প্রকাশ: ০৮ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ইরানের রাজধানী তেহরানসহ দেশটির বিভিন্ন শহরে চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভকে আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে দেখছেন ইরানের প্রধান বিচারপতি গোলাম হোসেইন মোসেনি। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, যারা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে বা তা সমর্থন করছে, তারা মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের স্বার্থে কাজ করছে। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, সড়কে অশান্তি ও অনিরাপত্তা সৃষ্টিকারীদের কোনোভাবেই ক্ষমা করা হবে না।
গত কয়েক সপ্তাহ ধরে ইরানে অর্থনৈতিক সংকট, মুদ্রার অবমূল্যায়ন এবং দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। বুরুজের্দ, আরসানজান, গিলান-এ-ঘার্বসহ বিভিন্ন শহরে মানুষ রাস্তায় নেমে সরকারের অর্থনৈতিক নীতির প্রতিবাদ জানাচ্ছেন। বিক্ষোভের শুরুতে তেহরানের গ্র্যান্ড বাজারে ক্রমবর্ধমান দ্রব্যমূল্যের কারণে ক্ষুব্ধ জনগণ অশান্তি সৃষ্টি করে। এরপর এই আন্দোলন দ্রুত অন্যান্য শহরে ছড়িয়ে পড়ে।
ইরানের সরকারি তথ্য ও মানবাধিকার সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই আন্দোলনে এখন পর্যন্ত অন্তত ৩৬ জন নিহত এবং প্রায় দুই হাজার সাধারণ মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সেনাবাহিনী এবং পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। ইরানের সেনাবাহিনীর প্রধান মেজর জেনারেল আমীর হাতামি জানিয়েছেন, যেকোনো আগ্রাসীর বিরুদ্ধে কঠোর জবাব দেওয়া হবে এবং দেশের সামরিক প্রস্তুতি আগের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী।
এদিকে, ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি যুক্তরাষ্ট্রের হুমকির জবাবে বলেছেন, ইরান শত্রুর সামনে কখনোই মাথা নত করবে না। তার ভাষ্য, দেশের অভ্যন্তরীণ অশান্তি রোধ করা সরকারের দায়িত্ব এবং জনগণের শান্তিপূর্ণ সহমত নিশ্চিত করতে প্রশাসন সক্রিয়ভাবে কাজ করছে।
সরকারের পক্ষ থেকে বিক্ষোভ প্রশমনে সীমিত আর্থিক সহায়তা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আল জাজিরা জানায়, সরকারের এই সহায়তা প্রতি পরিবারকে মাসিক প্রায় ৭ ডলার প্রদান করা হবে। কর্তৃপক্ষের দাবি, এই অর্থ মৌলিক খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতির চাপ কিছুটা কমাতে সহায়ক হবে এবং অশান্তি রোধে ভূমিকা রাখবে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিক্ষোভকারীরা মূলত রাজধানী ও প্রান্তিক শহরগুলোতে সাময়িকভাবে সড়কে অবস্থান করছেন। তাদের উদ্দেশ্য হচ্ছে রাজনৈতিক অনির্দিষ্টতা সৃষ্টি করা। ইরানের বিচার বিভাগ এ ধরনের কার্যকলাপকে দেশের নিরাপত্তা ও সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি হিসেবে দেখছে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইরানের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সমস্যার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের জড়িত থাকার অভিযোগ স্থানীয় সরকারের রাজনৈতিক অবস্থানকে দৃঢ় করতে সাহায্য করছে। তবে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, ইরানের অভ্যন্তরীণ সমস্যার মূল কারণ দেশটির অর্থনৈতিক নীতি, মুদ্রা সংকট এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতি।
প্রধান বিচারপতির হুঁশিয়ারি ও সরকারের সীমিত আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত করার পদক্ষেপ দেশের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা রক্ষা করার উদ্দেশ্যে নেওয়া হয়েছে। তবে জনগণের ক্ষোভ ও আন্দোলনের প্রকৃতি দেখিয়ে দিচ্ছে যে, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমাধান ছাড়া পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন।
সর্বশেষ সংবাদ অনুযায়ী, ইরানের বিভিন্ন শহরে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। পুলিশ ও সশস্ত্র বাহিনী গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় মোতায়েন রয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, যারা শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ করবে তাদের ক্ষতি করা হবে না, কিন্তু অশান্তি সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
প্রধান বিচারপতি মোসেনি ও সেনাবাহিনীর নেতারা একযোগে বলেছেন, ইরানের অভ্যন্তরীণ অশান্তি আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের অংশ এবং দেশের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার জন্য তা প্রতিহত করা হবে। একই সঙ্গে সরকার সামাজিক ও অর্থনৈতিক সহায়তা বৃদ্ধি করে জনসাধারণের আস্থা অর্জনের চেষ্টা চালাচ্ছে।
ইরান এই মুহূর্তে একদিকে আর্থিক সংকট, অন্যদিকে রাজনৈতিক অস্থিরতার মোকাবিলা করছে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, সরকারের নীতি ও বিচার বিভাগের কঠোর অবস্থান দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতায় বড় প্রভাব ফেলতে পারে।