃষ্টিকোণ থেকে শেষ দিনের লড়াই ছিল মরিয়া চেষ্টা আর সীমাবদ্ধতার গল্প। জস টাং শেষ দিন তিনটি গুরুত্বপূর্ণ উইকেট নিয়ে সফরকারীদের আশা জিইয়ে রাখার চেষ্টা করেন। তবে দলের জন্য বড় ধাক্কা হয়ে আসে অধিনায়ক বেন স্টোকসের ইনজুরি। ইনজুরির কারণে তিনি বোলিং করতে না পারায় ইংল্যান্ডের আক্রমণভাগ অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়ে। গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে স্টোকসের অভাব স্পষ্টভাবে টের পাওয়া যায়, যা ম্যাচের গতিপথে বড় প্রভাব ফেলে।

এর আগে ইংল্যান্ডের দ্বিতীয় ইনিংসে কিছুটা লড়াইয়ের আশা দেখিয়েছিলেন জ্যাকব বেথেল। তরুণ এই ব্যাটার দায়িত্বশীল ব্যাটিং করে দলকে সম্মানজনক অবস্থানে নেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু অভিজ্ঞ মিচেল স্টার্ক সেই আশাটুকুও নিভিয়ে দেন। বেথেলকে ফিরিয়ে দিয়ে ইংল্যান্ডের ইনিংসে শেষ আঘাত হানেন স্টার্ক। এই ম্যাচে উইকেট নেওয়ার মধ্য দিয়ে পুরো সিরিজে স্টার্কের উইকেটসংখ্যা দাঁড়ায় ৩১-এ। অ্যাশেজ ইতিহাসে অস্ট্রেলিয়ার বোলারদের মধ্যে এটি অন্যতম সেরা পারফরম্যান্স হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে। গতি, সুইং আর অভিজ্ঞতার মিশেলে স্টার্ক আবারও প্রমাণ করেছেন, বড় মঞ্চে তিনি কতটা ভয়ংকর হতে পারেন।

সিরিজের সামগ্রিক চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, অস্ট্রেলিয়া প্রায় সব বিভাগেই এগিয়ে ছিল। ব্যাটিংয়ে ট্রাভিস হেড, বোলিংয়ে মিচেল স্টার্ক এবং দলগত সমন্বয়ে তারা ইংল্যান্ডকে চাপে রেখেছে ধারাবাহিকভাবে। যদিও কয়েকটি ম্যাচে ইংল্যান্ড প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলেছিল, তবু ধারাবাহিকতার অভাব তাদের পিছিয়ে দিয়েছে। বিশেষ করে ইনজুরি সমস্যা এবং গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে অভিজ্ঞ খেলোয়াড়দের অনুপস্থিতি সফরকারীদের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

তবুও এই অ্যাশেজের শেষ ম্যাচ প্রমাণ করেছে, ক্রিকেট শুধু জয়-পরাজয়ের হিসাব নয়। খাজার বিদায়ের মতো আবেগঘন মুহূর্ত, শেষ দিনের টানটান লড়াই এবং দর্শকদের আবেগী সাড়া—সব মিলিয়ে এই টেস্ট অ্যাশেজের ঐতিহ্যকে আবারও নতুন করে তুলে ধরেছে। সিরিজটি হয়তো প্রত্যাশার সবটুকু পূরণ করতে পারেনি, কিন্তু শেষ ম্যাচটি নিশ্চিতভাবেই ইতিহাসে আলাদা জায়গা করে নেবে।

অস্ট্রেলিয়ার জন্য এটি ছিল আধিপত্যের ঘোষণা, আর ইংল্যান্ডের জন্য আত্মসমালোচনার সুযোগ। আর উসমান খাজার জন্য—এটি ছিল দীর্ঘ ও সম্মানজনক ক্যারিয়ারের পর্দা নামানোর মুহূর্ত, যেখানে রানসংখ্যা নয়, সম্মান আর ভালোবাসাই হয়ে উঠেছে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত